ক্যাপটেন ম্যাকক্লাস্কি খুন হবার পর পরই অনেকগুলো খবরের কাগজ সলোযোর দুষ্কর্মের সাথে তাকে জড়িয়ে নানান বিবৃতি আর কাহিনী ছেপেছে। ওই সব কাহিনী থেকে নিচ্ছিদ্র প্রমাণ পাওয়া গেল মৃত্যুর অল্প কদিন আগে কোথাও থেকে বেশ মোটা অঙ্কের নগদ টাকা পেয়েছিল ক্যাপটেন। পুলিশ বিভাগের জানার কথা নয় ওই বিবৃতি আর কাহিনীগুলো টম হেগেন নিজেই তৈরি করেছে। কিন্তু কাহিনীর তথ্যগুলো মিথ্যে নয়, সবই সত্য অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সেগুলো সংগ্রহ করতে হয়েছে কর্লিয়নি পরিবারের কনসিলিয়রিকে। পুলিশ বিভাগ এইসব কাহিনীর বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ তোলেনি, আবার সায় বা সমর্থনও দেয়নি। তবে তাদের এই মৌনব্রত অবলম্বনেরও বিশেষ তাৎপর্য আছে।
যেসব ইনফর্মার আর পুলিশ কর্মচারী কর্লিয়নিদের টাকা খায় তারাও এই জটিল, গুরুতর পরিস্থিতিতে কাজ দিচ্ছে। তাদের রিপোর্টে তারা পুলিশ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছে ক্যাপটেন ম্যাকক্লাস্কি একজন নীতিভ্রষ্ট অফিসার ছিল। টাকা খাওয়া অথবা সাফ ঘাস খাওয়া, এ তো খুবই সাধারণ আর স্বাভাবিক ব্যাপার, সেটা তেমন কোন অপরাধ বা নিন্দাযযাগ্য কাজ বলে গণ্য করে না কেউ। ক্যাপটেন ম্যাকক্কাস্কি আর সব অফিসারের মত এ-ধরনের অল্প নোংরা টা খেত, তাতে কিছু এসে যায় না। কিন্তু কর্লিয়নিদের বেতনভুক ইনফর্মার আর পুলিশ কর্মচারীদের রিপোর্টে উল্লেখ করা হলো, নোংরা টাকার মধ্যে সবচেয়ে যেটা মলিন সেই টাকাটাও গোগ্রাসে গিলে ফেলত ক্যাপটেন ম্যাককুাস্কি। তার মানে খুনীর কাছ থেকে টাকা খেয়ে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মিথ্যে রিপোর্ট লিখত সে, আর ড্রাগ ব্যবসায়ীদেরকে ব্যবসা চালাবার সুবিধে করে দেবার বিনিময়ে টাকা খেত। এ দেশের গোটা পুলিশ জাত কয়েকটা ব্যাপারে কঠোর নীতি মেনে চলে, সেই নীতি অনুযায়ী খুনের বা ড্রাগ-ব্যবসার টাকা খাওয়া ভয়ঙ্কর অপরাধ, সে-অপরাধের কোন ক্ষমা নেই।
পুলিশের লোকেরা আশ্চর্য সরলতার সাথে আইন-শৃঙ্খলা মেনে চলে, এটা জানা আছে টম হেগেনের। জনসাধারণের সেবায় নিয়োজিত ওরা, এবং জনসাধারণের চেয়ে অনেক বেশি আইন-শৃঙ্খলা মেনে চলে। আইন-শৃঙ্খলা তো একটা যাদু, আর এই যাদুই তো ওদের সমস্ত ক্ষমতার উৎস। প্রত্যেকটি পুলিশ এই ক্ষমতাটাকে তার নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতা বলে মনে করে। কারণ ব্যক্তিগত ক্ষমতা দুনিয়ার প্রায় সব পুরুষ মানুষই কামনা করে।
অথচ, যাদের সেবায় নিয়োজিত ওরা, সেই জনসাধারণের উপর সব সময় তুষের আগুনের মত একটা চাপা আক্রোশ রয়েছে ওদের মনে। ওরা মানুষের অধিকারের রক্ষক যেমন, তেমনি ভক্ষকও বটে নাগরিকদেরকে রক্ষা করে ওরা, অথচ এতটুকু কৃতজ্ঞতবোধ নেই তাদের, শুধু গাল দেয়, শুধু কুৎসা রটায়। বাপের চাকর বলে মনে করে ওদেরকে, শুধু ফরমাস করে, শুধু দাবি জানায়। কিন্তু একটু ছিলতে গেলে, একটু শোষণ করতে গেলে বা একটু শান্তি দিতে গেলে ধরা দেবে না ওরা, পিছলে বেরিয়ে যাবে। সাঙ্ঘাতিক চতুর আর বিপজ্জনক