সামনে একটু ঝুঁকে পড়ল সনি, বোনের মুখের অক্ষত দিকটায় আলতোভাবে চুমো খেলো একটা। তারপর সিধে হয়ে দাঁড়াল। ঘুরে, লম্বা লম্বা পা ফেলে দ্রুত বেরিয়ে গেল কামরা থেকে।
.
ঈস্টসাইড, একশো বারো নম্বর স্ট্রীট। একটা মিষ্টির দোকান। দোকানটার দুপাশে লম্বা লাইন ধরে দুই সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এই দোকানটাই কার্লোর বুক মেকিং ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র।
দোকানের সামনে চওড়া ফুটপাথ, সেখানে বাচ্চা ছেলেমেয়েদের সাথে তাদের বাবারা বল লোফালুফি খেলছে। রোববার, ছুটির দিন, দোকানে বাজি ধরার জন্যে এসেছে বাবারা, সাথে করে বেড়াতে নিয়ে এসেছে ছেলেমেয়েদের। কার্লো আসছে দেখে, খেলা ভেঙে দিল বাবারা। ছেলেমেয়েদের চেঁচামেচি থামাবার জন্যে তাদেরকে আইসক্রীম কিনে দিল। নিজেদের সামনে প্রায় সবাই এরপর খবরের কাগজ মেলে ধরল, কাগজে ছাপা রয়েছে খেলা শুরু করবে যারা সেই সব পিচারদের তালিকা। দুনিয়াদারির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে আজকের বেসবল খেলায় কে জিতবে না জিতবে, কার উপর বাজি ধরা যায় এই সব চিন্তায় মশগুল হয়ে পড়েছে সবাই।
দোকানে ঢুকে পিছনের বড় কামরাটায় চলে এল কার্লো।
কর্মীদেরকে রাইটার বলা হয়। সংখ্যায় তারা দুজন। স্যালি র্যাগস, পাকানো দড়ির মত চেহারা। আর প্রকাণ্ডদেহী কোচ। কাজ শুরু হবে, সেজন্যে তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছে ওরা। লম্বা লাইন টানা প্যাড রয়েছে ওদের সামনে। এগুলোয় বাজির হিসাব লেখা হবে। কাঠের স্ট্যান্ডের মাথায় রয়েছে একটা ব্ল্যাকবোর্ড, তাতে সুপার লীগের মোলোটা বেসবল দলের নাম লেখা হয়েছে চক দিয়ে। কোন দলের সাথে কোন্ দল খেলছে তাও দেখানো হয়েছে পাশাপাশি নাম লিখে। প্রত্যেক একজোড়া নামের পাশে একটা করে খোপ আঁকা আছে। আজকের বাজির অসম সংখ্যা, যাকে বলা হয় অডস, ওই খোপে লেখা হবে।
দোকানের ফোন ট্যাপ করা আছে? কোচকে জিজ্ঞেস করল কার্লো।
মাথা নাড়ল কোচ। না, এখনও বন্ধ ট্যাপ।
এগিয়ে গিয়ে ওয়াল টেলিফোনের সামনে দাঁড়াল কার্লো। ডায়াল করল একটা। নাম্বারে। অপরপ্রান্ত থেকে শুনে দ্রুত আজকের খেলার সব অডস নোট করছে সে। চুপচাপ, গভীরভাবে তাকে লক্ষ করছে কোচ আর স্যালি র্যাগ। রিসিভার যথাস্থানে রেখে দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে এসে দাঁড়াল কার্লো। নোটবই দেখে সব কটা খোপে এক এক করে অডস লিখে রাখছে। নিঃশব্দে এখনও তাকিয়ে আছে। কর্মীরা কার্লোর দিকে। কার্লো জানে না, কিন্তু সংখ্যাগুলো আগেই পেয়ে গেছে তারা। কার্লোর লেখা সংখ্যাগুলোর সাথে নিজেদের জানা সংখ্যাগুলো মিলছে কিনা দেখে নিচ্ছে মনোযোগের সাথে।
