আপনাদের একটা কথাও বিশ্বাস করি না, নিস্তেজ গলায় বলল কে। মনটা খারাপ হয়ে গেছে তার। বুঝতে পারছে, মাইকের চোয়াল ভাঙার কথাটা মিথ্যে হতে পারে না। কিন্তু তাই বলে খুন? কখনও না! অসম্ভব!
মাইকেল কর্লিয়নি যদি আপনার সাথে যোগাযোগ করে, জানতে চাইল ফিলিপস, আপুনি আমাদেরকে জানাবেন কি?
দ্রুত এবং একরোখা ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল কে–জানাবে না।
আপনারা একই কামরায় থাকতেন, রূঢ়, কর্কশ গলায় বলে উঠল সহকারী ডিটেকটিভ সিরিয়ানি, সে-খবর জানা আছে আমাদের। কাগজ-পত্র, সাক্ষী ইত্যাদি সব আছে হোটেলে। কথাটা যদি খবরের কাগজে ছাপিয়ে দিই, আপনার মা-বাবার কেমন লাগবে? ভদ্র পরিবারের মেয়ে আপনি, একজন গুণ্ডার সাথে রাত কাটিয়েছেন, শুনে কারোরই ভাল ধারণা হবে না আপনার সম্পর্কে। নিজের সম্মান। যদি বাঁচাতে চান, সর কথা আমাদেরকে খুলে বলুন, তা না হলে এক্ষুণি আপনার বুড়ো বাপকে ডেকে সব কথা বলে দেব।
অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে কে। এধরনের হুমকি গুনতে হবে তা সে জীবনেও কল্পনা করেনি। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল সে। দরজার দিকে এগোচ্ছে।
এক ঝটকায় খুলে ফেলল দরজাটা কে। দেখল, বৈঠকখানার জানালার সামনে দাঁড়িয়ে পাইপ টানছেন বাবা। বাবা, এখানে একবার আসবে তুমি?
ঘাড় ফিরিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন মি. অ্যাডামস, মিষ্টি করে হাসলেন, তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে পড়ার ঘরে চলে এলেন দরজার চৌকাঠ টপকেই একটা হাত দিয়ে মেয়ের পিঠটা জড়িয়ে ধরলেন তিনি, তাকিয়ে আছেন ডিটেকটিভদের দিকে। বললেন, হ্যাঁ, বলুন।
কে-র আচরণ দেখে দুজন ডিটেকটিভই থ হয়ে গেছে। ওরা কেউ কথাই বলতে পারছে না।
দিন! সিরিয়ানির দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঠাণ্ডা আঁঝের সাথে বলল কে। সব কথা বলে দিন।
চেহারা টকটকে লাল হয়ে উঠেছে সিরিয়ানির। বলল, মি. অ্যাডামস, কথাগুলো আমি আপনার মেয়ের ভালর জন্যেই বলছি। আপনার মেয়ে একটা গুণ্ডার সাথে মেলামেশা করেন। আমাদের বিশ্বাস, এই লোকটা একজন পুলিশ অফিসারকে খুন করেছে–আমি মিস কে-কে বলছি নোকটাকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে তিনি যদি আমাদের সাথে সহযোগিতা না করেন, তাহলে হয়তো বিপদে জড়িয়ে পড়তে পারেন। কিন্তু মুশকিল হলো, ব্যাপারটার গুরুত্ব উনি কিছুতেই বুঝতে চাইছেন না। আপনি কি ওকে একটু বোঝাবার চেষ্টা করে দেখবেন?
