সনি এখন বাড়ি ফিরছে। চারজন বডিগার্ড রয়েছে সাথে। দুজন সামনে, দুজন পিছনে। নিজের গাড়িতে কাউকে নেয়নি সনি। কখনও নেয় না। পাশে বডিগার্ড বসিয়ে রাখার কোন প্রয়োজন দেখে না সে, কেউ যদি সরাসরি আক্রমণ করে তাকে ও নিজেই ঠেকাতে পারবে। নিজেদের দুটো গাড়িতে আসা-যাওয়া করে বডিগার্ডরা। লুসি ম্যানচিনির ফ্ল্যাটের দুপাশে দুটো ফ্ল্যাটে থাকে তারা। মাঝখানের ফ্ল্যাটের উপর সজাগ নজর রাখার ব্যবস্থাও আছে। লুসির সাথে দেখা করতে যাওয়ার মধ্যে বিপদের তেমন কোন ঝুঁকি নেই, খুব বেশি না গেলেই চলে। শহরে ঢুকে সনি ভাবল যাবার পথে ছোট বোন কনিটাকে গাড়িতে তুলে লং বীচে নিয়ে গেলে মন্দ হয় না। ইতিমধ্যে কাজে বেরিয়ে যাবার কথা কার্লোর, শয়তানটা তো আর কনিকে গাড়ি কিনে দেবে না!
কনিদের বাড়ির কাছাকাছি এসে সনি দেখল কার্লো গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ভালই হলো, ভাবল সে, ছুঁচোটার সাথে দেখা হয়ে গেলে আবার হয়তো মাথায় রক্ত চড়ে যেত তার।
বাড়িটার সামনে একটু অপেক্ষা করতে হলো সনিকে। সামনের বডিগার্ড দুজন ভিতরে ঢুকল প্রথমে। তাদের কাছ থেকে ইঙ্গিত পেয়ে তারপর ঢুকল সনি। ঢোকার সময় ঘাড় ফিরিয়ে পিছনের বডিগার্ডদেরকে দেখে নিল একবার। ওর গাড়ির ঠিক পিছনে গাড়ি দাঁড় করিয়েছে তারা। নিচে নেমে সম্পূর্ণ সজাগ সতর্ক ভঙ্গিতে পাহারা দিচ্ছে রাস্তাটাকে।
নিজেও চোখকান খোলা রেখেছে সনি। ও যে শহরে এসেছে তা জানার কথা নয় শত্রুদের। জানার সম্ভাবনা একেবারে যে নেই তা নয়, দশ লাখ ভাগের এক ভাগ সম্ভাবনা, তার বেশি নয়। তবু, জানে সনি, সাবধানের মার নেই কখনও। এই শিক্ষাটা পেয়েছে ও উনিশশো ত্রিশ সালের লড়াইয়ে।
কখনও, ভুলক্রমেও, লিফট বা এলিভেটরে চড়ে না সনি। জানে, এগুলো মৃত্যু ফাঁদ। প্রায় এক ছুটে আট প্রস্থ সিঁড়ি টপকে কনিদের ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়াল ও। কার্লো বেরিয়ে গেছে, তার মানে নিশ্চয়ই একা আছে কনি। কিন্তু নক করছে ও, ভিতর থেকে সাড়া দিচ্ছে না কেন কনি?
আবার নক করল সনি।
এবার সাড়া দিল বটে কনি, কিন্তু গলার আওয়াজটা কেমন যেন অস্থির, কাঁপা কাঁপা ঠেকল সনির কানে।
কে? জানতে চাইল কনি।
বোনের গলার সুরে স্পষ্ট আতঙ্ক রয়েছে, বুঝতে পেরে স্তম্ভিত হয়ে গেল সনি। তার বোনটি তো চিরকালই ভারি চালবাজ, ভারি দেমাকী, কেয়ার করে না কাউকে-বাড়ির আর সবার মতই বেপরোয়া আর শক্ত, তার আবার কি হলো?
