শুয়োরের মত মোটা হয়েছিস, মাগী…চুপ! বলতে বলতে কামরা থেকে বেরিয়ে গেল কার্লো।
সাঙ্ঘাতিক ভয় পেয়েছে কনি। চিরকাল দস্যি টাইপের মেয়ে সে, কিন্তু কার্লোর অগ্নিমূর্তি দেখে আত্মা আঁচাছাড়া হয়ে গেছে তার। ব্যথায় জ্বলছে দুই গাল, তবু একটু শব্দ করতে সাহস পাচ্ছে না। পাশের কামরায় কি করছে স্বামী উঠে গিয়ে তা দেখে আসার কথা পর্যন্ত ভাবতে পারছে না। কাঠ হয়ে পড়ে আছে বিছানায়। অনেকক্ষণ কেটে গেল। কি করছে কার্লো? অস্থির হয়ে ভাবছে কনি। অনেক চেষ্টা করে সাহস সঞ্চয় করল সে। নিঃশব্দে উঠে বসল। প্রচুর সময় নিয়ে। নামল খাট থেকে। এক পা এক পা করে এগোল পাশের কামরার দরজার দিকে। উঁকি দিয়ে তাকাল।
আরেকটা মদের বোতল খুলেছে কার্লো। হাত-পা ছড়িয়ে দিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে নোফার উপর। আর একটু পর নেশায় হুশ থাকবে না ওর, ভাবছে কনি, তখন চুপিসারে কিচেন থেকে লং বীচে বাপের বাড়িতে ফোন করতে পারবে। মাকে একটা খবর দিলেই মা ওকে নিয়ে যাবার জন্যে গাড়ি পাঠিয়ে দেবে। ভয় লাগছে..ধু একটা কথা ভেবে। ফোন যেন বড়দা সনি না ধরে। টম হেগেন অথবা মা ধরলে সবচেয়ে ভাল হয়।
রাত দশটা।
ডন কর্লিয়নির বাড়ি। কিচেনের ফোনটা ঝন ঝন শব্দে বেজে উঠল। ক্রেডল থেকে রিসিভার তুলল কর্লিয়নিদের একজন বডিগার্ড। কনির গলা শুনে, তার যেমন কর্তব্য, বাড়ির কত্রীকে দিল রিসিভারটা।
কনি কথা বলছে কিন্তু মেয়ের কথা ভাল করে বুঝতেই পারছেন না মা। শুধু বুঝতে পারছেন, কনির সাংঘাতিক কিছু একটা হয়েছে, হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মত প্রলাপ বকছে সে, তাও এত নিচু গলায় যে তার কথার একটা বর্ণও বোঝা যাচ্ছে না।
কার্লোর চড় খেয়ে মুখ ফুলে গেছে কনির, ক্ষতবিক্ষত ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে অস্পষ্ট শব্দ বেরুচ্ছে। বসার ঘরে টম হেগেনের সাথে কথা বলছে সনি, বডিগার্ডকে ইঙ্গিত করলেন মিসেস কর্লিয়নি, সনিকে কিচেনে ডেকে নিয়ে আসতে বলছেন।
তখুনি এল সনি। মায়ের হাত থেকে নিল রিসিভারটা। জানতে চাইল, কি ব্যাপার, কনি?