আপনাদের বক্তব্য আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না, নরম গলায় বললেন মি. অ্যাডামস।
চিবুক উঁচু করে সিরিয়ানি বলল, আপনার মেয়ে আর ওই গুণ্ডা মাইকেল আজ এক বছর ধরে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও খোলামেলাভাবে মেলামেশা করছেন। আপনি চাইলে আমরা প্রমাণ দেখাতে পারব, স্বামী-স্ত্রী হিসেবে হোটেলে থেকেছে ওরা। আবার বলছি আমি, মাইকেল কর্লিয়নিকেজো হচ্ছে একজন পুলিশ অফিসারকে খুনের সন্দেহে। খোঁজার ব্যাপারে আপনার মেয়ে আমাদেরকে সাহায্য করতে রাজী হচ্ছেন না। এই হলো ব্যাপার। আপনি অবিশ্বাস করতে পারেন, কিন্তু যা বলছি তা আমরা প্রমাণ করতে পারি।
আপনার সব কথা আমি অবিশ্বাস করছি না, মদ গলায় মি. অ্যাডামস বললেন, আমার মেয়ে যা করেছে তার জন্য গুরুতর বিপদ হতে পারে, আপনার এই কথাটা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।
অবাক হয়ে বাবার দিকে চেয়ে আছে কে। সমস্ত ব্যাপারটা বাবা এত হালকা ভাবে নিতে পারছেন দেখে অবাক হয়ে গেছে সে।
যাই হোক, একটা বিষয়ে আপনারা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, দৃঢ়কণ্ঠে মি, অ্যাডামস বললেন, ছোকরা যদি এখানে তার চেহারা দেখায় সাথে সাথে এখানকার কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেব আমি। আমার মেয়েও তাই করবে। কিছু যদি মনে না করেন, এখন আমাদের মাফ করতে হবে, খাবারঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।
প্রচুর সৌজন্য দেখিয়ে ওদেরকে বিদায় করলেন তিনি। তারপর আস্তে কিন্তু দৃঢ়তার সাথে বন্ধ করে দিলেন দরজাটা। মেয়ের হাত ধরে বাড়িটার একেবারে পিছনে রান্নাঘরের দিকে তাকে নিয়ে চললেন। চল, মা, খাবার নিয়ে বসে আছে তোর মা।
রান্নাঘরে পৌঁছুবার আগেই নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করেছে কে। কারণ আর কিছু নয়, দুর্ভাবনা থেকে নিষ্কৃতি, বাবার এমন নিঃশর্ত ভালবাসা।
রান্নাঘরে ঢুকল ওরা। মা যেন ওর কান্না দেখতেই পেলেন না, তাতে কে বুঝতে পারল বাবা নিশ্চয় তাকে ওই দুই গোয়েন্দার কথা আগেই বলে রেখেছেন। নিজের জায়গায় বসে পড়ল সে। কোন কথা না বলে খাবার পরিবেশন করছেন মা। খেতে শুরু করার আগে মাথা নিচু করে একটু প্রার্থনা করলেন বাবা।
মিসেস অ্যাডামস একটু বেঁটে। মোটাসোটা মানুষ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় চোপড় পরেন। পরিপাটি করে চুল আঁচড়ান। মাকে কখনও বিস্ত বেশবাসে দেখেনি কে। কিন্তু মেয়ের সাথে মায়ের ব্যবহারে সব সময়ই একটু কৌতূহলের অভাব দেখা যায়, কেমন যেন একটু দূরত্ব বজায় রাখেন। এখনও তাই করছেন। দেখ, কে, এত নাটক করিস না। কিসের এত ভাবনা, শুনি? ছেলেটা তো ডার্টমাথ থেকে পাস করেছে, এ ধরনের কোন নোংরামির মধ্যে ও যেতেই পারে না। অসম্ভব।
চমকে উঠে মুখ তুলে তাকাল কে? তুমি কি করে জানলে?
নির্বিকারভাবে মা বললেন, এখনও ছেলেমানুষ যারা তারা একটা ধোয়াটে ভাব সৃষ্টি করে নিজেদের ভারি চালাক মনে করে। মাইকেলের কথা আমরা অনেক দিন থেকেই জানি, কিন্তু তুই কিছু না বললে আমরা কথাটা তুলি কি করে?
