শরীরটা ঢিল করে দিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরাল নাসেরা। আরও অনেক বিপদের কা ভাবছে সে। কর্লিয়নিদেরকে সাহায্য করলে অন্য মাফিয়া পরিবারগুলো কি অবস্থা করবে তার? কথাটা যদি তাদের কানে যায়, তাকে শত্রু বলে ধরে নেরে ওরা। মাফিয়ারা শত্রুদের সাথে কি আচরণ করে জানা আছে বনাসেরার। কোন সতর্কবাণী নয়, কিছু নয়, স্রেফ খুন করে ফেলবে তাকে। এখন ভাবছে, কি ভীমরতি ধরেছিল তাকে, কি কুক্ষণে সে গড ফাদারের কাছে মেয়ের সম্মান বাঁচাবার জন্যে প্রতিশোধ ভিক্ষা চাইতে গিয়েছিল। ওর স্ত্রীর সাথে ডন কর্লিয়নির স্ত্রীর পরিচয় হয়েছিল যেদিন সেই দিনটাকে অভিশাপ দিচ্ছে সে। অভিশাপ দিচ্ছে নিজেকে, মেয়েকে, স্ত্রীকে! মনে মনে গালাগালি করছে আমেরিকাকে, নিজের সাফল্যকে। কিন্তু, খানিক পর আরেকটা কথা মনে পড়ে যেতে কিছুটা আশার আলো দেখতে পেল সে। ভাবছে, আসলে হয়তো সব নিরাপদেই চুকে বুকে যাবে, কোন বিপদ-আপদ ঘটবে না। ক্ষুরধার বুদ্ধি রাখেন ডন কর্লিয়নি, কাঁচা কাজ করার পাত্র তিনি নন, নিশ্চয়ই গোটা ব্যাপারটা গোপন করার পাকা ব্যবস্থা করবেন তিনি। বনাসেরা অনুভব করছে, যেকোন ভাবে হোক নিজের মাথাটা ঠাণ্ডা রাখতে হবে তাকে, এমন কিছু করা বা বলা চলবে না যাতে তার ভয়টা প্রকাশ হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বড় বিপদ, কোন সন্দেহ নেই, ডন কর্লিয়নির তরফ থেকে আসারই সম্ভাবনা তার, তার স্ত্রীর, তার মেয়ের, এমন কি গোটা জগৎসংসারের চরম সর্বনাশ হয়ে গেলেও ডন কর্লিয়নি, গড ফাদারকে অসন্তুষ্ট করা চলবে না।
কাঁকর বিছানো রাস্তায় গাড়ির চাকার শব্দ। বুকটা ধড়াস করে উঠল বনাসেরার। ঢোক গিলে গলাটাকে স্বাভাবিক করে রাখার চেষ্টা করছে সে। ওদিকে কান দুটো সজাগ হয়ে আছে। সরু গলিটা দিয়ে এসে পিছনের উঠানে থেমেছে। একটা গাড়ি। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে, পা দুটো কাঁপছে একটু একটু। দরজাটা খুলে দিল সে। প্রথমে ভিতরে ঢুকল প্রকাণ্ডদেহী ভোতা চেহারার পাট ক্লেমেঞ্জা। তার পিছনে হিংস্র বুনো জানোয়ারের মত চেহারা নিয়ে দুই যুবক। তিনজনের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না, পাথরের মূর্তির মত নিষ্প্রাণ, কিন্তু। গভীর থম থম করছে। তার দিকে ভাল করে তাকাল না পর্যন্ত, একটা কথা বলল না। প্রত্যেকটা কামরা, বাথরুম, গলি-খুঁজি, স্টোররুম-বাড়ির প্রতিটি ইঞ্চি তন্ন তন্ন করে সার্চ করল ওরা। সার্চ করা শেষ হতে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল ক্লেমেঞ্জা। বুনো চেহারার যুবকেরা রয়ে গেল বনাসেরার সাথে, তাকে যেন পাহারা দিচ্ছে।
অপেক্ষা করছে ওরা। কিন্তু কেউ কারও সাথে কথা বলছে না। ওদেরকে কোন প্রশ্ন করার কোন ইচ্ছা বা সাহস কোনটাই নেই বনাসেরার, তার ভয় ওরা।
