নিজের সাম্রাজ্যে শান্তি এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পেরে ডন কর্লিয়নি একটু গর্বও অনুভব করেন। তাঁর শিষ্য যারা, যারা তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে, যারা তাকে শ্রদ্ধা আর সম্মান করে, তার জগতে তারা সবাই সম্পূর্ণ নিরাপদ, শুধু সুখে নেই, রাজার হালে আছে। বাকিরা যারা আইন, শৃঙ্খলা, সরকার, নীতি, আদর্শ ইত্যাদি মেনে চলে, তারা লাখে লাখে পটল তুলছে। এরপরও যারা বেঁচে থাকছে তারা খেতে পাচ্ছে না, বেঁচে থাকার কোন আনন্দই নেই তাদের জীবনে।
ডন কর্লিয়নির সুখী হবার পথে একটা মাত্র বাধা হলো তাঁর ছোট ছেলে মাইকেল কর্লিয়নি। বাবার নির্দেশ, সাহায্যের প্রস্তাব, অনুরোধ-সব কিছু প্রত্যাখ্যান করে নিজের ইচ্ছায় দেশ রক্ষায় যোগ দেবার জন্যে নাম লেখাল সে। তার সংগঠনের আরও কয়েকজন যুবকও এই কর্ম করায় আশ্চর্য হয়ে গেলেন ডন কর্লিয়নি। এদের মধ্যে একজন তার ক্যাপোরিজিমিকে বলল, এই দেশ, এই আমেরিকা আমার সাথে যে বড় ভাল ব্যবহার করেছে! ডনের কানে যখন কথাটা পৌঁছুল, তিনি রেগে উঠে বললেন, হুঁ, আমিও ওর সাথে বড্ড ভাল ব্যবহার করে ফেলেছি। যুদ্ধে যারা নাম লেখাল তারা সবাই হয়তো ভীষণ বিপদে পড়ে যেত, কিন্তু ডন কর্লিয়নি যখন নিজের ছেলেকে ক্ষমা করতে পারলেন, তখন বাকি সবাইকেও ক্ষমা করতে হলো। কিন্তু ডন ধরে নিলেন, তার প্রতি এদের কোন কর্তব্য-জ্ঞানই নেই, নিজেদের প্রতি তো নেইই।
তাঁর জগতের চেহারা পাল্টাতে হবে আরার, যুদ্ধের শেষে ব্যাপারটা উপলব্ধি করলেন ডন কর্লিয়নি। বাইরের বৃহত্তর জগতের সাথে আরও যাতে অনায়াসে নিজের সংগঠনকে খাপ খাইয়ে নেয়া যায় তার ব্যবস্থা করা কার। তার বিশ্বাস, মুনাফার হার না কমিয়েও সেটা করা যেতে পারে।
তাঁর এই বিশ্বাসের মূলে রয়েছে তার নিজের অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে ব্যক্তিগত দুটো ঘটনা ঘটে যাবার ফলে এই ধরনের একটা সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত হলেন তিনি।
প্রথম ঘটনাটা অনেক দিন আগের, তাঁর কর্মজীবনের শুরুর দিকের ব্যাপার।
বয়স কম নাজোরিনির, একজন রুটিওয়ালার সহকারী হিসেবে কাজ করে, এদিকে আবার খুব ইচ্ছা বিয়ে করে। একদিন সে ভিটো কর্লিয়নির কাছে এল একটা সমস্যা নিয়ে। কি ব্যাপার? ব্যাপার হলো, নাজোরিনি যাকে বিয়ে করবে, তার হবু স্ত্রী, অত্যন্ত সুলক্ষণা এক ইতালীয় মেয়ে। বিয়ের পর ঘর-বাড়ি সাজাতে হবে বলে দুজন মিলে টাকা জমিয়েছে তারা। সেই টাকা আসবাবপত্রের একজন পাইকারি ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দিয়েছে। অনেকগুলো টাকা, তিনশো ডলার। ব্যবসায়ী ওদেরকে তার মালগুদামে নিয়ে গিয়ে পছন্দসই আসবাবপত্র বেছে নিতে বলল। দুজন মিলে প্রায় সারাদিন ধরে বাছাই করল নিজেদের মনের মত জিনিস। তিনশো ডলার নিজের পকেটে ভরে ব্যবসায়ী জানাল, এক হপ্তার মধ্যেই তাদের নতুন ভাড়া করা ফ্ল্যাটে সব ফার্নিচার পাঠিয়ে দেয়া হবে।
