খাবার পর সাধারণত একটা ঘুম দেয় বনাসেরা। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে, আরেকবার দাড়ি কামিয়ে, প্রচুর পাউডার মেখে দাড়ির ঘন বাড় গোপন করে রাখে। সুগন্ধি ওষুধ দিয়ে কুলকুচি করা তার একটা অভ্যাস। শ্রদ্ধা প্রকাশ করার জন্য পরিষ্কার গেঞ্জি, ধবধবে সাদা শার্ট কার্লো টাই, গাঢ় রঙের নতুন ইস্ত্রি করা স্যুট, মান কার্লো জুতো, কার্লো মোজা পরে। তার এই বেশভূষা দর্শকদের মনে সান্তনা এনে দেয়। কলপ দিয়ে চুল কার্লো করে রাখে বনাসেরা, যদিও ওর সমবয়সী ইতালীয় পুরুষদের কারও মধ্যে এান চপলতা দেখা যায় না। তবে এটা কোন সৌখিনতা নয় বনাসেরার। এখানে-সেখানে পেকে গিয়ে বিচ্ছিরি কাঁচা-পাকা চেহারা হয়েছে ওর চুলের। ওর ধারণা, চুলের এই দুরকম রঙ ওর পেশার জন্যে শোডন নয়।
সুপ খাওয়া শেষ হতে সামনে মাংসের ছোট একটা স্টেক এনে রাখল ওর স্ত্রী, সেই সাথে কয়েক চামচ সবুজ পালং শাক, তেল গড়াচ্ছে তা থেকে। অল্প খাওয়া দাওয়া করে বনাসেরা। সবশেষে এক পেয়ালা গরম কফি হাতে নিয়ে একটা ক্যামেল সিগারেট ধরাল। অভাগিনী মেয়েটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। আর কখনও আগের চেহারা ফিরে পাবে না বেচারী। বাইরের চেহারা মোটামুটি ফিরিয়ে আনা গেছে, কিন্তু চোখে আহত পশুর মত এমন একটা ভীত-সন্ত্রস্ত ভাব এসে গেছে যে মেয়ের দিকে তাকাতে পারে না বনাসেরা। আপাতত তাকে বোস্টনে পাঠিয়ে দেবার সেটাও একটা কারণ। সময়ে ক্ষতগুলো ঠিকই সেরে যাবে, ব্যথা আর ভয়ের চেহারা তো আর মৃত্যুর মত স্থায়ী নয়। মৃতদেহ নাড়াচাড়া করাই পেশা ওর, সেই অভিজ্ঞতা থেকে জানে, ভয় আর আঘাতের ধাক্কা ঠিকই কাটিয়ে উঠবে তার মেয়ে।
কফি খাওয়া সবে শেষ হয়েছে, এই সময় বৈঠকখানার টেলিফোনটা ঝনঝন। শব্দে বেজে উঠল। স্বামী বাড়িতে থাকলে স্ত্রী কখনও ফোন ধরে না, তাই উঠে দাঁড়াল বনাসেরা। ফোনের দিকে এগোচ্ছে সে, সেই সাথে টাই আর শার্টের বোতাম খুলছে। এবার একটু ঘুম দেব, ভাবছে সে। রিসিভার তুলে সবিনয়ে জানতে চাইল, হ্যালো?
