লং বীচের উঠানে সুখ আর শান্তির সাথে বাস করছেন তিনি। তাঁর সাম্রাজ্য প্রতিদিনই একটু একটু করে বিস্তার লাভ করছে। ক্রমশ দুর্জয় হয়ে উঠছেন তিনি। তারপর শেষ হলো একদিন যুদ্ধ। শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলো পরিবারগুলোর মধ্যে ডন ভিটো কর্লিয়নি যা চেয়েছিলেন তাই পেয়েছেন, নিউ ইয়র্কের পাঁচ পরিবারের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিবারটির কর্তা তিনি আজ।
কিন্তু হঠাৎ সব ওলটপালট হয়ে গেল। সর্বনাশের সূচনা করল ভার্সিল সলোযো, শান্তি ভঙ্গ করল সে। ডন ভিটো কর্লিয়নিকে গুলি করে বসল। শয্যা নিলেন ডন।
কিন্তু এর পরিণাম যে কি ভয়াবহ হতে পারে তা সলোযো বা তার সমর্থকরা একবার ভেবেও দেখেনি। ডন কর্লিয়নি মারা গেলেন না, এটা তাদের জন্য সবচয়ে বড় দূর্ভাগ্য। আসলে, ডনকে গুলি করে নিজেদের জন্যে স্বহস্তে কবর খুঁড়ল ওরা। কর্লিয়নি পরিবারে আর একজন আছে, যাকে ওরা গোণার মধ্যেই ধরে না, সময় হতেই সবাইকে ভীষণভাবে চমকে দিয়ে সে-ই এমন এক চাল চালল, ওই এক চালেই মাত্ হয়ে গেল বাজি।
৩.০১ গ্রামের নাম নিউ হ্যাম্পশায়ার
গডফাদার (ভলিউম-২)
তৃতীয় পর্ব
০১.
গ্রামের নাম নিউ হ্যাম্পশায়ার। এই গ্রামের বৈশিষ্ট্য হলো নতুন কিছু একটা ঘটলেই সমস্ত ব্যাপারটা খুঁটিয়ে লক্ষ করার জন্যে জানালা দিয়ে উঁকি মারে মেয়েরা আর দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়ায় দোকানীরা। অ্যাডামসদের বাড়ির সামনে নিউ ইয়র্কের নম্বর প্লেট লাগানো কার্লো মোটর গাড়িটা এসে থামতে না থামতেই গ্রামের সবাই জেনে গেল ব্যাপারটা।
কলেজে পড়া মেয়ে হলেও এখনও একটু গেঁয়ো টাইপের রয়ে গেছে কে অ্যাডামস, সে-ও তার শোবার ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে উঁকি মেরে দেখছে ব্যাপারটা কি।
পরীক্ষার পড়া বন্ধ করে নিচে নেমে এসে লাঞ্চ খাবার তোড়জোড় করছে, এই সময় চোখে পড়ল একটা গাড়ি আসছে। সেটা যখন ওদেরই বাড়ির সামনে ঘাস জমির পাশে থামল, একটুও বিস্মিত হলো না কে। লম্বা-চওড়া দুইজন লোক নামল গাড়িটা থেকে দুইজনেরই বলিষ্ঠ গড়ন, সিনেমার ভিলেনের মত চেহারা। একছুটে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল কে, ওদের আগেই পৌঁছে গেল সদর দরজায়। ওরা নিশ্চয় মাইকেল অথবা তার বাড়ির কারও কাছ থেকে এসেছে বলে অনুমান করছে সে। আনুষ্ঠানিকভাবে আলাপ করিয়ে দেবার আগেই ওরা বাড়ির ভিতর ঢুকে তার মা-বাবার সাথে কথা বলতে শুরু করবে, তা সে চাইছে না। মইকেলের বন্ধু বান্ধব সম্পর্কে ও যে লজ্জিত, ব্যাপারটা তা নয়। মা বাবা আসলে নিউ ইংল্যাণ্ডবাসী সেকেলে ইয়াঙ্কি, এ-ধরনের লোকজনের সাথে মেয়ের পরিচয় হয় কি করে, সেটা তারা আদৌ বুঝতে চেষ্টা করবেন না।