কিন্তু হপ্তা পেরোবার আগেই লালবাতি জ্বালল কোম্পানিটা। আসবাব ভর্তি প্রকাশ্য গুদামে তালা মেরে সীল করে দেয়া হলো। ওদিকে সমস্ত পাওনাদারকে বোকা বানিয়ে ব্যবসায়ী গায়েব হয়ে গেছে। পাওনাদারদেরু মধ্যে নাজোরিনিও একজন, সে একজন উকিলের কাছে গেল পরামর্শ করার জন্যে। উকিল জানান, কোর্টে মামলা শেষ হতে সময় লাগবে, তবে শেষ হলে পাওনাদাররা তাদের টাকা ফেরত পাবে। তার আগে করার কিছুই নেই। কত সময় লাগবে? বলা যায় না, তিন বছরও লাগতে পারে। আর প্রাপ্য পাবার সময় নাজোরিনি যদি প্রতি ডলারে এক সেন্ট করে পায়, তার ভাগ্য ভালই বলতে হবে।
কাহিনীটা শোনার সময় হাসছেন ভিটো কর্লিয়নি, হাসিটা সম্পূর্ণ অবিশ্বাসের। জোরিনি এসব কি বলছে? আইন কি এতবড় একটা অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে পারে? আসবাবপত্রের ওই পাইকারি ব্যবসায়ী বিরাট একজন ধনী মানুষ, প্রাসাদতুল্য একটা বাড়ি আছে তার, লং আইল্যান্ডে বিরাট সয়-সম্পত্তি, দামী একটা মোটর গাড়ি আছে, নিজের ছেলেদের কলেজে পড়ায়-এমন একজন লোক কী নাজোরিনির মত গরীব মানুষের তিনশো ডলার মেরে দেবে? এ যে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার। তবু, পুরোপুরি নিশ্চিত হবার জন্যে গেনকোর বিশুদ্ধ তেল কোম্পানির উকিলকে দিয়ে সমস্ত খবর আনিয়ে নিলেন ডন।
নাজোরিনির কথাই সত্যি। ব্যবসায়ীর সমস্ত সম্পত্তি তার স্ত্রীর নামে, সেখানে হাত দেবার ক্ষমতা কারও নেই। দেউলিয়া হতে যাচ্ছে জেনেও নাজোরিনির টাকাটা নেয়া ভুল হয়েছে তার, কিন্তু এমন তো অনেকেই করে থাকে। আইন তত আর কিছু করতে পারবে না তার।
খুব সহজেই মিটে গেল ব্যাপারটা। ডন কর্লিয়নি তাঁর কনসিলিয়রি গেনকো আবানদাণ্ডোকে সেই ব্যবসায়ীর সাথে দেখা করতে পাঠালেন। চতুর ব্যবসায়ী পরিস্থিতিটা সাথে সাথে বুঝে নিয়ে নামজারিনি যাতে তার আসবাব পায় সে ব্যবস্থা করে দিল। ভিটো কর্লিয়নি এই ছোট ঘটনাটা থেকে অনেক কিছুই শিখে নিতে পারলেন।
উনিশশো ঊনচল্লিশ সালের দ্বিতীয় ঘটনাটার প্রতিক্রিয়া হলো আরও সুদূর প্রসারী। সপরিবারে শহরের বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ডন কর্লিয়নি। যে কোন আদর্শ বাবার মত তারও ইচ্ছা, তার ছেলেরা ভাল স্কুলে লেখাপড়া শিখুক, অল সঙ্গী সাথীদের সাথে মেলামেশা করুক। ব্যক্তিগত কারণেও শহরতলিতে অজ্ঞাতবাস করতে চান তিনি, সেখানে থাকলে তাঁর সম্পর্কে বাইরের লোক বেশি কিছু জানতে পারবে না। প্রকাণ্ড উঠানসহ সেজন্যেই লং বীচের এই বাড়িটা কিনেছেন তিনি। উঠানের চারদিকে চারটে মাত্র বাড়ি, কিন্তু আরও বাড়ি করার জন্যে প্রচুর জায়গা খালি পড়ে আছে। ইতিমধ্যে সাণ্ডার সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে সনির। আর খুব বেশি দেরিও নেই, ওদের জন্যে একটা আলাদা বাড়ির দরকার। একটাতে থাকবে সপরিবারে গেনকে। আরেকটাতে ডন নিজে। অবশিষ্ট বাড়িটা খালি রাখা হবে।
