যুদ্ধের জন্যে শক্তিবিন্যাস করার সময় পরিবারের এই সব ত্রুটি-বিচ্যুতি আর দুর্বলতা সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন হয়ে উঠল সনি, কিন্তু এই সব দোষ-দুর্বলতা দূর করে পরিবারটিকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাবার কোন উপায় নেই ওর হাতে। পরিবারের কর্তা তো আর সে নয়, ক্যাপোরেজিমি বা কনসিলিয়রি বদল করার ক্ষমতা একমাত্র ডনেরই থাকে। তাছাড়া নতুন করে পা ভাগ-বাটোয়ারা করলেই যে সব সমস্যা মিটে যাবে ব্যাপারটা তাও তো নয়, তাতে বরং কাউকে কাউকে বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্যে প্ররোচনা দেয়া হয়ে যাবে। বিপদের উপর বিপদ ডেকে আনার কোন ইচ্ছা এই পরিস্থিতিতে সম্ভবত ডনেরও হত না।
প্রথম দিকে মনে মনে ঠিক করেছিল সনি, ডন সুস্থ হয়ে আবার নেতৃত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত যেমন চলছে চলুক সব, চরন কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির চেহারায় আমূল পরিবর্তন আনার চেষ্টা সে করবে না। কিন্তু কয়েকটা ব্যাপার নতুন করে ঘটতে শুরু করায় চিন্তিত হয়ে উঠেছে সে। পলিসি ব্যাংকাররা ঝাঁকে ঝাকে দল ছেড়ে চলে যাচ্ছে, গিয়ে হাত মেলাচ্ছে পাঁচ পরিবারের সাথে। শত্রুপ ভয় দেখাচ্ছে, জুলুম করছে বুক-মেকারদের। মানুষের চোখে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছে কর্লিয়নি পরিবার। মান-মর্যাদা আর সম্মান কমে যাচ্ছে দিনে দিনে। সনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। পাল্টা আঘাত হানবে সে।
বুদ্ধিটা ভালই পাকাল সনি। ঠিক করল, পাঁচ পরিবারের একেবারে ধূলে আঘাত করবে সে। মোক্ষম একটা মাত্র চাল চালবে, পাঁচ পরিবারের পাঁচ কর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেবে।
উদ্দেশ্যটা ভয়ঙ্কর। তাই আঁটঘাট বেঁধে কাজটায় হাত দিল সনি। জটিল, অতি গোপনীয় একটা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ফেঁদে পাঁচ পরিবারের পাঁচ কর্তার গতিবিধির উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে সে।
বুদ্ধিটা ভাল, কিন্তু ধোপে টিকল না। প্রাথমিক আয়োজ্বন শুরু করেছে সনি, এক হপ্তাও কাটেনি, অকস্মাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে পাঁচ পরিবারের পাঁচ কর্তা এমনভাবে গা ঢাকা দিলেন যে কোথাও তাদের ছায়া পর্যন্ত দেখা গেল না আর।
দুই পক্ষ এখন সমান সতর্ক। এটাই সামগ্রিক যুদ্ধ শুরু হবার পূর্ব-মূহূর্ত। পাঁচ পরিবার আর কর্লিয়নি সামাজ্যের মধ্যে এবার চালমাৎ অবস্থা।
৩.০৪ আমেরিগো বনাসেরার ব্যবসা
০৪.