কলিং বেল বাজতে শুরু করেছে, এই সময় দরজার সামনে পৌঁছুল কে। আমি খুলছি, চিৎকার করে কথাটা জানাল মাকে। তারপর দরজা খুলল।
কাছ থেকে আরও বিশালদেহী দেখাচ্ছে লোক দুজনকে। সিনেমার ভিলেনরা যেভাবে বুক পকেটে হাত ঢুকিয়ে পিস্তল বের করে ঠিক সেভাবে ওদের একজন পকেটে হাত ঢোকাতে যাচ্ছে দেখে চমকে উঠল কে, দুই ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে শব্দ করে একটু নিঃশ্বাস বেরিয়ে পড়ল তার। পিস্তল নয়, ছোট্ট একটা চামড়ার কেস বের করল লোকটা, সেটা কে-র মুখের সামনে খুলে ধরল সে। একটা আইডেনটিটি কার্ড। নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের একজন ডিটেকটিভ আমি, জন ফিলিপস, ইঙ্গিতে সঙ্গীকে দেখাল সে, আমার সহকারী, ডিটেকটিভ সিরিয়ানি। আপনিই কি মিস অ্যাডামস?
উপর-নিচে একবারমাত্র মাথা ঝাঁকাল কে।
ভিতরে ঢুকে আপনার সাথে কথা বলতে পারি? বলল ফিলিপস। মাইকেল কর্লিয়নি সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন আছে আমাদের।
একপাশে সরে এসে ওদেরকে ভিতরে ঢোকার জায়গা করে দিল কে। পথ দেখিয়ে পড়ার ঘরের দিকে যাচ্ছে, ছোট হলঘর থেকে ওদেরকে দেখে ফেললেন বাবা। কি হয়েছে রে, কে? জানতে চাইলেন তিনি।
মাথার চুল সব পেকে গেছে, মেদহীন গড়ন, ভদ্রলোকের চেহারায় নিখুঁত আভিজাত্যের ছাপ। এই এলাকার ব্যাপটিস্ট গির্জার একজন পাদ্রী তিনি, ধার্মিকদের মধ্যে তাঁর পাণ্ডিত্যের প্রচুর খ্যাতি। কে আসলে তার বাবাকে ঠিক মত বুঝে উঠতে পারে না, বাবার কথা ভাবতে বসলে তার ব্যক্তিত্বের গভীরতা সম্পর্কে কেমন যেন ধাঁধা লাগে, তার মধ্যে আশ্চর্য একটা উদাস আর রহস্যময় কিছু আছে বলে মনে হয়। কিন্তু একটা ব্যাপারে মনে কোন সন্দেহ নেই ওর, বাবা ওকে যথেষ্ট ভালবাসেন। তবে বাপ হিসেবে মেয়ের দিকে তেমন খেয়াল রাখেন না। পরস্পরের মধ্যে খুব একটা ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গতা না থাকলেও বাবার উপর আস্থা রাখে সে। তাই কথাটা বলার সময় কোন সঙ্কোচ বোধ করল না, সহজভাবেইবলতে পারল, নিউ ইয়র্ক ডিটেকটিত ব্রাঞ্চের লোক এরা। আমার পরিচিত একটা ছেলে সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করতে এসেছেন।
ব্যাপারটাকে স্বাভাবিকভাবেই নিলেন মি. অ্যাডামস, একটুও অবাক হননি। বললেন, আমার পড়ার ঘরে গিয়ে বসতে পারি, নাকি?
আমরা কথা বলার সময় আপনার মেয়ে একা থাকলে ভাল হয়,মৃদু গলায় বলল ডিটেকটিভ ফিলিপস।
দেখুন, অত্যন্ত ভদ্রভাবেই বললেন মি: অ্যাডামস, সেটা বোধহয় কে-র ইচ্ছার ওপরই নির্ভর করছে। মেয়ের দিকে তাকালেন তিনি। কি, মা? সাথে আমি থাকলে ভাল হয়, নাকি ওদের সাথে একা একা কথা বলবি? আমি, অথবা তোর মা?