ছ্যাঁৎ করে উঠল কনির বুকটা বড়দার গলা শুনে। এক দিকে স্বামীর ভয়, আরেক দিকে সনি কি না কি করে বসে সেই ভয়-দিশেহারা হয়ে পড়ল কনি, তার কণ্ঠস্বর অস্পষ্ট হয়ে এল আরও। মুখের ভিতর জড়িয়ে যাচ্ছে তার কথাগুলো, বলছে, সনি, আমি যাব:••একটা গাড়ি, আর কিছু করতে হবে না তোমাকে, লক্ষ্মী ভাই, শুধু যদি একটা গাড়ি পাঠিয়ে দাও–গিয়ে সব বলব আমি তোমাকে। যীশুর কিরে, কিছু হয়নি, সনি। তোমাকে আসতে হবে না! এসো না কিন্তু, কেমন? টমকে পাঠাও, ওর সাথে যাব আমি। কিছু হয়নি, এমনি তোমাদেরকে দেখার ইচ্ছা হয়েছে, তাই যেতে চাইছি…
ইতিমধ্যে টম হেগেনও কিচেনে চলে এসেছে।
ঘুমের ওষুধ খেয়ে উপরতলায় নিজের কামরায় ঘুমাচ্ছেন ডন কর্লিয়নি।
কোন অঘটন ঘটার লক্ষণ দেখামাত্র সাবাক্ষণ সনির উপর নজর রাখার চেষ্টা করে টম হেগেন বাড়ির গার্ডরাও বিপদের নিঃশব্দ আঁচ অনুভব করতে পেরেছে, আশপাশের ঘর থেকে সবাই তারা চলে এসেছে কিচেনে।
ফোনে বোনের সাথে কথা বলছে সনি। সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে চুপচাপ কেউ নড়ছে না একচুল।
এ বিষয়ে কোন সন্দেহ বা প্রশ্ন জাগতে পারে না যে সনির প্রকৃতির মধ্যে যে হিংসাত্মক প্রবৃতিগুলো রয়েছে, ওর শরীরের গভীর কোন রহস্যময় উৎস কে সেগুলোর উৎপত্তি। ওর দিকে যারা চেয়ে আছে তারা সবাই স্পষ্ট দেখতে চ্ছে ওর গলার মোটা রগ আর শিরাগুলো পর্যন্ত রক্তের স্রোতে ফুলে উঠছে। অসীম ঘৃণা আর বিদ্বেষে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে চোখের দৃষ্টি। ওর মুখের প্রতিটি রেখা আর ভাজ জ্যান্ত, সজীব, আড়ষ্ট আর সঙ্কুচিত হয়ে উঠছে প্রতি মুহূর্তে। মূমূর্ষ কোন রোগী তার শেষ প্রাণশক্তির সাহায্যে যখন মৃত্যুর সাথে লড়ে, তার মুখের অবস্থা যেমন ছাইয়ের মত হয়ে যায়, তেমনি ছাইয়ের মত হয়ে গেছে সনির চেহারা। শরীরের ভিতর। অ্যাড্রেনালিনের চাপে কাঁপছে ওর হাত। অথচ গলার আওয়াজ অস্বাভাবিক সংযত আর শান্ত। নিচু গলায় ওর একমাত্র আদরের বোনকে বলছে ও, কোন ভয় নেই তোমার। তুমি শুধু ওখানে অপেক্ষা করো। শুধু অপেক্ষা করো। আর কিছু না। কনিকে আর কিছু বলতে না দিয়ে ক্রেডলে রিসিভার রেখে দিল সনি। নিজের ভিতর রাগের এমন প্রচণ্ডতা অনুভব করছে, নিজেই স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছে ও। বাস্টার্ড, বাস্টার্ড, বাস্টার্ড! কয়েক মুহূর্ত পর বিড় বিড় করে বলল, বাস্টার্ড, বাস্টার্ড, বাস্টার্ড! ঝড় তুলে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল সনি।
সনির মুখের এই বিশেষ ভাবটা খুব ভাল করে চেনা আছে টম হেগেনের। ও জানে, সনি কর্লিয়নিকে এখন বাধা দিতে পারে এমন কেউ দুনিয়ায় জন্মায়নি। এই মুহূর্তে ও সমস্ত যুক্তি-তর্কের বাইরে চলে গেছে। সব, সব করতে পারে এখন ও।
তবে হেগেন সেই সাথে এও জানে যে শহরে যাবার পথে কিছুটা ঠাণ্ডা হবে সনির রাগ, মাথায় তখন বেশি নয়, অল্প-স্বল্প যুক্তি-বুদ্ধিও ফিরে আসবে। কিন্তু তার ফলে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে ও, তবে এরই সাথে নিজের অন্ধ রাগের পরিণতি থেকে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতাটাও বেড়ে যাবে ওর। গাড়ির ইঞ্জিনটা গর্জে উঠতেই বডিগার্ডদেরকে আদেশ করল হেগেন, পিছু নাও! জলদি!
