এতে অবশ্য লাভ হলো সান্তিনো কর্লিয়নির, কাজ দেখাবার একটা সুযোগ পেয়ে গেল সে। একটা দলের নেতৃত্ব নিয়ে, এরা সবাই তার নিজের সেনাদলের বাছাই করা লোক, তরুণ একজন অখ্যাত নেপোলিয়নের মত মেতে উঠল যুদ্ধে। এই নগর যুদ্ধে বিশেষ প্রতিভার পরিচয় দিল বটে সনি, কিন্তু সেই সাথে নিষ্ঠুরতাও সীমা ছাড়িয়ে গেল। বিজয়ী কর হিসাবে বিচার করতে গেলে দেখা যাবে ডনের মধ্যে এই জিনিসটারই অভাব রয়েছে, এই নিষ্ঠুরতার।
উনিশশো পঁয়ত্রিশ থেকে উনিশশো সাঁইত্রিশ সালের মধ্যে অপরাধীদের জুগতে সবচেয়ে হৃদয়হীন পাষাণ বলতে একমাত্র সনি কর্লিয়নিকেই বোঝাত। তার এই খ্যাতি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সেফ ভয়াবহতায় তাকে ছাড়িয়ে যায় লুকা ব্রাসি নামে সাংঘাতিক মানুষটা।
বাকি আইরিশ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে লাগল এই লুকা ব্রাসি। কারও সাহায্য লাগল না, অমন ভয়ঙ্কর বেপরোয়া দলটাকে সে একাই নিশ্চিহ্ন করে দিল। আগাছার মত এই সব দলগুলোকে শক্তি যোগাবার জন্যে ছয় বড় পরিবারের এক পরিবার উদ্যোগী হলো, তারমানে কর্লিয়নি পরিবারের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করল নিজেদেরকে। কাউকে কিছু বলতে হলো না, অন্যান্য পরিবারগুলোকে সাবধান করে দেবার জন্যে একাই রওনা হয়ে গেল লুকা ব্রাসি। বিশ্বাসঘাতক ওই পরিবারটির কর্তাকে খুন করে, নিজের গায়ে আঁচড়টিও না লাগিয়ে নিরাপদে সেখান থেকে বেরিয়ে এল সে।
নিউ ইয়র্ক শহরে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলো উনিশশো সাঁইত্রিশ সালের মধ্যে। অবশ্য, এরপরও ছোটোখাটো দুর্ঘটনা, এক-আধটু ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয় বৈকি। মাঝে মধ্যে এসবের পরিণাম মর্মান্তিক হয়েও ওঠে। প্রাচীন নগর শাসনকর্তারা ঠিক যেভাবে শহর প্রাচীরের বাইরের বর্বর জাতিগুলোর উপর সতর্ক নজর রাখতেন, তেমনি সজাগ দৃষ্টি রাখেন ডন কর্লিয়নি তার জগতের বাইরে যারা রয়েছে তাদের তৎপরতার উপর। কিভাবে এল হিটলার, স্পেনের পতন, জার্মানী কেমন করে মিউনিকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ল ব্রিটেনকেএসবই তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ করলেন। বাইরের জগতে নজর আছে বলেই চোখের সামনে তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন, একটা বিশ্বযুদ্ধ দ্রুত এগিয়ে আসছে। এই যুদ্ধ কি ফলাফল বয়ে আনবে তাও তিনি আঁচ করতে পারছেন। আগের চেয়ে অনেক বেশি দুর্ভেদ্য হয়ে উঠবে তাঁর নিজের দুনিয়া। সুযোগ সন্ধানী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন লোকেরা যুদ্ধের এই সুযোগে অঢেল ধনসম্পদ সংগ্রহ করে নিতে পারবে। কিন্তু সেই সাথে এটুকুও বুঝলেন তিনি যে অত্যাসন্ন সুবর্ণ সুযোগটাকে কাজে লাগাতে হলে সবচেয়ে আগে তাঁর নিজের এলাকায় শান্তি আনা দরকার।
