ঘটনাটা ঘটল নতুন বাড়িতে উঠে আসার এক হপ্তা পর। ভাল মানুষ চেহারার তিন জন লোক একটা ট্রাক নিয়ে ওদের বাড়িতে এসে হাজির। নিজেদের পরিচয় দিল, তারা শহরের ফার্নেস ইন্সপেক্টর। ডন কর্লিয়নির কম বয়সী বডিগার্ডদের একজন বেসমেন্টের ফার্নেস দেখাবার জন্যে নিয়ে গেল তাদেরকে। স্ত্রী আর সনির সাথে বাগানে হাওয়া খাচ্ছেন তখন ডন।
এই সময় বডিগার্ডদের একজন এসে জানাল, ইন্সপেক্টররা বাড়ির মালিককে ডাকছে। ভীষণ বিরক্তবোধ করলেন তিনি। গিয়ে দেখলেন, ইন্সপেক্টররা তিনজনই লম্বা চওড়া, ফার্নেসটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। দলের নেতা লোকটাকে খুব গভীর আর রগচটা মনে হলো। কর্কশ গলায় সে ডনকে বলল, আপনার ফার্নেসের অবস্থা যাচ্ছেতাই হয়ে আছে। আপনি বললে এটাকে সারাতে পারি, আবার জোড়া লাগিয়ে দিতে পারি, কিন্তু খাটাখাটনি আর স্পেয়ার পার্টসের জন্যে টাকা লাগবে, দেড়শো ডলার। কথা শেষ করে লোকটা ডনকে একটা লাল কাগজের লেবেল দেখাল, তারপর আবার বলল, এই সীলটা যদি লাগিয়ে দিয়ে যাই, আর কেউ কখনও এ-ব্যাপারে আপনাকে বিরক্ত করবে না।
খুব মজা লাগল ডনের। গোটা হপ্তাটা কেটেছে একঘেয়ে ভাবে! নতুন বাড়িতে উঠে এলে যা হয়, ঘর-গৃহস্থালি গোছগাছ কতেই সময়টা কেটে গেছে। উচ্চারণ ভঙ্গিতে সামান্য একটু টান ছাড়া ইংরেজী বলায় কোন খুঁত নেই ডনের। তিনি জানতে চাইলেন, যদি টাকা না দিই? কি অবস্থা হবে আমার কানেসের?
ইন্সপেক্টরের মাথা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, যা যেখানে যে-অবস্থায় আছে, সব সেভাবে ফেলে রেখে চলে যাব আমরা। কথা শেষ করে ঘরময় ছড়ানো বিচ্ছিন্ন ফার্নেসের পার্টসগুলো হাত-ইশারায় দেখাল সে।
ম্লানমুখে বললেন উন, ঠিক আছে, কি আর করা, টাকা যখন দিতেই হবেড়ান, নিয়ে আসছি।
বাগানে ফিরে এলেন ডন। সনিকে বললেন, শোনো, কয়েকজন কারিগর আমাদের ফার্নেস দেখতে এসেছে। কি বলতে চায়, আমি ঠিক বুঝলাম না। তুমি গিয়ে দেখো তো, ব্যাপারটা কি। সনিকে একটা পরীক্ষায় ফেলতে চাইছেন ডন, এর মধ্যে সবটাই ঠাট্টা নয়। নিজের সহকারী করে নেবার জন্যে সনির কথা গুরুত্বের সাথে ভাবছেন তিনি। এই ধরনের পদ পেতে হলে এমন অনেক পরীক্ষায় পাস করতে হয়।
সমস্যার সমাধান ঠিকই, করল সনি, কিন্তু তার পদ্ধতিটা দেখে মোটেই খুশি হতে পারলেন না উন! বড় বেশি খোলাখুলি সমাধান, বিখ্যাত সেই সিসিলীয় সূক্ষ্মতার অভাব প্রকট। তলোয়ারের কোপ নয়, এ যেন মুগুরের ঘা। কারিগরদের দাবি শুনেই পিস্তল বের করল সনি, তাদেরকে কোণঠাসা করে বডিগার্ডদের ডেকে পাঠাল। প্রথমে তিনজনকেই ধরে খুব মারধর করাল, তারপর ফার্নেস মেরামত করিয়ে নিয়ে বেসমেন্টের কামরাটা ভাল করে সাফ করিয়ে নিল। সবশেষে ওদেরকে সার্চ করে দেখল, আসলেই ওরা একটা গৃহ সংস্কার সংস্থার কর্মী, ওদের হেডকোয়ার্টার সাফক কাউন্টিতে। কোম্পানির মালিকের নাম জেনে নিয়ে ওদেরকে বলল সনি, লং বীচে আবার যদি তোমাদের কাউকে দেখি, গায়ের ছাল ছাড়িয়ে নেব। লাথি মারতে মারতে তিনজনকে ট্রাকের কাছে পৌঁছে দিল সে।
