হ্যাঁ।
উনি যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছেন সেজন্যে তাহলে যীশুকে ধন্যবাদ দিই। প্রশ্নের মত শোনাল নাসেরার কথাটা।
ফোনের অপরপ্রান্তে কয়েক সেকেও কোন শব্দ নেই, তারপর আশ্চর্য নিচু গলায় বলল হেগেন, হ্যাঁ। কট করে কেটে গেল ফোনের কানেকশন।
দর দর করে ঘামছে নাসেরা। শোবার ঘরে এসে শার্ট বদলাল, চোখে-মুখে পানি ছিটাল, কুলকুচি করল। কিন্তু দাড়ি কামাল না, গলায় নতুন টাইও বাধল না। টেলিফোন করল সহকারীকে। জানাল, সামনের সীটিংরুমে যে শোকবিহ্বল পরিবারটি রয়েছে তাদেরকে ছেড়ে কোন অবস্থাতেই কোথাও যেন না যায় সে। বসেবা মনে মনে ঠিক করেছে বাড়ির যে অংশে ল্যাবরেটরির কাজ হয় সেখানে থাকবে সে নিজে। সহকারকে কোন প্রশ্ন করার অবকাশ না দিয়ে বলল তার নির্দেশ যেন অমান্য করা না হয়।
এখনও খাওয়া শেষ হয়নি ওর স্ত্রীর। গায়ে কোটটা চাপিয়ে এঘরে বসেরা আসতেই অবাক চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকল সে।
বাইরে আমার কাজ আছে, বলল বনাসেরা! স্বামীর চেহারা দেখে কোন প্রশ্ন করতে সাহস পেল না স্ত্রী দ্রুত বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এল নাসেরা। ফিউনারেল পার্লারে পৌঁছুল সে পায়ে হেঁটে।
বাড়িটা বিরাট, সাদা রেইলিং দিয়ে ঘেরা। বড় রাস্তা থেকে সরু একটা গলি চলে গেছে সেটার পিছন দিকে। গলিটা এতই সরু যে কোএকমে একটা অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে পারে। গেট খুলল নাসেরা, সেটাকে খোলা রেখেই সরু গলিটা ধরে বাড়ির পিছন দিকে চলে এল। পিছনের দরজাটা বেশ চওড়া। ভিতরে ঢোকার সময় দেখল শোকে মুষড়ে পড়া আত্মীয়-স্বজনরা তাদের সদ্যমৃত প্রিয়জনকে শেষবারের মত দেখার জন্যে সামনের দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকছে।
বেশ অনেক বছর আগে আরেকজন আণ্ডারটেকারের কাছ থেকে এই বাড়িটা কিনেছে বনাসেরা। তখন বাড়ির ভিতর ঢুকতে হলে দশ প্রস্থ সিঁড়ি ভাঙতে হত বিকট একটা সমস্যা ছিল সেটা। বয়োবৃদ্ধ কিংবা শোকে মুহ্যমান আপনজনেরা তাদের প্রিয় মৃত ব্যক্তিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসে আবিষ্কার করত দশটা সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার শক্তি এখন নেই তাদের। তখনকার মালিক অবশ্য এইসব লোককে মাল তোলার একটি লিফট ব্যবহার করতে দিত! বাড়ির পাশেই ছিল সেটা, ছোট একটা মঞ্চের মত উপরে উঠে যেত। সাধারণত কফিন আর লাশ তোলার কাজেই ব্যবহার করা হত লিফটটাকে। মাটির নিচে নেমে যেত প্রথমে, তারপর উঠত গিয়ে একেবারে বৈঠকখানায়। কফিন রাখার জায়গার পাশেই চোরা একটা দরজা আছে, সেটা খুলতে হলে শোকে কাতর লোকজনদেরকে তাদের চেয়ার সরিয়ে নিতে হত। এই চোরা দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকতে হত দুর্বল বুড়োদের।
