পুলিশকে খুন করা আর সরকারপ্রধান বা রাজাকে খুন করা একই কথা। এই হত্যাকাণ্ডের নায়কের ক্ষমা নেই। কিন্তু যেই রটে গেল যে খুন হবার সময় ক্যাপটেন ম্যাকক্লাস্কির সাথে তার বন্ধু হিসেবে পরিচিত কুখ্যাত ড্রাগ-ব্যবসায়ী ছিল, তাছাড়া কাউকে কাউকে খুন করার ষড়যন্ত্রের সাথে সে-ও জড়িত ছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, অমনি প্রতিশোধ নেবার ইচ্ছাটা ধীরে ধীরে কমে আসতে শুরু করল পুলিশের মন থেকে। তাছাড়া, এত কড়াকড়িভাবে আইন প্রয়োগ করে সব বেআইনী কাজ অচল করে দিলে তাদের নিজেদের উপায়টা কি হবে? যে-যাই বলুক, বাড়ি করার জন্যে বাংক থেকে লোন নিতে হয়েছে, প্রতি মাসে সুদসহ কিস্তির টাকাটা তো মেটাতে হবে। ছেলেমেয়েদের ভাল খাওয়া-পরার ব্যবস্থা তো করতে হবে, তাদেরকে পুঁজি দিয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার সুযোগ তো করে দিতে হবে। বেআইনী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এতদিন নিয়মিত যে টাকাটা পেয়ে এসেছে তা হঠাৎ যদি অনির্দিষ্ট কালের জন্যে না পায়, পুলিশদের সংসারই বা চলে কি করে? যে-সব হকার আর ফেরিওয়ালাদের লাইসেন্স নেই তাদের কাছ থেকে দুপুরের খাওয়ার পয়সাটা জুটে যায়। অজায়গায় গাড়ি রাখে যারা তারা কয়েক ডলার জরিমানা দেয়া আর আনুষঙ্গিক ঝামেলা এড়াবার জন্যে খুচরো পাঁচ-দশ সেন্ট ওদের হাতে গুঁজে দিয়ে রেহাই পেয়ে যায়। সমকাম, মারামারি বা কোন সন্দেহজনক আচরণের জন্যে যাদেরকে থানায় নিয়ে আসা হয় তাদের কাছ থেকেও বেশ কিছু আদায় হয়। কিন্তু ক্যাপটেন ম্যাকক্লাস্কি খুন হবার পর থেকে এ ধরনের সব রোজগারের রাস্তা একেবারে বন্ধ। একজন বজ্জাত, নীতিচ্যুত অফিসারের জন্যে তারা সবাই কেন দুর্ভোগ পোহাবে? কেন বঞ্চিত হবে? একটা অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠছে ক্রমশ পুলিশদের মধ্যে।
শেষ পর্যন্ত উপরওয়ালাদের মন গলল। দয়া হলো। ঘুসের রেট বাড়িয়ে দিয়ে মাফিয়া পরিবারগুলোকে তাদের ব্যবসা চালাবার অনুমতি দিলেন তারা।
থানায় তৈরি হলো আবার নতুন চাদা আদায়ের তালিকা, চাদার কই ভাগ কে পাবে তাও নির্দিষ্ট করে দেয়া হলো। এতে করে সবকিছু আগের মত স্বাভাবিক আর পরিবেশটা ঠাণ্ডা হয়ে এল, তা নয়। তবে সামাজিক শৃঙ্খলা বেশ খানিকটা ফিরে এল।
.
