দ্রুত ফোনের কাছে চলে এল হেগেন। তাড়াহুড়োর সাথে ফোন করল কয়েকটা। শহরে সনির দলের কয়েকজন লোক থাকে, তাদেরকে নির্দেশ দিল তারা যেন এই মুহূর্তে ছুটে যায় কার্লো রিটসির বাড়িতে। সনি ওখানে পৌঁছুবার আগেই সরিয়ে ফেলতে হবে কার্লোকে। সেই সাথে নির্দেশ দিল, কার্লোকে বাড়ি থেকে সরিয়ে ফেলার পরও যেন কয়েকজন লোক পাহারায় থাকে কনির কাছে, যতক্ষণ না পৌঁছায় সনি!
সনির সঙ্কল্পে বাধা দেয়া প্রায় অসম্ভবএকটা কাজ, এর মধ্যে একাধিক মস্ত ঝুঁকি রয়েছে-কিন্তু টম হেগেন জানে এ-কাজে ডনের সমর্থন পাবে সে।
হেগেনের এখন একটাই ভয়। হয়তো কার্লোকে সনির হাত থেকে শেষ পর্যন্ত আজ বাঁচানো যাবে না, কিন্তু কোন সাক্ষীর সামনে কার্লোকে যদি খুন করে সনি, পরে সাংঘাতিক বিপদ আর জটিলতা দেখা দিতে পারে। শত্রুপক্ষ, অর্থাৎ পাঁচ পরিবারের তরফ থেকে কোন বিপদ আশঙ্কা করছে না হেগেন। বেশ অনেকদিন হয়ে গেল চুপচাপ আছে ওরা, তেমন নড়াচড়া করছে না-গেনের ধারণা, এখন হয়তো ওরা কোনরকম একটা মিটমাট করে নিতে চাইছে কর্লিয়নিদের সাথে।
ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মত তীব্রগতিতে মস্ত উঠান ছেড়ে বাইরের রাস্তায় বেরিয়ে এল সনির গাড়ি। এরই মধ্যে কিছুটা সুবুদ্ধি ফিরে এসেছে ওর মধ্যে; ভিউ মিররে চোখ পড়ল, দেখল দুজন বডিগার্ড ওকে অনুসরণ করার জন্যে নিজেদের একটা গাড়িতে উঠছে। মনে মনে ব্যাপারটাকে সমর্থনও করল সনি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে। ওর মনে বিপদের কোন আশঙ্কা রয়েছে। জানে, পাল্টা আক্রমণ বেশ কিছুদিন। থেকে বন্ধ রেখেছে পাঁচ পরিবার। বলতে গেলে মার খেয়ে মুখটি বুজে মার হজম করে যাচ্ছে তারা, একেবারেই লড়াই করছে না। বেরোবার সময় হলঘর থেকে। নিজের কোটটা তুলে নিয়েছে ও, গাড়ির ড্যাশবোর্ডের চোরা খোপে একটা পিস্তলও আছে। গাড়িটাও ওর দলের একজন লোকের নামে রেজিস্টার করা–তার মানে, আইনের সামনে ব্যক্তিগতভাবে ওকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না। তবে, এখনও ভেবে দেখছে না সনি, কি সিদ্ধান্ত নেবে ও কার্লোর ব্যাপারে!
