ব্লু ল, মানে খেলা নিয়ন্ত্রণ করার আইন বহাল থাকায় রবিবার দিন বেলা দুটোর আগে কোন খেলা শুরু হয় না। প্রথমদিকের বাজিগুলো ধরতে আসে অধিকাংশ বিবাহিত লোকেরা, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যেতে হবে এদেরকে, তা না হলে স্ত্রী আর বাচ্চাকাচ্চাদের নিয়ে সাগরসৈকতে বেড়াতে যাওয়া হবে না। এর পরের দলে অবিবাহিত লোকই বেশি থাকে, তবে কিছু দায়িত্বহীন বিবাহিত লোকও এই দলে থাকে, যারা স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদেরকে গরম ফ্ল্যাটে ফেলে স্বার্থপরের মত একা বেরিয়ে আসে। এই অবিবাহিত বাজি ধরার দলটা পাকা জুয়াড়ী, এরা বাজিও ধরে মোটা টাকার। প্রথমবার বাজি ধরে সন্তুষ্ট হবার পাত্র নয় এরা, ঘুরেফিরে আবার চারটের দিকে ফিরে আসে, দ্বিতীয়বার বাজি ধরে। রবিবারে অতিরিক্ত খাটুনিটা এদের জন্যেই দিতে হয় কার্লোকে। তবে বিবাহিত কিছু লোকও সাগরসৈকত থেকে ফোনের সাহায্যে বাজি ধরে, প্রথমবার লোকসান হয়ে থাকলে দ্বিতীয়বার চেষ্টা করে দেখে সেটা পূরণ করা যায় কিনা।
বেলা দেড়টা। ভিড় পাতলা হয়ে গেছে জুয়াড়ীদের। একটু দম নেবার জন্যে স্যালি র্যাগসকে সাথে নিয়ে দোকানের বাইরে বেরিয়ে এল কার্লো দোকানের পাশেই উঁচু একটা বারান্দা, সেটার সিঁড়ির ধাপে বসল ওরা। একপাল উঠতি বয়সের ছেলে ডাংগুলি খেলছে রাস্তায়, সেদিকে তাকিয়ে আছে দুজন। খানিক পর ওদের সামনে দিয়ে একটা পুলিশের গাড়ি.চলে গেল। সেটাকে দেখেও দেখল না ওরা। পুলিশের হেডকোয়ার্টার থেকে এই জুয়ার আস্তানাটাকে উদার প্রশ্রয় দেয়া হয়, এরা যাতে সম্পূর্ণ নিরাপদে কাজ চালিয়ে যেতে পারে সেদিকে পুলিশের বড়কর্তাদের কড়া নজর আছে, তাই স্থানীয় পুলিশরা এদের ধারে কাছে ঘেষতে সাহস পায় না। দোকানে হানা দিয়ে যদি কখনও খানা-তল্লাশি করা হয়ও, পুলিশ ডিপার্টমেন্টের প্রথম সারির কর্তাদের তরফ থেকে আসতে হবে হুকুমটাকে। কিন্তু হুকুম নিঃ পুলিশের গাড়ি পৌঁছুবার আগেই খবর পেয়ে যায় এরা, ফলে সাবধান হবার সময় পায়। শেষ পর্যন্ত আপত্তিকর কিছু না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যেতে হয় পুলিশকে।
একটু পর দোকান থেকে কোচও বেরিয়ে এল, সিঁড়ির ধাপে বসল ওদের সাথে। বেস বল আর মেয়েমানুষ সম্পর্কে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করল ওরা। হাসছে কার্লো। বলল, আজও বৌটাকে একটু পিট্টি দিতে হলো। সংসারটা কার কথায় চলবে, সেটা ওকে শেখাচ্ছি আর কি।
কথার পিঠে কথা বলার সুরে জানতে চাইল কোচ, তার না ছেলে হবার সময় হয়ে এসেছে?
আরে না, তেমন কড়া ভোজ দিইনি, বলল কার্লো। দুগালে কটা চড় চাপড়, তার বেশি কিছু না। একটু চুপ করে থেকে ভারি গলায় আবার বলল, আমাকে ভেড়া ভেবেছে আর কি, নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতে চায়–মেয়েমানুষের কথায় উঠব-বসব, আমি কি সেই পাত্র!
