বুলেটের আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে মুখটা। টেবিলে শুয়ে আছে সনি কর্লিয়নির লাশ। বা চোখটা ভরাট হয়ে আছে রক্তে, মণিটা ফেটে চৌচির। নাকের সেতু ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে, বা দিকের চোয়াল বিধ্বস্ত।
এক সেকেণ্ডের তিন ভাগের এক ভাগ সময়ের জন্যে বনাসেরার কাঁধে একটা হাত রেখে নিজেকে পড়ে যাওয়া থেকে সামলে নিলেন ডন কর্লিয়নি দেখে, আমার ছেলেকে কি বিশ্রী ভাবে মেরেছে ওরা
৩.০৫ সনির অকস্মাৎ মৃত্যু
০৫.
কেন এমন হলো? সনির এই অকস্মাৎ মৃত্যুর জন্যে দায়ী কে? রহস্যের আঁচ পেতে হলে একটু পিছন দিকে তাকাতে হয়।
রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি। শত্রুপক্ষ টের পেয়ে গেছে কর্লিয়নিদের উদ্দেশ্য! পাঁচ পরিবারের উপর মরণ আঘাত হানতে চায় সনি। এটাই হয়তো কাল হয়ে দেখা দিল ওর জন্যে। পচ পরিবারের পাঁচ প্রধানকে খুন করার ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা করতে গিয়েই হয়তো নিজের মৃত্যুকে ডেকে আনল সে। অথবা, সম্ভবত, ওর ভিতর যে রক্ত লোলুপ হিংস্র পিশাচটা ঘুমিয়ে ছিল এতদিন সেটা হঠাৎ করে জেগে উঠে সমস্ত কিছু ধ্বংস করে দিতে গিয়েই ডেকে আনল নিজের সর্বনাশ যে কারণেই হোক বসন্ত আর গ্রীষ্মকালের পুরোটা সময় বিরোধীদলের সমর্থকদের উপর অর্থহীন আঘাত হানতে শুরু করে দিল সনি কর্লিয়নি।
হারলেমে টাটাগ্লিয়া পরিবারের বেশ্যা-ব্যবসা খুব জমজমাট, সেখানে ওদের দালালরা গুলি খেয়ে মারা যাচ্ছে। জাহাজঘাটগুলোয় নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্যে পাঁচ পরিবার গুণ্ডা-বাহিনী মোতায়েন করেছে, তারাও প্রতিদিন দুএকজন করে গুম হয়ে যাচ্ছে–বুকে আর মাথায় বুলেটসহ কারও কারও লাশও পাওয়া যাচ্ছে। শ্রমিকসংঘের কর্মীরা পাঁচ পরিবারের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে জানার পর সনি তাদেরকে সাবধান করে দিয়ে খবর পাঠাল তারা যেন এই যুদ্ধে কোন পক্ষ অবলম্বন না করে। কিন্তু তাতে কোন ফল হলো। কর্লিয়নিদের বুক-মেকার আর মহাজনরা জাহাজঘাটার দিকে ভিড়তেই পারে না। এ পরিস্থিতিতেও ক্লেমেঞ্জাকে তার দলবলসহ সেখানে পাঠাল সনি। ক্লেমেঞ্জার সৈনিকরা অযথা শ্রমিকদের পাইকারীভাবে খুন করে যাচ্ছেতাই কাণ্ড শুরু করে দিল।
এই রোমহর্ষক হত্যাযজ্ঞের কোন মানে নেই, কারণ এর উপর পাঁচ পরিবারের সাথে ওদের যুদ্ধের ফলাফল নির্ভর করে না যুদ্ধ-বিশেষজ্ঞ হিসেবে সনি কৌশলী এবং আশ্চর্য বিচক্ষণ, প্রতিটি খণ্ডযুদ্ধে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করছে সে। কিন্তু একটা জিনিসের অভাব রয়েছে ওর মধ্যে, এই মুহূর্তে সেটার দরকার সবচেয়ে বেশি। সেটা হলো, নিখুঁতভাবে দক্ষতার সাথে পরিকল্পনা করার প্রতিভা এই গুটিা। ডন কর্লিয়নির রয়েছে, কিন্তু বাপের কাছ থেকে গুণটি তার বড় ছেলে পায়নি।
