চারদিকে সচকিত করে দিয়ে ছুটে এল আরেকটা গাড়ি, ঘ্যাঁচ করে থামল সেটা সনির গাড়ির পিছুনে। লাফ দিয়ে নিচে নামল সনির দুজন বডিগার্ড। কিন্তু সনির বীভৎস আচরণ দেখে তারাও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল একচুল এগোবার সাহস পেল না। সতর্ক, সজাগ হয়ে রাস্তা আর ঘটনার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখে দাঁড়িয়ে আছে তারা। নির্বোধ কোন পথিক বা আর কেউ যদি কার্লোকে সাহায্য করতে বা সনির ক্ষতি করতে এগিয়ে আসে, তাদেরকে বাধা দিতে হবে যা ঘটে ঘটুক, মনিবের নিরাপত্তার দিকটা আগে দেখবে তারা।
দৃশ্যটার সবচেয়ে রোমহর্ষক বিষয় হলো, সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে আছে কার্লো। তবে সেজন্যেই বোধহয় এ-যাত্রা প্রাণে বেঁচে গেল সে। লোহার মোটা রেলিংটাকে দুই হাত দিয়ে এমন শক্তভাবে জড়িয়ে ধরে আছে, কোনমতে তাকে টেনে নামাতে পারল না সনি। সনির চেয়ে কম শক্তিশালী নয় সে, কিন্তু আশ্চর্য, পাল্টা আঘাত করতে রাজী হলো না। পড়ে পড়ে বেদম মার খাচ্ছে, নাক-মুখ দিয়ে বাতাসের সাথে বিদঘুঁটে শব্দ বেরিয়ে আসছে, কিন্তু রুখে দাঁড়াবার কোন চেষ্টাই নেই তার মধ্যে। তার ঘাড়ে, মাথায়, পাজরে ঘুষির পর ঘুষি মারছে সনি, বেকে যাচ্ছে কার্লোর শরীর, মোচড় খাচ্ছে, কিন্তু রেলিং তবু ছাড়ছে না সে। পাল্টা আঘাত না দিলে কতক্ষণ একতরফা আঘাত করা যায় একজনকে, ধারে ধারে রাগ পড়তে শুরু করেছে সনির। থামল সে বিশাল বৃকটা দ্রুত ওঠানামা করছে তার। নিজের জায়গা থেকে নড়ছে না এখনও। বলল, কুত্তার বাচ্চা, সাহস থাকে তো ফের আমার বোনের গায়ে হাত তুলিস। খুন করব তোকে।
হাঁফ ছেড়ে বাচল সবাই। সনির শাসানি শুনে বুঝে নিল, কার্লোকে মেরে ফেলার ইচ্ছা অন্তত এই মুহূর্তে নেই ওর। তার মানে, নতুন জীবন ফিরে পেল কার্লো। সন্দেহ নেই, এটা তার একটা পরম সৌভাগ্য। তবে সনির কণ্ঠস্বরে হতাশার সুরটা কারও কান এড়াল না। এ-থেকে এটাও বুঝে নিল সবাই, কার্লোকে খুন করার ইচ্ছাই রয়েছে সনির, কিন্তু এই মুহূর্তে সেটাকে কাজে পরিণত করা যাচ্ছে না।
থর থর করে কাঁপছে কার্লোর শরীরটা। মুখ তুলে সনির দিকে একবার তাকাল না পর্যন্ত। এখনও সে দুহাতে রেলিং জড়িয়ে ধরে মাথাটাকে ঘাড়ের মাঝখানে গুঁজে বসে আছে। স্টার্ট নিল গাড়ি দুটো, গর্জন তুলে ঝড়ের বেগে চলে গেল আবার। কিন্তু তবু একটু নড়ছে না কার্লো।
স্নেহময় বাবার মত অদ্ভুত কোমল স্বরে কোচ বলল, যা হবার হয়েছে, কার্লো, ওঠো এবার। চলো, দোকানে যাই। সবাই দেখছে।