দোকানের সামনে আর আশপাশে এখনও ঘুর ঘুর করছে জুয়াড়ীরা। গরম পড়েছে, শার্টের বোতাম খুলে বাতাস লাগাচ্ছে গায়ে। কয়েকজন হাটাহাটি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, কার্লো আর তার রাইটারদের ওপরের ধাপে এসে বসল তারা। আচমকা ডাংগুলি খেলা ছেড়ে উঠতি বয়সের ছেলেগুলো যে যেদিকে পারল ছুটে পালাল, চোখের নিমেষে হাওয়া সব। বিকট শব্দে গোটা এলাকাটাকে সচকিত করে তুলে বিদ্যুৎগতিতে ছুটে এল একটা গাড়ি, ঘ্যাচ করে দোকানের সামনে ব্রেক কষল সেটা, টায়ারের সাথে রাস্তার ঘষা লেগে তীক্ষ্ণ কান ঝালাপালা করা শব্দ হলো। গাড়িটা এখনও পুরোপুরি থামেনি, ডাইভিং সীট থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল। একজন লোক। দমকা বাতাসের মত ছুটে আসছে সে। ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত হয়ে গেছে সবাই। একচুল নড়ার শক্তি নেই কারও।
প্রকাণ্ড কিউপিড মুখ আর বাকা ধনুক ঠোঁট প্রচণ্ড রাগে ঝুলে পড়েছে সনি কর্লিয়নির। বিকৃত, বীভৎস দেখাচ্ছে চেহারাটা। চোখের পলকে সিঁড়ির ধাপ কটা লাফ দিয়ে টপকে এল ও, লোহার মত কঠিন দুই হাত দিয়ে পেঁচিয়ে ধরল কার্লোর গলা। দম বন্ধ হয়ে মারা যেতে বসেছেকার্লো,.পাঁচ থেকে সাত সেকেণ্ডের বেশি পেরোয়নি সময়। এতক্ষণেশ হলো আর সবার। সনিকে বাধা দেবার কথা কারও মনে উঁকিও দিল না, তবে কার্লোকে তারা ধরে রাখতে চেষ্টা করছে, তাও মাত্র কয়েকটা সেকেণ্ডের জন্যে। আসলে নিজেদের এই আচরণের মধ্যে দিয়ে কার্লোকে মাফ করে দেবার সবিনয় অনুরোধ জানাচ্ছে তারা, কিন্তু মুখে কিছু বলার স্পর্ধা দেখাতে যাচ্ছে না। কার্লোকে টেনে-হিঁচড়ে রাস্তায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে সনি। কোচ আর স্যালি র্যাগ বুঝল, তাদের মৌন অনুরোধ রক্ষা করতে রাজী নয় সনি কর্লিয়নি। সময় থাকতে থাকতেই কার্লোর কাছ থেকে এক পা করে পিছিয়ে এল দুজন। প্রচণ্ড শক্তি দিয়েও কার্লোকে টেনে নামাতে পারছে না সনি, বারান্দার মোটা লোহার রডের রেলিং জড়িয়ে ধরে ঝুলে আছে সে। কুঁকড়ে গেছে। তার শরীর, দুই বিশাল কাঁধের মাঝখানে মাথাটা গুঁজে রেখেছে। তার গায়ের শার্টটা ফড় ফড় করে ছিঁড়ে এল সনির হাতে।
কার্লোকে টেনে নামাতে পারবে না বুঝতে পেরে আরও হিংস্র হয়ে উঠেছে সনি।
এরপর যা ঘটতে শুরু করল, চোখ মেলে দেখা যায় না। কোচ আর স্যালি র্যাগস অসুস্থ বোধ করছে, যে-কোন মুহূর্তে বমি করে ফেলতে পারে। জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকা কার্লোকে মেরে ফেলছে সনি, দেখে অন্তত তাই মনে হচ্ছে ওদের। দুই হাত এক করে প্রকাণ্ড একটা মুঠো পাকিয়ে কার্লোর কাঁধ, ঘাড় আর পিঠে দমাদম আঘাত করছে সনি। জোড়া হাতের প্রতিটি ঘুষি দূর থেকে ভেসে আসা তোপ দাগার মত দুম দুম আওয়াজ তুলছে। প্রতিটি আওয়াজের সাথে কেঁপে উঠছে। কোচ আর সালির শরীর। গরিলার মত বিশাল শরীর কার্লোর, গায়ে অসূরের মত শক্তি, কিন্তু তবু সে বাধা দিচ্ছে না সনিকে, প্রতিবাদ করছে না, একটা শব্দ উচ্চারণ করে দয়া ভিক্ষা চাইছে না। নিঃশব্দে, নিজেদের অজান্তেই আরও এক পা করে পিছিয়ে গেল কোচ আর স্যালি। কিছু বলবে সে স্পর্ধা নেই তাদের। দেখেশুনে বুঝতে পারছে সনি তার ভগ্নীপতিকে বোধহয় খুনই করে ফেলবে। কার্লোর সাথে রক্তাক্ত লাশ হয়ে কবরে নামার ইচ্ছা নেই তাদের। ডাংগুলি খেলা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ছেলেগুলো ফিরে এসেছে আবার, ইচ্ছা খেলা নষ্ট করার জন্যে গাড়ির ড্রাইভারের সাথে ঝগড়া করা। কিন্তু সেসব ভুলে গিয়ে বিমূঢ় বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে তারা সনি আর কার্লোর দিকে। উঠতি বয়সের তাগড়া জোয়ান ছেলে ওরা, গায়ে শক্তি রাখে, কিন্তু তারা সবাই মিলেও সাহস পেল না এগিয়ে এসে বাধা দেয় সনিকে।