ব্যাপারটা অশোডন আর কৃপণতার পরিচয় বলে মনে হয়েছি বনাসেরার। ভাই বাড়িটার সামনের দিকটা আমূল সংস্কার করেছে সে।প্রবেশ পথটা সিঁড়িসহ তুলে ফেলে দিয়ে সে-জায়গায় অল্প ঢালু একটা পথ তৈরি করে নিয়েছে, কফিন-বাক্স আর লাশ তোলার জন্যে লিফটটাও আছে।
বাড়ির একেবারে ভিতর দিকে, কয়েকটা বসার ঘরের পিছনে সাউণ্ডপ্রুফ কামরাটা আণ্ডারটেকারের সেরেস্তা, সেটা আবার কয়েক ভাগে ভাগ করা। মেডিসিন দিয়ে মৃতদেহ তাজা রাখার ব্যবস্থা করতে হয়, তার জন্যে আলাদা ঘর। কফিন রাখার জন্যে আরেকটা কামরা, সেখানে বড় তালা মারা ছোট্ট একটা খুপরিতে রাখা হয় রাসায়নিক দ্রব্যাদি আর বিদঘুঁটে চেহারার নানা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। অফিস রুমে ঢুকে ডেস্কের পিছনে আরাম কেদারায় বসল বনাসেরা। এবাড়িতে যতক্ষণ থাকে, সিগারেট প্রায় খায় না বললেই চলে, কিন্তু নিজের অজান্তে একটা ক্যামেল সিগারেট ধরাল সে। এখন তার অপেক্ষার পালা। ভাগ্যে কি আছে, জানে না। মাথার ভিতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তিনি আসছেন। ডন কর্লিয়নি।
অপেক্ষার প্রতিটি সেকেণ্ড অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে কাটছে তার। ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে না জানলেও কি কাজ করতে বলা হবে তাকে সে ব্যাপারে কোন ভুল ধারণা বা এতটুকু সন্দেহ নেই তার মনে। নিউ ইয়র্কের পাঁচ পরিবার গত প্রায় এক বছর ধরে যুদ্ধ করছে কর্লিয়নিদের সাথে যুদ্ধে হতাহতের খবর প্রতিদিন ছাপা হচ্ছে খবরের কাগজে। শুধু ছাপা হচ্ছে বলে কিছুই বলা হয় না, প্রতিটি খবরের কাগজ ওদের খুন-খারাবির খবরেই ভরাট হয়ে থাকে। দুপক্ষই অগুনতি লোকজন হারাচ্ছে। বনাসেরার ধারণা, কর্লিয়নি নিশ্চয়ই এখন এমন কাউকে খুন করেছে যার লাশ আবিষ্কার হতে দেয়া যায় না, নিশ্চয়ই সেই লোকটা প্রতিপক্ষের কর্তা ব্যক্তিদের একজন হবে। সেজন্যেই নাশটাকে গুম করতে চাইছে কর্লিয়নিরা, একেবারে নেই করে দিতে চাইছে। তা করতে হলে একজন রেজিস্টার্ড সমাধি ব্যবসায়ীর সাহায্য একান্ত দরকার ওদের। সেই পারে আইন এবং বিধিমতে একটা লাশকে কবর দিতে। এর চেয়ে উত্তম, উৎকৃষ্ট আর নিরাপদ উপায় আর কি হতে পারে?
এই কাজটা করতে গিয়ে নিজের জন্যে কি ধরনের বিপদ ডেকে আনছে সে ব্যাপারেও কোন ভুল ধারণা নেই বনাসেরার। ডন কর্লিয়নির আদেশ মেনে নেয়ার অর্থ হবে খুন গোপন করতে খুনীকে সাহায্য করা। খুনের সহায়তাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে তাকে। ব্যাপারটা অবশ্য জানাজানি হওয়া না হওয়ার উপর নির্ভর করবে। জানাজানি হয়ে গেলে বছরের পর বছর জেলের ঘানি টানতে হবে তাকে। ধূলোয় লুটাবে তার পারিবারিক সম্মান। তার মেয়ে আর স্ত্রীর দিকে লোকে আঙুল তুলে বলবে, ওদের বাড়ির কর্তা হত্যাকাণ্ডে সহায়তা করার জন্যে জেলে গেছে। শুধু তাই নয়, মাফিয়াদের একজন চর বলে মনে করা হবে তাকে। জীবনে যে কখনও অন্যায়ভাবে একটা পয়সা কামায়নি, যে সারাটা জীবন চেষ্টা করেছে সং থাকার, তাকে দেশের সবাই জানবে কুখ্যাত মাফিয়াদের নোক বলে।