ওরা, কতরকম ছল চাতুরী যে জানে তার হিসেব নেই। যদি বা একজনকে নিজেদের খপ্পরে আনতে পারে পুলিশ, সাথে সাথে ফেসমাজকে তারা রক্ষা করে আসছে সেই সমাজই তার সমস্ত কৌশল আর ক্ষমতা প্রয়োগ করে এত কষ্টে ধরা শিকারটিকে তাদের হাত থেকে ছো মেরে কেড়ে নিতে চায়। রাজনৈতিক নেতারা দুর্নীতিপরায়ণ বেআইনী ব্যবসায়ীকে বাঁচাবার জন্যে নিজেদের ক্ষমতা ব্যবহার করে। কুখ্যাত গুণ্ডা বদমায়েশকে লঘু সাজা দেয় জজ সাহেবরা, তারপর সে-সাজাও আবার রদ করে দেয়। পুলিশদের বিশ্বাস, দুষ্কর্ম করার আগেই দুষ্কৃতকারীদেরকে খালাস করার ব্যবস্থা উকিল সাহেবরা যদি করতে না পারতেন, তাহলে গভর্নর মহোদয়রা আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট স্বয়ং অপরাধীদের বিচার অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে স্রেফ মাফ করে দেবার আইন জারি করতেন।
সময় বয়ে যাবার সাথে সাথে পুলিশরাও বুঝতে শিখল, তাদেরও চোখ খুলতে শুরু করল। গুণ্ডা আর দুর্নীতিবাজরা টাকা সাধে, সে টাকা না নিয়ে কেন তারা ঠকতে যাবে? টাকার দরকার পুলিশদেরই তো সবচেয়ে বেশি। তারাই তো সেবা দেয়, বিনিময়ে কেন তাদের ছেলেমেয়েরা ভাল খেতে-পরতে পাবে না? কেন তাদের ছেলেমেয়েরা ভাল স্কুল-কলেজে গিয়ে লেখাপড়া শিখে মানুষ হবার সুযোগ পাবে না? তাদের স্ত্রীরা অভিজাত সুপারমার্কেটে গিয়ে কেন দামী দামী বিলাস আর শখের জিনিস কিনতে পারবে না? তারা নিজেরাই বা কেন ছুটিছাটার সময় ফ্লোরিডার সাগরসৈকতে গিয়ে মিষ্টি রোদ পোহাবে না? এসবের বিরুদ্ধে যে যাই বলুক, এ-কথা তো ঠিক যে ওরা নিজেদের প্রাণের উপর ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করে। সেটা কি ছেলেখেলা ব্যাপার? চাট্টিখানি কথা? সুতরাং কেন তারা ঘুস না। খেয়ে নিজেদের আর স্ত্রী-কন্যা-পুত্রদের বঞ্চিত করবে?
তবে, সাধারণভাবে প্রায় সব পুলিশই নোংরার মধ্যে সবচেয়ে মলিন টাকা খেতে আপত্তি করে। গোপন জুয়ার আড্ডাখানার মালিকদের কাছ থেকে টাকা খায় ওরা, বিনিময়ে তারা যাতে নির্বিমে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে সেদিকে নজর রাখে। ড্রাইভাররা পার্কিং এলাকার বাইরে কোথাও গাড়ি রেখে অথবা বেঁধে দেয়া স্পীড লিমিটের চেয়ে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালিয়ে ধরা পড়লে টাকার বিনিময়ে তাদেরকে ছেড়ে দিতে আপত্তি নেই ওদের। পকেটে কিছু এলে খারাপ মেয়েমানুষ আর বেশ্যাদেরকেও ব্যবসা চালিয়ে যেতে দেয়। এ-ধরনের নগণ্য দুর্নীতি করা তো মানুষের পক্ষে খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু ডাগ-বিজনেস, সশস্ত্র ডাকাতি বা রাহাজানি, ধর্ষণ, খুন এবং এই জাতের বিকৃত-বীভৎস আর সব অপরাধকে নগণ্য অপরাধ বলে মনে করে না ওরা, এসব ক্ষেত্রে সাধারণত টাকা খেতে রাজী হয় না। তার কারণ, ওদের বিশ্বাস, এই জাতের সাঙ্ঘাতিক অপরাধগুলো ওদের ব্যক্তিগত ক্ষমতার একেবারে উৎসমূলে গিয়ে আঘাত হানে। এগুলোকে মেনে নিলে ওদের ক্ষমতার উৎস ধ্বংস হয়ে যাবার ভয় রয়েছে, তাই এই ধরনের অপরাধ সহ্য করতে রাজী নয় ওরা।
