ব্যাগ থেকে চিঠিটা বের করে কে বলল, এটা তাকে পাঠিয়ে দিতে পারবেন?
বুড়ি ভদ্রমহিলা চিঠিটা নিয়ে কে-র গালে একটা আলতো চাপড় মেরে বললেন, নিশ্চয় পারব।
হেগেন আপত্তি করতে যাচ্ছে, কিন্তু ভদ্রমহিলা ইতালীয় ভাষায় চাচাতে শুরু করলেন। তারপর কে-কে দোরগোড়া অবধি পৌঁছে দিয়ে চট করে গালে একটা চুমো খেয়ে বললেন, মাইকের কথা ভুলে যেও। সে আর তোমার উপযুক্ত নয়।
বাইরে ওর জন্যে অপেক্ষা করছে গাড়ি। সামনের সীটে বসে আছে দুজন লোক। কোন কথা না বলে ওকে একেবারে নিউ ইয়র্কে পৌঁছে দিয়ে গেল তারা। কে-ও কোন কথা বলল না। সে এখন একটা কথা মনের মধ্যে বনাবার চেষ্টা করছে: তার ভালবাসার মানুষটি একজন নৃশংস হত্যাকারী। যার মুখ থেকে এ-কথা বেরিয়েছে তার কথা অবিশ্বাস করা যায় না। কারণ, সে হলো মাইকের আপন মা।
৩.০২ রেগে আগুন কার্লো রিটসি
০২.
গোটা দুনিয়ার উপর রেগে আগুন হয়ে আছে কার্লো রিটসি। কর্লিয়নি পরিবারে বিয়ে করলে কি হবে, ম্যানহাটনের অপার ইস্ট সাইডের একটা ব্যবসা গুছিয়ে দিয়ে দূরে একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছে ওকে। মনে আশা ছিল, লং বীচের উঠানে একটা বাড়ি দেয়া হবে ওকে। জানে, ইচ্ছা করলেই বাড়িগুলো থেকে তার অনুচরদের পরিবারগুলোকে সরিয়ে দিতে পারেন ডন। একটামাত্র বাড়ি খালি করে দিলেই তো জায়গা পেয়ে যায় সে, সেই সাথে কর্লিয়নি পরিবারের সমস্ত লাভজনক ব্যাপারের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা যায়। কিন্তু ডন তা করেননি।
অবজ্ঞা আর ঘৃণার সাথে তাই ভাবছে কার্লো, ভারি তো ছাই মহামান্য ডন। নিধিরাম সর্দার। ফালতু একটা খুদে গুণ্ডা। তা না হলে রাস্তার মাঝখানে গুলি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে? বুড়ো শালা মরল না, সেটাই দুঃখের বিষয়। এক সময় বন্ধু ছিল সনি, এখন যদি পরিবারের মাথা হয়, হয়তো কিছুটা সুযোগ-সুবিধে পাবে সে। একটু সুযোগ পেলেই হয়, কর্লিয়নি পরিবারের গহীন গভীরে নাক ডুবিয়ে দেবে সে।
কফি ঢালছে কনি, তার দিকে তাকাল কার্লো। ইস, কি ছিরির বউই না জুটেছে তার কপালে! বিয়ে হয়েছে এই তো পাঁচ মাস, এবই মধ্যে মেদ জমিয়ে কেমন হস্তিনী হয়ে উঠেছে দেখো! ইস্টসাইডের মাগীগুলো এই রকম বিশ্রী হয়, মনে পড়ে গেল তার।
হাত বাড়িয়ে কনির নরম চর্বিসর্বস্ব নিতম্ব একটু টিপে দিল কার্লো। মুখ তুলে স্বামীর দিকে তাকিয়ে হাসল কনি। তাচ্ছিল্যের সুরে বলল কার্লো, একটা শুয়োরের চেয়েও হ্যাম তোমার গায়ে বেশি। কনির মুখে আহত ভাব আর চোখ ছল ছল করছে দেখে কার্লোর খুশি লাগছে। হতে পারে মহামান্য ডনের মেয়ে, কিন্তু ওর স্ত্রী তো বটে। যেভাবে ইচ্ছা ওড়াতে পারে সে কনির টাকা, যেমন খুশি আচরণ করতে পারে। কর্লিয়নিদের একজন অন্তত তার পাপোশ, কথাটা ভেবেও সুখ। নিজেকে খুব প্রতাপশালী বলেও মনে হচ্ছে তার।
বিবাহিত জীবনটা একেবারে জঘন্যভাবে শুরু করেছে কার্লো। শুরুতেই বিয়েতে উপহার পাওয়া টাকার ব্যাগটাকনির কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। কনি সেটা হাতছাড়া করতে চায়নি বলে তাকে ঘুষি পর্যন্ত মেরেছে সে। চোখের নিচে কালসিটে দাগ নিয়ে কান্নাকাটি করেছে কনি।
