ওদিকে সনির কৈশোরের বন্ধু, টম হেগেন ওদের আশ্রয়ে থেকে কলেজের পড়া মন দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। ফ্রিডো এখনও হাই স্কুল ছাড়াতে পারেনি। আর ছোট ভাই মাইকেল পড়ছে গ্রামার স্কুলে। সবার ছোট একমাত্র বোন কনি, মাত্র চার বছরের। বেশ কিছুদিন হয়েছে ব্রঙ্কসের একটা ভাড়া করা বাড়িতে উঠে এসেছেন উন, লং আইল্যান্ডে একটা বাড়ি কেনার কথাও ভাবছেন তিনি। কিন্তু আরও অনেক পরিকল্পনা আছে তার। বাড়ি কেনার আগে সেগুলোর একটা বিহিত করে নিতে চান।
প্রখর দূর দৃষ্টিসম্পন্ন একজন মানুষ ভিটো কর্লিয়নি। গোটা আমেরিকা জুড়ে বেআইনী ব্যবসায়ীরা নিজেদের মধ্যে মারামারি ঝগড়াঝাটি করে বিষিয়ে তুলছে সমস্ত পরিবেশটাকে। এর একটা বিহিত করতে চাইছেন তিনি। কিন্তু পরিস্থিতি এমন জটিল পর্যায়ে চলে গেছে, সমাধান চাইলেই তা পাওয়া সম্ভব নয়। দেশের সব জায়গায় গেরিলা যুদ্ধের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে, অপরাধীরা পরস্পরের রক্ত পান করার জন্যে যেন ব্যথ-ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। উচ্চাভিলাষী গুণ্ডারা সবাই চাইছে প্রত্যেকে একটা করে নিজস্ব সামাজ্য গড়ে তুলতে। এদিকে, ডন কর্লিয়নির মত ব্যবসায়ীরা নিজেদের সীমানা আর অবৈধ ব্যবসা সামলাতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে, টিকে থাকার জন্যে বড় বেশি পরিশ্রম আর সময় দিতে হচ্ছে। সরকার আর সংবাদপত্রগুলো নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্যে অপরাধ জগতের এই সব খুন-খারাবীগুলো পুঁজি করে ক্রমশ আরও কড়া আইন প্রণয়ন করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে, পুলিশ যাতে আরও কঠোর শাস্তি দানের অধিকার পায় তারজন্যে উঁচু মহল থেকে চাপ দেয়া হচ্ছে। আর কেউ এসব ব্যাপার লক্ষ না করলেও, ডন কর্লিয়নির চোখে সবই ধরা পড়ছিল। সময় থাকতেই বুঝতে পারলেন তিনি, জনসাধারণ খেপে উঠলে শেষ পর্যন্ত হয়তো অনেক গণতান্ত্রিক অধিকার লোপ পাবে দেশ থেকে, তাতে, সাধারণ মানুষ যত না ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার চেয়ে কোটিণ্ডণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বেআইনী ব্যবসায়ী আর অপরাধ জগতের বাসিন্দারা। সবচেয়ে আশঙ্কার কথা তার আর তার কর্মীদের সর্বনাশ হতে কিছু আর বাকি থাকবে না। এখনও তার নিজের সামাজ্যের নিরাপত্তা অটুট আছে, অবশ্য কতটা সুরক্ষিত অবস্থায় আছে তা বাইরের কেউ জানে না। কিন্তু, গোটা দেশ জুড়ে অপরাধ জগতে যে বিশৃঙ্খলা চলছে তা যদি এভাবে চলতেই থাকে, যত শক্তিশালীই হোক তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা তাসের ঘরের মত সব ভেঙে পড়তে খুব বেশি দিন সময় নেবে না। ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রথমে শহর নিউ ইয়র্কের মধ্যে, তারপর সমস্ত দেশে শান্তি কায়েম করবেন তিনি। তা করতে হলে যুদ্ধে মেতে আছে যে দলগুলো প্রথমে তাদেরকে যুদ্ধ বিরতিতে রাজি রাতে হবে। কাজটা কঠিন, বুঝলেন তিনি, কিন্তু অসম্ভব বলে মনে হলো না তার কাছে।