আমেরিগো বনাসেরার ব্যবসা হলো মৃতদেহ সাজানো এবং সমাধিস্থ করা। সে একজন আণ্ডারটেকার। তার প্রতিষ্ঠানটা মালবেরী স্ট্রীটে, বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয়। তাই রোজই বৈকালিক নাস্তা খেতে বাড়ি আসে সে। তারপর আবার কাজের জায়গায় ফিরে যায়। সেখানে গভীর, বিষণ্ণ পরিবেশে সাজিয়ে রাখা হয় লাশগুলো। তাদের আত্মীয়-বন্ধুরা শোক প্রকাশ করার জন্যে আসে, শোক-বিফল মানুষগুলোকে সঙ্গ দেয় বনাসেরা।
ওর ব্যবসা সংক্রান্ত খুঁটিনাটি নানা অতি গুরুত্বপূর্ণ আনুষঙ্গিক অনুষ্ঠান সম্পর্কে কেউ ঠাট্টা তামাশা করলে সাঙ্ঘাতিক বিরক্ত হয় বনাসেরা। অবশ্য ওর বাড়ির কেউ, আত্মীয় বা প্রতিবেশীরা এ বিষয়ে কখশোই তামাশা করে না। শত শত বছর ধরে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পেটের রুটি যোগাড় করে যারা, তারা কোন পেশাকেই অশ্রদ্ধার চোখে দেখে না।
নিরেট, মজবুত আসবাব-পত্র দিয়ে সাজানো বনাসেরার বাড়িটা। স্ত্রীর সাথে সাপার খেতে বসেছে সে। পাশেই খাবার রাখার র্যাকে গিলটি করা কুমারী মেরীর মূর্তির সামনে লাল কাঁচের গম্বুজের ভিতর মোমবাতির শিখা কাঁপছে। একটা ক্যামেল সিগারেট ধরিয়ে, এক গ্লাস আমেরিকান হুইস্কি হাতে নিয়ে আরাম করে বসে আছে সে। দুপ্লেট ধুমায়িত গরম সুপ এনে টেবিলে রাখল স্ত্রী। বাড়িতে এখন ওরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। মেয়েকে বোস্টনে তার খালার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে, যাতে সেই দুই দত্তের হাতে পড়ার ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা আর আঘাতের কথা ভুলতে পারে। বদমাশ দুটোকে অবশ্য ডন কর্লিয়নি উপযুক্ত সাজাই দিয়েছিলেন।
সুপ খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল স্ত্রী, আজ আবার কাজে যাচ্ছ নাকি গো?
আমেরিগো বনাসের উপর-নিচে মাথা দোলাল। স্ত্রী ওর কাজকে শ্রদ্ধার চোখে দেখলেও, এই কাজের মাহাত্ম সে ঠিক বুঝে ওঠে না। স্বামীর কাজের কারিগরি দিকটার গুরুত্ব সব চাইতে কম, এটা তার মাথায় ঢোকে না। আর সব লোকের মত তারও ধারণা লোকে ওকে টাকা দেয়, কারণ ওর হাতের কৌশল এতটাই নিপুণ যে কফিনে শোয়া মৃতদেহগুলোকে একেবারে জ্যান্ত বলে মনে হয়। সন্দেহ নেই, এ-বিষয়ে ওর দক্ষতা অপরিসীম। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও জরুরী ব্যাপার, মৃতের জন্যে নিশিপালনে ওর ব্যক্তিগত উপস্থিতি। রাতেপ্রিয়জনের কফিনের পাশে আত্মীয়-বন্ধুদের অভ্যর্থনা জানাবার জন্য শোকাহত পরিবারটি এসে পৌঁছায়, তখন আমেরিগো বনাসেরাকে ছাড়া তাদের চলে না।
শোকাহত পরিবারের কাছে কর্তব্যনিষ্ঠ অভিভাবক সে। মুখ আশ্চর্য গাভীর্য, অথচ কত শক্তি যোগায়, কত সান্ত্বনা দেয়। কণ্ঠস্বর অবিচলিত, অথচ নিচু পর্দায় নামানো। শোক-প্রকাশ অনুষ্ঠানের সেই তো পরিচালক। অশোডন শোকোচ্ছাস শান্ত করতে পারে সে, উন্মাদ ছেলেমেয়েদের শান্ত করতে মা-বাপের মনের জোরে না কুলোলে বনাসেরা তাদের শাসন করে। সমবেদনা জানাতে গিয়ে কখনও সে বাড়াবাড়ি করে না, আবার কোন সময় অবহেলাও দেখায় না। একবার প্রিয়জনের শেষ-পরিচর্যার জন্যে যারা বনাসেরার কাছে এসেছে, বারবার তারা ফিরে আসে তার কাছে! বনাসেরাও পৃথিবীর মাটির উপর সেই শেষ ভয়ঙ্কর রাতে ওদের কাউকে পরিশ্রাগ বা অনাদর করে না।