আমি টম হেগেন, অপরপ্রান্ত থেকে কর্কশ, বেসুরো কণ্ঠস্বর ভেসে এল। ডন কর্লিয়নির অনুরোধে তার তরফ থেকে আপনার সাথে কথা বলছি।
মাখাটা ঘুরে উঠল আমেরিগো বনাসের। পেটের ভিতর পাক খেয়ে উপর দিকে উঠে আসতে চাইছে কফিটা। অতি কষ্টে বমি বমি ভাবটা দমন করছে সে। তার মেয়ে যাদের হাতে সম্মান খুইয়েছিল তাদেরকে উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে ডন তাকে ঋণী করে রেখেছেন, সে যে ঋণী হয়ে থাকল তা সে ডনের কাছে স্বীকারও করেছিল। বিনিময়ে, যদি কখনও প্রয়োজন হয়, সেই দেনার পরিবর্তে একটা উপকার চাইতে পারেন বলে তাকে জানিয়ে রেখেছিলেন ডন। যারা তার মেয়ের সর্বনাশ করেছিল তাদের রক্তমাখা মুখ দেখে তখন বনাসেরার মনে হয়েছিল ডনের জনো পারে না এমন কোন কাজ নেই দুনিয়ায়। কিন্তু ডনের কাছে ঋণ স্বীকার করার পর এক বছরের বেশি পেরিয়ে গেছে। সময় বয়ে যাবার সাথে সাথে রূপের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষয় হয় কৃতজ্ঞতাবোধ হঠাৎ সামনে সর্বনাশ দেখলে মানুষের। মন যেমন বিষিয়ে ওঠে বনাসেরারও তাই হলো একটা একটা করে শব্দ উচ্চারণ করে উত্তর দিল সে, কিন্তু গলার কম্পনটা তাতে চাপা দেয়া গেল না। হ্যাঁ। বুঝেছি বলুন। শুনছি।
হেগেনের কণ্ঠস্বরে ঠাণ্ডা হিম একটা ভাব লক্ষ করে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে বনাসেরা। কনসিলিয়রি ইতালীয় নয় বটে, কিন্তু তার ব্যবহারে ভদ্রতার অভাব কখনও দেখেনি সে। কি এমন হয়েছে যে এখন এমন চাছাছোলা, অমার্জিত ভঙ্গিতে কথা বলছে? কোন কারণই অনুমান করতে পারছে না বনাসেরা।
আপনার কাছে একটা উপকার পাওনা আছে ডন কর্লিয়নির। আপনি তার কাছে ঋণী। আপনার সেই ঋণ শোধ করার সময় হয়েছে। আপনি তা শোধ করবেন; এ-বিষয়ে তার মনে কোন সন্দেহ নেই। দেনা শোধ করার এই সুযোগটা পেয়ে আপনি খুশি হবেন, তাও তিনি জানেন। এখন থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে, তার আগে নয়, একটু দেরি হতে পারে, তিনি আপনার প্রতিষ্ঠানে আসছেন। পাওনা। উপকারটা নেবেন বনে এত কথা বলছে হেগেন, অথচ কেমন যেন অপরিচিত লাগছে তার কণ্ঠস্বর। এমন ঠাণ্ডা কিন্তু কঠিন ভঙ্গিতে তাকে কখনও কথা বলতে শোনেনি বনাসেরা। তাকে অভ্যর্থনা করার জন্যে আপনাকে উপস্থিত থাকতে হবে। কর্মচরীরা কেউ ওখানে থাকতে পারবে না। ছুটি দিয়ে সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিন। এতে যদি কোন আপত্তি বা অসুবিধে থাকে আপনার, এখুনি বলুন। আমি আপনার আপত্তির কথা তাকে নিয়ে দিচ্ছি। আরও অনেক বন্ধু আছে তার, এ কাজটা করে দিতে পারবে তারা।
বিষম ভয় পেয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠল বনালেরা, আপনি এ কি বলছেন? গড় ফাদারের আদেশ মানব না, তা আপনি ভাবতে পারছেন কিভাবে? তার যে কোন হুকুম পালন করে আমি তার কাছে আমি ঋণী, সে-কথা কি করে ভুলে যাই? এখুনি আমি রওনা হয়ে যাচ্ছি আমার কাজের জায়গায়।
আগের চেয়ে একটু কোমল শোনাল হেগেনের কণ্ঠ, ধন্যবাদ ও প্রশ্নটা আমার আপনি যে ঋন শোধ করবেন সে-ব্যাপারে কোন সন্দেহই নেই ডনের মনে! আজ তাঁর এই উপকারটা আপনি করুন, পরে যে-কোন বিপদে আমার কাছে এলে আমার ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব পাবেন আপনি।
কথাটা শুনে আরও ঘাবড়ে গেল বনাসের। তোতলাচ্ছে সে, আ-আজ রাতে ডন নি-নিজে আসবেন আ-আমার কাছে?