টম হেগেনের প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাপনায় হাসপাতালে ডন কর্লিয়নি যে কামরাটিতে রয়েছেন সেটি পাহারা দিচ্ছে একটা প্রাইভেট গোয়েন্দা সংস্থা। তবে শুধু এদের। উপরই সব দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়নি ওরা। গোটা হাসপাতালটাকে কড়া প্রহরার মধ্যে রেখেছে টেসিওর দলের জবরদস্ত সৈনিকরা। কিন্তু এত কিছুর পরও সন্তুষ্ট হতে পারছে না সনি। তার ইচ্ছাতেই ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সম্পূর্ণ নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে আসা হলো ডনকে।
অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে নিজের বাড়িতে এলেন ডন। ইতিমধ্যে কিছু সংস্কার করা হয়েছে বাড়িটার। হাসপাতালের একটা কামরার মত দেখতে হয়েছে তার শোবার ঘরটা। তার শরীরের অবস্থা হঠাৎ যদি আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে, তখন চিকিৎসা সংক্রান্ত যা কিছু দরকার হতে পারে তার সবই যোগাড় করে এই ঘরে রাখা হয়েছে। বাছাই করা কয়েকজন নার্সের উপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তার সেবা এষা করার, এদের জন্মের ইতিহাস থেকে শুরু করে জীবনের সমস্ত ঘটনার খুঁটিনাটি পরীক্ষা করে তবে বহাল করা হয়েছে চাকরিতে। ডনের কখন কি দরকার হয়, সেজন্যে রাতদিন চব্বিশ ঘণ্টা তার মাথার পিছনে এবং খাটের দুপাশে পালা করে দাঁড়িয়ে থাকে এরা। মোটা টাকা ফি দিয়ে এই ব্যক্তিগত হাসপাতাল-ঘরটার আবাসিক চিকিৎসক হতে রাজী করানো হয়েছে ড. কেনেডিকে।
নতুন কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের পর উঠানটা এখন একেবারে দুর্ভেদ্য একটা দুর্গ হয়ে উঠেছে। বাড়তি বাড়িগুলো এখন আর খালি নেই, সশস্ত্র সৈনিকদেরকে নিয়ে এসে রাখা হয়েছে সেগুলোয়। এই বাড়িগুলোয় এর আগে পর্যন্ত যারা বসবাস করছিল। তাদেরকে সমস্ত খরচপত্র ছাড়াও আরও কিছু বেশি টাকা দিয়ে ইটালীতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে, তারা যে যার গ্রামে গিয়ে ছুটি কাটাচ্ছে এখন।
শরীর আর মন সুস্থ করার জন্যে লাস ভেগাসে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে ফ্রেডিকে। সেখানে সৌখিন হোটেল আর জুয়া খেলার ক্যাসিনো তৈরি করছে কর্লিয়নি পরিবার। স্বাস্থ্য উদ্ধারের সাথে সাথে ব্যবসাও দেখাশোনা করবে ফ্রেডি। লাস ভেগাস পশ্চিম তীরের মাফিয়া সামাজ্যের একটা অংশ, ওই সামাজ্যের অধিপতিরা কেউ নিউ ইয়র্কের ছয় পরিবারের যুদ্ধে নাক গলায়নি। ওখানকার ডন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি জীবিত থাকতে ফ্রেডির কোন বিপদ হবে না।
নিউ ইয়র্কের পাঁচটা পরিবার ফ্রেডি কোথায় আছে জানার পরও তার দিকে হাত বাড়াল না। যুদ্ধে কর্লিয়নিদের পক্ষে ফ্রেডির কোন অবদান নেই, তাকে খতম করে কোনদিক থেকে কোন লাভ নেই, বরং লোকসান। কেননা ফ্রেডিকে যারা আশ্রয় দিয়েছে তারা পচ পরিবারের নতুন শত্রু হিসেবে উদয় হবে। নিউ ইয়র্কের ঝামেলা সামলাতেই তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত, দূরে শত্রু সৃষ্টি করে ঝামেলা আর বাড়াতে চায় না কেউ।
কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন ড. কেনেডি, ব্যবসা সংক্রান্ত কোনও আলোচনা ডনের সাথে বা তার সামনে করা চলবে না। সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হচ্ছে সেই নিষেধ। সকলের আপত্তি কানে না তুলে নিজের ইচ্ছায় তার কামরায় বৈঠক বসিয়েছেন ডন। হাসপাতাল থেকে প্রথম যেদিন বাড়ি ফিরলেন, সেই রাতেই সবাইকে ডেকে পাঠালেন তিনি। সনি, টম হেগেন, পীট ক্লেমেঞ্জা আর টেসিও তার কামরায় এসে জড়ো হলো।