এতক্ষণে রেলিং ছেড়ে দিয়ে, সিঁড়ির ধাপে হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকা শরীরটা নিয়ে উঠে দাঁড়াবার সাহস পেল কার্লো। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল সে, দেখল, ছেলে আর লোকজনদের ভিড় জমে গেছে রাস্তার উপর, সবাই তার দিকে হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরেকজন মানুষকে চরম অপমানিত হতে দেখলে প্রায় সব মানুষকেই এই রকম হতচকিত দেখায়। মাথা ঘুরছে কার্লোর। সেটা বিকট আতঙ্কের জন্যে, মার খেয়ে আহত হয়েছে বলে নয়। ধরে নিয়েছিল সে, সনি তাকে খুন করার জন্যেই এসেছে। প্রাণ রক্ষার একমাত্র খোলা পথটাই বেছে নিয়েছিল তাই। পাল্টা আঘাত করেনি, করলে সনি তাকে জীবিত রেখে ফিরে যেত না। ঘূষিগুলো গায়ের সবটুকু শক্তি দিয়ে মেরেছে সনি, কিন্তু তাতে খুব যে একটা জখম হয়েছে কার্লো তা নয়। শরীরের স্পর্শকাতর জায়গাগুলো নাগালের মধ্যে পায়নি সনি। নিরেট পেশীর উপর পড়েছে সবগুলো ঘুষি।
দোকানের পিছন দিকের কামরায় নিয়ে এল তাকে কোচ। ঘাড়, কাধ আর মুখে বরফ দিচ্ছে সে। মুখটা কোথাও কেটেকুটে যায়নি, রক্তের কোন ছাপ নেই সেখানে, শুধু এখানে সেখানে ফুলে ফেঁপে গেছে, কার্লো দাগ পড়ে গেছে। আঙ্কটা কেটে গেছে এতক্ষণে, কাপুনিটাও থেমেছে। কিন্তু যে অপমান সইতে, হয়েছে, তার কথা মনে পড়ে গেলেই গা গুলিয়ে উঠছে তার, গল গল করে বেশ খানিকটা বমিও করল। ওর মাথাটা মুখ ধোবার একটা গামলার উপর রেখে পানির কল ছেড়ে দিল কোচ। আর এক হাতে ধরে আছে ওকে, বমি করাবার সময় মাতালকে যেমন,ঠেক দিয়ে রাখতে হয়। ধরে ধরে দোতলায় নিয়ে এসে একটা কামরায় ওকে শুইয়ে দিল সে। স্যালি র্যাগস কখন এক ফাঁকে গায়েব হয়ে গেছে, জানতেই পারেনি কার্লো।
থার্ড এভিনিউয়ে চলে এসেছে স্যালি ব্যাগস। ফোন করে সমস্ত ঘটনার সবিস্তার বর্ণনা দিচ্ছে সে রকো ল্যাম্পনিকে। এতটুকু উত্তেজিত না হয়ে সব নল রকো ন্যাম্পনি। মাথা ঠাণ্ডা রেখে তখুনি সে ফোন করে গোটা ব্যাপারটা জানিয়ে দিল তার ক্যাপোরেজিমি পীট ক্লেমেঞ্জাকে।
কি সর্বনাশ! এই সনি আর তার মেজাজকে নিয়ে আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়া গেল দেখছি! আঁতকে উঠে বলল ক্লেমেঞ্জা। কিন্তু কথাটা বলার সময় ফোনের কানেকশন কেটে দিল সে, একটা শব্দও শুনতে পায়নি রকো ল্যাম্পনি।
দেরি না করে সাথে সাথে লং বীচের বাড়িতে ফোন করল ক্লেমেঞ্জা। টম হেগেনকে ধরল সে। সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল হেগেন, তারপর বলল, তাড়াতাড়ি, পীট! এক সেকেণ্ড দেরি না করে লং বীচের রাস্তায় তোমার কজন লোককে পাঠাও। ট্রাফিক জ্যাম কোন অ্যাক্সিডেন্টে পড়ে সনি যদি আটকা পড়ে যায়! ওর এই রাগ আমার চেনা আছে, মাথায় একবার রক্ত চড়ে গেলে নিজের নিরাপত্তার কথা পর্যন্ত ভুলে যায়। কিছুই বলা যায় না, আমাদের বিরোধী-পক্ষরা হয়তো জানে শহরে গেছে সনি। যদি জেনে থাকে, এ-সুযোগ তারা হাতছাড়া নাও করতে পারে।