বয়স এখনও কম সনির, প্রচণ্ড রাগ এখনও আছর করেনি ওর উপর, কিন্তু যেখানে ও বসবাস করে সেখানে আর সবার রক্ষাকর্তা হয়ে ওঠার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে ওর মধ্যে। সেই গৃহ সংস্কার সংস্থার কর্তার সাথে যোগাযোগ করে। সত্যিই সে সাবধান করে দিল, ডেকে পাঠানোনা হলে কেউ যেন লং বীচে পায়ের ধুলো ফেলতে না আসে।
এরপর তো পুলিশের সাথে কর্লিয়নি পরিবারের স্থায়ী যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। যত রকম অভিযোগ কর্লিয়নিরা পুলিশকেই জানায় এখন। পেশাদার অপরাধীরা যদি কিছু করে, তান্যান্য আইন ভঙ্গকারী দল, যদি ওদের এলাকায় দু মারতে চেষ্টা করে, সাথে সাথে খবর পেয়ে যায় পুলিশ। এক বছরও কাটল না, ওই আকারের সমস্তু শহরের মধ্যে লং বীচ হয়ে উঠল একেবারে অপরাধ মুক্ত, আদর্শ এলাকা। এই শহরে যাতে ব্যবসা না চালায় তার জন্যে পেশাদার লুটেরাদেরকে একবার মাত্র সতর্ক করে দেয়া হলো। গুণ্ডাপাণ্ডাদেরকেও চলে যেতে বলা হলো শহর ছেড়ে। এরপরও কেউ যদি কোন অপরাধ করে বসে, প্রথমবার ক্ষমা করা হয় তাকে। কিন্তু দ্বিতীয় বার অপরাধ করলে ক্ষমা করা হয় না। তারা কোথায় যেন। অদৃশ্য হয়ে যায়। ভুয়া যত গুহ সংস্কার সংস্থার লোক আর সমস্ত ধাপ্পাবাজদেরকে, যারা বাড়ি বাড়ি ঢুকে অন্যায় দাবির মাধ্যমে টাকা আদায় করার চেষ্টা করে, তাদেরকে ডেকে ভদ্রভাবে জানিয়ে দেয়া হলো, লং বীচে কেউ তাদেরকে চায় না। এরপরও চিটিংবাজ কেউ যদি দুঃসাহস দেখিয়ে তাদের স্বভাব না বদলায়, পাকড়াও করে এ্যায়সা প্যাদানি দেয় সনি, সেফ মাটিতে কিছুকাল শুয়ে না থেকে উপায় থাকে না তার। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কিছু ছোকরা আছে যারা আইনও মানে না, প্রকৃত ক্ষমতাবান কর্তৃপক্ষকেও মানতে রাজি নয়।. ডন কর্লিয়নি নিজে ডেকে তাদেরকে বাপের মত স্নেহের সাথে উপদেশ দেন, আর দেরি না করে তারা যেন বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। এই ভাবে একটা আদর্শ শহর হয়ে উঠল লং বীচ।
গৃহ সংস্কার, সম্পত্তি বিনিময়, ইত্যাদি হাজার রকম বেচাকেনা ব্যবসার দিকটা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করল ডন ভিটো কর্লিয়নিকে। আইনের চোখকে অনায়াসে উঁকি দিয়ে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে লোকেরা। এককালে তিনি সৎ, নীতিপরায়ণ, আদর্শ যুবক ছিলেন, তখন যে আলাদা জগতে তার প্রবেশাধিকার ছিল না, তিনি দেখতে পেলেন এখন সেখানে তার মৃত গুণী লোকের জন্যে খুব ভাল আর যথেষ্ট জায়গা আছে। সেই নতুন জগতে প্রবেশ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে শুরু করলেন ডন ভিটো কর্লিয়নি।