যুক্তরাষ্ট্রের সবখানে তার বিশেষ বার্তা পাঠালেন ডন কর্লিয়নি! সানফ্রান্সিসকো, লস এঞ্জেলস, শিকাগো, ক্লীভল্যাণ্ড, ফিলাডেলফিয়া, বোস্টন, মায়ামী, যেখানে তাঁর যত দেশী ভাই আছে সবার সাথে আলাপ-আলোচনা করছেন তিনি। অপরাধ জগতের শান্তির দূত হিসেবে স্বীকৃতি দিল সবাই তাঁকে। উনিশশো ঊনচল্লিশ সালের মধ্যে এমন কি রোমের পোপের চেয়েও বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করলেন তিনি। তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টায় শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে সেরা অপরাধী দলের সংগঠনগুলোর মধ্যে একটা মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হলো। দেশের শাসনতন্ত্রের আদলে তৈরি হলে এই সব মাফিয়া সংগঠনের নীতিমালা। ঠিক হলো যে যার নিজের রাজ্যে বা, শহরে পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, কেউ কারও জগতে নাক গলাতে পারবে না। চুক্তিতে বলা হলো, কে কোথায় ক্ষমতা পাবে, কার কতটা সীমানা, কোন কোন এলাকায় কার কি ধরনের ব্যবসা চালাবার অধিকার সংরক্ষিত থাকবে, ইত্যাদি। এবং, সবাই ওয়াদা করল, অপরাধ জগতে তারা শান্তি বজায় রাখবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো উনিশশো উনচল্লিশ সালে, তারপর উনিশশো একচল্লিশ সালে, সে-যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল আমেরিকা। দুনিয়াময় অশান্তি ছড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু ডন কর্লিয়নির জগতে অশান্তির কোন চিহ্নমাত্র নেই। আমেরিকার একদিকের বাজার আচমকা গরম হয়ে উঠল, সোনালী ফসল ঘরে তোলার জন্যে সবাই তৈরি হয়েই আছে। ব্ল্যাকমার্কেট থেকে খাদ্যদ্রব্যের ও. পি. এ. টিকেট, পেট্রলের কুপন এমন কি যাতায়াতে অনুমতি পত্র সংগ্রহ করা পর্যন্ত সমস্ত ব্যাপারে হাত আছে কর্লিয়নি পরিবারের। ঠিকাদাররা ওদের কাছে এসে ধরনা দিয়ে বসে থাকে, কন্ট্রাক্ট পেতে হলে কর্লিয়নিদের কাছে না এসে উপায় নেই। রেডিমেড পোশাক তৈরির কারখানাগুলো চাহিদা অনুযায়ী প্রচুর কাঁচামাল জোগাড় করতে পারে না, কারণ তারা সরকারী আনুকূল্য পায়নি, এদেরকে কালোবাজার থেকে মাল কিনতে সাহায্য করে কর্লিয়নি পরিবার, সেজন্যে পোশাক ব্যবসায়ীরা কৃতজ্ঞ, বোধ না করে পারে না। কর্লিয়নি পরিবারে যারা কাজ করে, এবং আমেরিকার আইন অনুযায়ী যাদেরকে যুদ্ধে যেতেই হবে, না গেলে শাস্তি পেতে হবে, বিদেশীদের যুদ্ধে এইসব ইতালীয় যুবকদেরকে যাতেযোগ দিতে না হয় তার ব্যবস্থা করতে একটুও বেগ পেতে হয় না কর্লিয়নিকে। ডাক্তারদের সাহায্য নিয়ে কাজটা করেন তিনি। শারীরিক পরীক্ষা নেবার আগে কি কি খেয়ে যেতে হবে তা তারা বলে দেয়। অথবা ছেলেগুলোকে কোন সামরিক কারখানায় চাকরি জুটিয়ে দেন ডন, ওই সব কারখানাগুলো থেকে যুদ্ধের জন্যে লোক সংগ্রহ করা হয় না।