তাকে কিছু জিজ্ঞেস করে বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়। কয়েক মিনিট কেটে গেল। হঠাৎ সরু গলি থেকে ভেসে এল আবার একটা গাড়ি আসার শব্দ। শব্দটা ভারী, শুনেই বুঝতে পারল নাসেরা, একটা অ্যাম্বুলেন্স আসছে।
আবার তার বিশাল শরীর নিয়ে উদয় হলো ক্লেমেঞ্জা। তার পিছনে দুজন লোক। তারা একটা স্ট্রেচার বয়ে নিয়ে এল যে দুঃস্বপ্নটা এতক্ষণ ধরে দেখছিল বনাসেরা, সেটা এবার কঠোর বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছে ছাই রঙের কম্বল দিয়ে মোড়া একটা লাশ শোয়ানো রয়েছে স্ট্রেচারে। লাশের হলদেটে পা দুটো খালি, কম্বলের বাইরে একটু বেরিয়ে আছে।
নিঃশব্দে ইশারা করল ক্লেমেঞ্জা। স্ট্রেচারটাকে মেডিসিন রুমে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। উঠানে গাঢ় অন্ধকার, সেখান থেকে আরেকজন এসে ঢুকল আলোকিত অফিসরুমে। তিনি গড ফাদার। ডন কর্লিয়নি।
অসুস্থতার জন্যে আগের চেয়ে অনেক হালকা হয়ে গেছেন, হাঁটছেনও একটু আড়ষ্ট ভঙ্গিতে। টুপিটা হাতে ধরে রেখেছেন, প্রকাণ্ড করোটির উপর চুলগুলোকে আশ্চর্য পাতলা লাগছে। মেয়ের বিয়ের দাওয়াত খেতে গিয়ে সেই শেষ দেখেছিল তাকে বনাসেরা, তারপর আবার আজ দেখা। এক বছরের কিছু বেশি হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে যেন বিশ বছর বয়স বেড়ে গেছে তার। সেই লাবণ্যও নেই চেহারায়, নো একটা ভাব দেখা যাচ্ছে। নিজের বুকের উপর টুপিটা চেপে ধরলেন গড ফাদার। বনানেরাকে বললেন, এই যে, পুরানো বন্ধু, উপকারটা করে দিতে তৈরি আছ তো?
মুখে কথা যোগাল না বনাসেরার, শুধু উপর-নিচে মাথা দোলাল সে। স্ট্রেচারের পিছু পিছু মেডিসিন রুমে ঢুকছেন ডন, ধীর পায়ে তাকে অনুসরণ করছে। বনাসেরা। প্রতিটি টেবিলের দুপাশে নালি রয়েছে। একটা টেবিলে কম্বল মোড়া লাশটা নামানো হলো। টুপি নেড়ে ইঙ্গিত করলেন ডন। সাথে সাথে কামরা থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল সবাই।
কি করতে হবে আমাকে? ফিস ফিস করে জানতে চাইল নাসেরা।
নির্নিমেষ দৃষ্টিতে টেবিলটার দিকে তাকিয়ে আছেন ডন কর্লিয়নি। তমার সমস্ত সাধ্য, সমস্ত নিপুণতা, সারা জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করতে বলছি। ওর মা ওকে এভাবে দেখুন তা আমি চাই না। ধীর পায়ে এগোচ্ছেন ডন। টেবিলের পাশে এসে দাঁড়ালেন। হাত বাড়ালেন ছাই রঙের কলটার দিকে। এক সেকেণ্ড শূন্যে স্থির হয়ে থাকল তার হাতটা। তারপর আস্তে করে লাশের উপর থেকে সরিয়ে নিলেন কম্বলটা। বহু বছরের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও নিজের অজান্তে আতঙ্কিত একটা শব্দ বেরিয়ে এল বনাসেরার গলা থেকে। প্রচণ্ড ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল তার শরীর। অবিশ্বাসে কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে চোখের মণি দুটো।