এই ব্যবসায় ঢোকার পর প্রথম হাতেই ব্ল্যাকবোর্ডে সংখ্যা লিখতে গিয়ে মারাত্মক একটা ভুল করে ফেলেছিল কার্লো। এর ফলে, সব জুয়াড়ীদের যা চিরকালের স্বপ্ন, সেই রকম একটা মিল তৈরি হয়ে গিয়েছিল। একজনের কাছে বোর্ডে লেখা অডস দেখে বাজি ধরা, আরেকজন বুক-মেকারের কাছে আসল অডস অনুসারে বাজি ধরা–এর অর্থ মিডল। এভাবে বাজি ধরতে পারলে জুয়াড়ীর কখনও লোকসান হয় না। লোকসান যা হবার তা শুধু কার্লোর খাতার বা বুকের হয়। কার্লোর ওই একটা ভুলের জন্যে সেই হপ্তায় ছয় হাজার ডলার লোকসান খেতে হয়, তাতে জামাই সম্পর্কে ডনের ধারণাই সমর্থন পায়। যাই হোক এরপর তার তরফ থেকে হুকুম এল, কার্লোর সব কাজ আরেকবার করে যাচাই করে তার নির্ভুলতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে।
এমনিতে কর্লিয়নি পরিবারের কর্তারা দৈনন্দিন কাজকর্মের এইসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কখনোই মাথা ঘামান না। এসব বিষয়ের কোন খবর ওদের কানে কেউ যদি পৌঁছেও দিতে চায় তাকে কমপক্ষে পাঁচটা স্তর এক এক করে টপকে যেতে হবে। কিন্তু বুক-মেকার ব্যবসাটাকে ব্যবহার করা হচ্ছে নতুন জামাইয়ের যোগ্যতা পরিমাপের জন্যে, তাই গোটা ব্যাপারটা রাখা হয়েছে টম হেগেনের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে। কার্লোর কাজের ধরন-ধারণ সম্পর্কে রোজই একটা করে রিপোর্ট পায় হেগেন!
খোপওলো ভরার কাজ শেষ হতেই জুয়াড়ীরা সবাই হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল পিছন দিকের বড় হলঘরটায়। যে যার খবরের কাগজ, খেলার তথ্যের পাশে লিখে নিচ্ছে অডসগুলো। ব্ল্যাকবোর্ড দেখার জন্যে অনেকেই তাদের ছেলেমেয়েদেরকে হাত ধরে নিয়ে এসেছে। খুব বড় বড় বাজি ধরছে এক নোক, সে তার ছোট মেয়েটার হাত ধরে নাড়া দিল, জানতে চাইছে, বলো তো, লক্ষ্মী মা, আজ তোমার কাকে পছন্দ? জায়েন্ট, নাকি পাইরেটদের?
এ ধরনের রোমাঞ্চকর নাম শুনে উত্তেজিত হয়ে উঠল বাচ্চা মেয়েটা। বাপকে প্রশ্ন করল, আচ্ছা, বাবা, কাদের গায়ে জোর বেশি? জায়েন্টদের না পাইরেটদের?
মেয়ের প্রশ্ন শুনে হেসে ফেলল বাবা।
এরপর একদল লোক লাইন দিয়ে দাঁড়াল দুই রাইটার এর সামনে। এক পৃষ্ঠা লেখা শেষ হলেই রাইটার সেটা ছিঁড়ে সংগ্রহ করা টাকাগুলো মুড়ে ফেলছে সেটা দিয়ে, তারপর তুলে দিচ্ছে কার্লোর হাতে। কাগজে মোড়া সমস্ত টাকা নিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল কার্লো, সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠল। দোকানের মালিক আর তার পরিবারের জন্যে একটা কামরা আলাদা করা আছে, সেখানে ঢুকল সে। ফোন করে সেন্টার এক্সচেঞ্জে বাজির তথ্য জানিয়ে দিল আগে, তারপর ওয়ালসেফের ভিতর রেখে দিল টাকাগুলো। পাশেই একটা জানালা; সেটার পর্দা আরেকটু টেনে দিলেই চোখের আড়ালে পড়ে যায় ওয়াল-সেফটা। মিষ্টির দোকানে আবার নেমে আসার আগে বাজির কাগজ পড়িয়ে ফেলল সে, বাথরুমের ড্রেনে ছাইগুলো ফেলে চেনটা টেনে দিল।