গোটা ব্যাপারটা ভয়ঙ্কর একটা গেরিলা যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। ক্ষতি কোন পক্ষকেই কম স্বীকার করতে হচ্ছে না। নদীর স্রোতের মত টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে দুপক্ষেরই, যোদ্ধারা ও মারা যাচ্ছে অতি অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে অত্যন্ত লাভজনক কয়েকটা পুক-মেকার ঘটি বন্ধ করে দিতে হলো কর্লিয়নিদের। এগুলোর মধ্যে একটা আবার কার্লো রিটসির। এই বুক-মোর ব্যবসা থেকে যা আয় হয় তাই দিয়েই সংসার চলে তার। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মদ ধরুল কার্লো, থিয়েটারের নাচিয়ে গাইয়ে ছুকরা মেয়েগুলোর পিছু নিল সে। এদিকে বাড়িতে বেচারা কনির অশান্তি আর যশার সীমা-পরিসীমা নেই
সনির হাতে উত্তমমধ্যম খাওয়ার পর থেকে কনিকে আর কখনও মারধোর করেনি কার্লো! কিন্তু তাই বলে প্রতিশোধ নিতেও ছাড়ছে না। সেই থেকে কনির সাথে শোয় না সে।
অনেকবার অনেক ভাবে স্বামীর মন গলাতে চেষ্টা করেছে কনি। শেষ পর্যন্ত কার্লোর পা জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে। মন গলেনি কার্লোর নিষ্ঠুর হেসে স্ত্রীকে প্রত্যাখ্যান করেছে সে। নিজের বিছানায় শুতে নেয়নি কনিকে। কার্লোর ধারণা, স্ত্রীকে এভাবে প্রত্যাখ্যান করার মধ্যে এক ধরনের অভিজাত গর্ব এবং আনন্দ আছে, রোমের সম্রাটরা যা উপভোগ করতেন। ঠোঁটের কোণ বাকা করে ব্যঙ্গের সুরে কনিকে সে বলে, যাও, তোমার বড় ভাইজানকে ডেকে আনে ডেকে নিয়ে এসে বলো, তোমার সাথে আমি তে রাজী হচ্ছি না। শুনেই আমাকে পেটাতে শুরু করবে ও, মারের চোটে আমি হয়তো তখুনি তোমাকে নিয়ে শুয়ে পড়ব! যাও। ডাকো!
কিন্তু মুখে যাই বলুক, দেখা হলে যতই নিরুত্তাপ ভদ্রতা দেখাক, কার্লো যমের চেয়েও বেশি ভয় করে সনিকে। বুদ্ধি দিয়ে এটুকু অন্তত পরিষ্কার বুঝতে পারে সে যে সনি তাকে অনায়াসে মেরে ফেলতে পারে। মানুষ মারা সনির জন্যে কোন সমস্যাই নয়, ছেলে-পিলেদের কাছে যেমন কোন সমস্যা নয় পিঁপড়ে মারা। চিন্তা করতে হয় না সনিকে, মনটাকে শক্ত করে নিতে হয় না-ইচ্ছা হলেই দেয় শেষ করে এবং তারপরই ভুলে যায়। কিন্তু কার্লোর পক্ষে ব্যাপারটা তা নয়। মানুষ সে খুন করতে পারবে, কিন্তু সেজন্যে তাকে মনের সবটুকু বল, শক্তি প্রয়োগ করতে হবে, সঙ্কল্পে থাকতে হবে অটল। তারপর কাজটা শেষ হলে নিজেকে সামলাবার জন্যে প্রচুর মদের সাহায্য দরকার হবে তার।
এখানেই প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে সনি কর্লিয়নির চেয়ে মানুষ হিসেবে ভাল সে, অবশ্য এদের সম্পর্কে আদৌ যদি ভাল শব্দটা ব্যবহার করা যায়-সে যাই হোক, এ-কথাটা কিন্তু একবারও মনে হয়নি কার্লোর। সনির মধ্যে ভয়ঙ্কর পাশবিকতা লক্ষ করে মনে মনে হিংসা হয় তার। ইদানীং সনির এই পৈশাচিক নিষ্ঠুরতার কথা লোকের মুখে মুখে ফেরে।