উদ্যোগী হয়ে এ-ধবনের কিছু করতে গেলে তাতে যে বড় ধরনের একটা ঝুঁকি আছে তাও তিনি উপলব্ধি করতে পারছেন। সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখেই কাজে হাত দিলেন।
প্রথম বছরটা নিউ ইয়র্কের বিভিন্ন ধরনের বেআইনী কাজের হোতাদের সাথে আলোচনা, জমি ভাগ এবং নিষ্কণ্টক করা, অপরাধ জগতের নেতাদের বাজিয়ে দেখা, এই সব কাজে ব্যয় হয়ে গেল। তার প্রস্তাব হলো, সবাই একসাথে বসে একটা সিদ্ধন্ত নিয়ে যার যার ক্ষমতার এলাকা আলাদা করে নিক ক্ষমতার এলাকা ভাগ বাটোয়ারা হয়ে গেলে নিজেদের মধ্যে, গোলযোগের আর কোন কারণ থাকবে না। দলগুলো একটা শিথিল নিয়মে আবদ্ধ থাকবে, গড়ে নেবে একটা মিত্র-সংঘ। এবং সবাই তাকে মেনে চলবে।
কিন্তু শান্তি প্রচেষ্টার শুরুতেই দেখা গেল স্বার্থের সংঘর্ষ বড় বেশি, বড় বেশি দলাদলি! কারও সাথেই একমত হওয়া যায় না। শেষ পর্যন্ত এ-ধরনের পরিস্থিতিতে ইতিহাস-খ্যাত বহু সুনামধন্য শাসনকর্তা আর আইন প্রবর্তকরা যে পথ অবলম্বন করেছিলেন ডন কর্লিয়নিও সেই পথ ধরবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজ্যের সংখ্যা কমিয়ে মাত্র কয়েকটার মধ্যে আনা না গেলে শান্তি শৃঙ্খলা স্থাপন করা সম্ভব নয়।
কয়েকটা পরিবার আছে, সংখ্যায় পাঁচ ছয়টা, এদেরকে উৎখাত করা অসম্ভব। এরা প্রত্যেকেই প্রচণ্ড ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু অন্যান্যরা, যেমন কালো হাত সন্ত্রাসবাদী দল, স্বাবলম্বী মহাজন গোষ্ঠী, রেসের বেয়াড়া বুকমেকার বাহিনী, যারা অবৈধ ব্যবসার কোন মালিকের কাছ থেকে অনুমতি না নিয়েই নিজেদের আয়ের পথ করে নিয়েছে, এদের সবাইকে উচ্ছেদ করা যায় এবং তা না করে উপায়ও নেই। এ কাজটাও কঠিন, কিন্তু সবদিক বিবেচনা করে, আঁটঘাট বেঁধেই নামলেন ডন কর্লিয়নি। এদের বিরুদ্ধে রীতিমত একটা মহা-যুদ্ধ, দস্তুরমত প্রায় একটা ঔপনিবেশিক অভিযান শুরু করে দিলেন তিনি। আর এই নির্মূল অভিযানে তাঁকে তাঁর সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করতে হলো।
তিনটে বছর লেগে গেল শুধু নিউ ইয়র্ককে ঠাণ্ডা করতে। ডন যতটুকু আশা করেছিলেন তার চেয়ে বেশি, কিছু অপ্রত্যাশিত লাভও পাওয়া গেল। তবে, একেবারে প্রথম দিকেই কার্নিয়নি পরিবারের সামাজ্যকে প্রায় টলিয়ে দিল বিপক্ষ দল। কয়েকটা শোচনীয় ঘটনাও ঘটে গেল। ডনের পরিকল্পনা একদল খ্যাপাটে আইরিশ লুটেরার দলকে নির্মূল করবেন, কাজটায় হাতও দিলেন। কিন্তু গায়ে হ্যাঁকা লাগা মাত্র ব্যাটারা তাদের মরকত দ্বীপের বেপরোয়া সাহস আর বীরত্ব দেখিয়ে আর একটু হলেই যুদ্ধে প্রায় জিতেই যাচ্ছিল। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে অকস্মাৎ আইরিশ লুটেরাদের একজন পিস্তলধারী ডনের নিরাপত্তা প্রহরার প্রায় নিচ্ছিদ্র প্রাচীর ভেদ করে ভিতরে ঢুকে পড়ল। শুধু তাই নয়, গুলি চালাতেও সমর্থ হলো সে, এবং সে গুলি লাগল ডনের বুকে। সাথে সাথে অসংখ্য বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গেল আততায়ীর শরীর। কিন্তু ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে। ডন ভিটো কর্লিয়নি শয্যা নিতে বাধ্য হলেন।