টাকা তো নিয়েইছে, কি করেছে সেগুলো দিয়ে তাও সে জানায়নি কাউকে। ব্যাপারটা প্রকাশ হয়ে পড়লে সত্যি সত্যি একটা গণ্ডগোলের সৃষ্টি হবে। এখনও
একটু একটু বিবেকের দংশন অনুভব করে সে। ইস, প্রায় পনেরো হাজার ভাল রেস আর থিয়েটারের মেয়েমানুষদের পিছনে সেফ উড়ে গেল।
টের পাচ্ছে কার্লো, ওর চওড়া পিঠের দিকে তাকিয়ে আছে কনি। হাতটাকে লম্বা করে দিয়ে টেবিলের ওদিক থেকে এক প্লেট মিষ্টি বান তুলে নেবার সময় পেশীগুলোকে তাই একটু ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে খেলিয়ে নিল সে। এই মাত্র হ্যাম আর ডিম গিলেছে, তবে লম্বা-চওড়া মানুষ কিনা, সকালের খাবার একটু বেশিই দরকার হয়। স্ত্রী ওর দিকে তাকিয়ে আছে, সেজন্যে রীতিমত গর্ব অনুভব করছে সে! ওদের চোদ্দ পুরুষ যেমন দেখে এসেছে, সেরকম তেল চকচকে কার্লোভৃত স্বামী তো আর নয় সে। চুল তার সোনালী, কাট। সোনালী লোমে ঢাকা বাহু। মস্ত দুই কাধ। কোমরটা সরু ষাড়ের শক্তি নিয়ে যেসব গুণ্ডারা ওদের হয়ে কাজ করে তাদের চেয়ে অনেক, অনেক বেশি জোর তার গায়ে। ক্লেমেঞ্জা, টেসিও. রকো। ল্যাম্পনি–এদেরকে সে ঘোড়াই কেয়ার করে। আর পলি গাটো নামে ওই ছোকরা তাকে তো কে যেন খতমই করে দিয়েছে কেন, কে মারল তাকে? এর ভিতরের আসল ব্যাপারটা কি•• কে জানে! কেন যেন এর পরপরই সনির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে তার। হাতাহাতি মারামারিতে সনির সাথে টিকে যাবে সে, তবে সনি তার চেয়ে একটু লম্বা, একটু বেশি ভারি। সনি সম্পর্কে যে কুখ্যাতিটা রয়েছে সেটাকেই আসলে ভয় করে সে। সাঙ্ঘাতিক রাগ ওর, কিন্তু রাগী হোক আর যাই হোক, ওকে তো সব সময় হাসিখুশি মুখে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করে বেড়াতেই দেখে সে। অন্তত তার সাথে হেসে ছাড়া কথা বলে না। নাহ, সনিকে ভয় নেই। ও তো বন্ধুই তার। এখন শুধু বুড়ো শালা মরলেই হয় সনির যুগ শুরু হলেই কপাল খুলে যাবে তার।
প্রচুর সময় নিয়ে, ধীরেসুস্থে চুমুক দিয়ে কফিটুকু শেষ করছে সে। এই ফ্ল্যাটে থাকতে হচ্ছে তাকে, কথাটা মনে পড়লেই রাগে আর ক্ষোভে মাথায় রক্ত চড়ে যায় তার। পশ্চিমে বিশাল আকারের বাড়িতে থেকে মানুষ হয়েছে সে, সেগুলোর তুলনায় এটা একটা কবুতরের খোপ ছাড়া কিছু নয়। জায়গাটাও শহরের। উল্টোদিকে, দুপুরবেলার বাজির কাজ শুরু করার জন্যে এখন তাকে লম্বা পথ পাড়ি দিতে হবে। আজ আবার রোববার, হপ্তার অন্যান্য দিনের চেয়ে কাজের চাপ অনেক বেশি আজ। বেসবল তো একদিকে চলছেই, ওদিকে বাস্কেটবলের মরশুম এখনও শেষ হয়নি, তারপর রাতের রেস খেলাও শুরু হলো বলে। হঠাৎ খেয়াল করুল কার্লো, ওর পিছন দিকে ঘুঘুর করছে কনি! ঘাড় ফিরিয়ে পিছন দিকে তাকাল সে। সাজগোজ করছে। সেই শহুরে ঢংয়ে, রঙ মেখে ভূত সাজছে আর কি, মনে মনে চটে উঠে ভাবল! নিউ ইয়র্কের এই চকমকে ফ্যাশন একদম পছন্দ করে না সে। গাউনটা পরেছে কনি রেশমের, সেটায় আবার ফুলের নকশা রয়েছে। বেল্ট দিয়ে বেঁধে নিয়েছে আটো করে। জমকার্লো কারুকাজ করা, চকচকে পাথর বসানো ব্রেসলেট, কানের দুল, শার্টের আস্তিনে কত রকমের কুঁচি আর ভাজ। তাকিয়ে থাকতে থাকতে কার্লোর মনে হচ্ছে, বিশ বছর বেড়ে গেছে ওর বউয়ের বয়স।