ফাঁকা রাস্তা ধরে তীরবেগে ছুটছে গাড়ি। ভাবনা-চিন্তা করার একটু সময় পাচ্ছে এখন সনি। বুঝতে পারছে, একটা অজাত শিশুর জন্মদাতা, যে কিনা ওরই বোনের স্বামী, তাকে হুট করে খুন করে ফেলা ওর কাজ নয়। বিশেষ করে, তেমন জোরাল কোন কারণ নেই যেখানে। ব্যাপারটা স্রেফ একটা দাম্পত্য কলহ বৈ ভো নয়। আবার একটু অন্য খাতে বইতে শুরু করল সনির চিন্তা-সে এটাকে শুধুই একটা দাম্পত্য কলহ বলে মনে করছে কেন? লোক হিসেবে আসলে কোনদিক থেকেই ভাল নয় কার্লো। কর্লিয়নি পরিবারের জন্যে একটা মাথাব্যথা হয়ে উঠেছে সে। তাছাড়া, মনে হচ্ছে সনির, ব্যাপারটা ওদের স্বামী-স্ত্রীর নিজস্ব ব্যাপার হলেও, এর মধ্যে ওর নিজেরও খানিকটা দায়িত্ব আছে। কারণ, ওর চেষ্টা আর মধ্বস্থতাতেই তো কনির সাথে আলাপ পরিচয়, তারপর বিয়ে হয়েছে কার্লোর।
সনির হিংস্র প্রকৃতির মধ্যে একটা পরম্পরবিরোধী ভাব আছে। যত বড় কারণই থাকুক, কোন মেয়েমানুষের গায়ে হাত তুলতে পারে না ও।তোলেনি কখনও। একটা শিশু বা একজন অসহায় মানুষের কাছে এত দুর্বল ও, তাদেরকে আঘাত করা তো দূরের কথা, একটা টোকা পর্যন্ত মারতে পারে না। অবোধ কোন প্রাণ ওর হিংস্র প্রকৃতির কাছে সম্পূর্ণ নিরাপদ। সেদিন কার্লো শুধু একটা কারণে বেঁচে গিয়েছিল। পাল্টা মারতে রাজী হয়নি সে, সেজন্যেই তাকে খুন করা সম্ভব হয়নি সনির পক্ষে। কেউ যদি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে, কেমন যেন নির্জীব হয়ে পড়ে ওর ভয়ঙ্কর হিংস্র প্রবৃতিগুলো। সবাই জানে, কথাটাও সত্যি, ছোটবেলায় আশ্চর্য কোমল ছিল ওর মনটা! পরে একজন ত্রাসসৃষ্টিকারী হত্যাকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে বটে ও, কিন্তু সেটা নিতান্তই ওর নিয়তি।
কিন্তু আজ, ভাবছে সনি কর্লিয়নি, সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধান করে ফেলতেই হবে। লং বীচ থেকে জলার ওপারে জোন্স বীচে যেতে হলে পথে একটা বাঁধ পড়ে, সেই বাঁধের উপর দিয়ে যেতে হবে ওকে। বুইক নিয়ে বাধটার উপর উঠল ও। ওপারে যানবাহনের ভিড় আরও কম থাকবে। ঝড়ের বেগে গাড়ি চালিয়ে গেলে মনের ভিতর সাংঘাতিক যে জটটা পাকিয়েছে, সেটা হয়তো খুলে যেতে পারে। ইতিমধ্যে, অনেক আগেই, বডিগার্ডদের গাড়িটাকে পিছনে ফেলে রেখে অনেকদূর চলে এসেছে সনি। ভিউমিররে গাড়িটার চিহ্নমাত্র দেখা যাচ্ছে না।
বাঁধের উপর আলো খুব কম। একটা গাড়িও নেই। এখনও অনেকটা দূরে দেখা যাচ্ছে তোলাখানার সাদা গম্বুজ। লোকজন আছে ওখানে। পাশাপাশি আরও অনেকগুলো তোলাখানা রয়েছে, সেগুলো এখন বন্ধ, শুধু দিনের বেলাই খোলা থাকে, কারণ তখন যানবাহনের ভিড় থাকে বেশি। বেশ খানিকটা দূরে থাকতেই ব্রেক করে গাড়ির গতি কমিয়ে আনছে সনি, সেই সাথে পকেটে হাত ঢুকিয়ে মুচরো পয়সা খুঁজছে, তোলাখানায় শুল্ক দিতে হবে। পকেটে খুচরো কোন পয়সা নেই, অগত্যা মানিব্যাগটা বের করে একহাতেই খুলে ফেলল সেটা বেছে বের করল এক ডলারের একটা নোট। ইতিমধ্যে তোলাখানার আলোর বৃত্তের মাঝখানে চলে এসেছে ওর বুইক এই প্রথম নজরে পড়ল, তোলাখানার সামনের ফাঁকা জায়গাটা জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা গাড়ি। সামান্য একটু অবাক হলো সনি। তারপর ভাবল, ড্রাইভার সম্ভবত তোলাখানার লোকটার কাছ থেকে পথ জেনে নিচ্ছে। হর্ণ বাজাল সনি। সাথে সাথে সুবোধ বালকের মত গাড়িটা এগিয়ে নিয়ে সনির বুইকটাকে এগিয়ে এসে দাঁড়াবার জায়গা করে দিল ড্রাইভার।