আমি সনি, বলল ও।
ছিটকিনি খোলার শব্দ হলো। এক ঝটকায় দরজার কপাট খুলে লাফ দিয়ে বড় ভাইয়ের বুকের উপর পড়ল কনি। তাকে জড়িয়ে ধরে অদম্য কান্নায় ভেঙে পড়ল সে।
একচুল নড়ছে না সনি। স্তব্ধ, পাথর হয়ে গেছে। খানিক পর বোনকে ধরে একটু সরাতেই তার মুখের উপর ফুলে ওঠা ক্ষতগুলো দেখতে পেল ও। মুহূর্তে বুঝে ফেলল কি হয়েছে।
মাথায় আগুন ধরে গেল সনির। এতক্ষণ স্থির পাথরের মত হয়ে ছিল, এখন থরথর করে কাঁপছে শরীরটা। অদম্য একটা ইচ্ছা জাগছে, এই মুহূর্তে নিচে নেমে ধাওয়া করে কার্লোকে, প্রতিশোধ নেয়।
বড় ভাইয়ের মুখের চেহারা হিংস্র, বিকৃত হয়ে উঠেছে দেখে তাকে আরও শক্ত করে ধরে থাকল কনি, কোনমতে ছাড়ল না, জোর করে টেনে নিয়ে এল ঘরের ভিতর। এখনও কাঁদছে সে, কিন্তু অভিমান যা দুঃখে নয়-এখন কাঁদছে স্রেফ ভয়ে। বড় ভাই কেমন রাগী মানুষ, জানা আছে তার। আদরের একমাত্র বোন সে, সে-ও ওকে ভয় করে যমের মত। আর সবার কাছে কার্লোর নামে নালিশ করলেও বড় ভাইয়ের কানে একটা কথাও তোলেনি সে কখনও।
এখনও সনিকে ঠাণ্ডা করার প্রাণপণ চেষ্টা করছে কনি। জোর করে ঘরে টেনে নিয়ে এসে বোঝাচ্ছে। বিশ্বাস করো, আমারই দোষ। শুধু শুধু মেজাজ খারাপ করেছিলাম, কোমর বেঁধে ঝগড়া শুরু করে দিয়েছিলাম–তবু কিছু বলেনি কার্লো। কিন্তু মাথায় ভূত চাপল আমার, ওর গায়ে হাত তুললাম-হাজার হোক পুরুষ মানুষ, আর সহ্য করতে পারল না, তাই একটু মারধোর করেছে। এত জোরে মারত না, কিন্তু আমি তো আর ছেড়ে দিইনি ওকে-জানোই তো, কারও চেয়ে রাগ আমার কম নয়।
প্রকাণ্ড কিউপিডের মত মুখটা থমথম করছে সনির। কিন্তু চেহারায় সেই হিংস্র ভাবটা এখন আর নেই। জানতে চাইল, বাবাকে আজ তুমি দেখতে যাবে নাকি?
চুপ করে আছে কনি, উত্তর দিতে পারছে না।
এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম বাবাকে হয়তো দেখতে যেতে চাইবে তুমি, তাই এসেছিলাম আর কি।
দ্রুত এদিক-ওদিক মাথা নাড়ল কনি। আজ নয়। ওঁরা…ওঁরা আমাকে এই অবস্থায় দেখেন তা আমি চাই না। আরেকদিন…আগামী হপ্তায় যাব।
ঠিক আছে, বলে উঠে দাঁড়াল সনি। রান্নাঘরে ঢুকে ফোন করুল একটা। তারপর আবার কনির কাছে ফিরে এসে বলল, ডাক্তার আসছে, দেখে যাক একবার তোমাকে। এই সময়ে এখন তোমার সাবধানে থাকা একান্ত দরকার। আর কমাস বাকী ছেলে হতে?
দুমাস, বলল কনি। তার দুচোখে ব্যাকুল আবেদন ফুটে উঠল। সনি, তোমার দুটো পায়ে পড়ি-কিছু কোরো না। লক্ষ্মী দাদা, আমার মাথা খাবে, এত বড় সর্বনাশ কোরো না আমার! সনি মুখে কিছু না বললেও ওর চিন্তা-ভাবনা কোন্ খাতে বইছে তা পরিষ্কার বুঝতে পারছে কনি। আতঙ্কে বুকের রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছে তার।
নিঃশব্দে হাসছে সনি। চোখের স্থির দৃষ্টিতে অদ্ভুত একটা নিষ্ঠুরতা উপচে পড়ছে। ভেব না, বোনকে আশ্বাস দিল ও। তোমার ছেলে দুনিয়াতে আসার আগেই তার বাপকে দুনিয়া থেকে বিদায় করব-অত বড় পাষণ্ড আমি নই।
