ক্লেমেঞ্জার মুখ থেকে ডন শুনলেন, সনি একটা সশস্ত্র ডাকাতির সাথে জড়িয়েছে নিজেকে। এর চেয়ে বোকার মত কাজ আর হতে পারে না ভাগ্য ভাল, ব্যাপারটা ঘটাতে গিয়ে কোন বিপদে জড়িয়ে পড়েনি, তা নাহলে ব্যাপারটা অনেক দূর গড়াতে পারত। অনুমানেই বোঝা যায়, সনিই পালের গোদা, বাকি ছেলে দুটো তারই শিষ্য।
রাগের বিস্ফোরণ কদাচ দেখা যায় জুনের মধ্যে, সেদিন তিনি বিস্ফোরিত হলেন। টম হেগেন এ-বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছে আজ বছর তিনেক হলো, তিনি ক্লেমেঞ্জাকে প্রশ্ন করে জেনে নিলেন সেই এতিম ছেলেটাও এই ডাকাতির সাথে জড়িত কি না। ক্লেমেঞ্জা এদিক ওদিক মাথা নাড়ল।
সনিকে ডেকে পাঠালেন তিনি। এলো সে, বাপের সামনে ছয় ফুট উঁচুতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দশাসই ছেলেকে সিলিীয় ভাষায় গাল দিয়ে ভূত ভাগিয়ে দিতে শুরু করলেন ডন। ক্রোধ প্রকাশ আর গালমন্দ করার জন্যে সিসিলীয় ভাষার তুলনা হয় না। সবশেষে একটা প্রশ্ন করলেন তিনি, এ-ধরনের কাজ করার অধিকার তুমি পেলে কোথায়? এমন কুমতি তোমার হলোই বা কেন?
মাথা একটু নিচু হয়ে গেছে সনির। বাবার প্রশ্নের কোন জবাব দিল না সে।
তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন ডন, আর বুদ্ধির কি নমুনা! একটা রাত খেটে পেলে কত? মাথা পিছু পঞ্চাশ ডলার? নাকি আরও কম, বিশ ডলার? বিশটা ডলারের জন্যে নিজের প্রাণের ওপর ঝুঁকি নিলে? আঁ?
বাবার কথা যেন কানেই যায়নি, হুট করে অন্য এক প্রসঙ্গ তুলল সে, যা ডনের কাছে একেবারে অপ্রত্যাশিত। উদ্ধত, একটা ভঙ্গি দেখা গেল, তার চেহারায়, উঁচু গলায় বলল, মনে করেছ আমি কিছু জানি না, কিন্তু নিজের চোখে সব দেখেছি আমি-ফানুচিকে খুন করেছিলে তুমি!
ও! বললেন ডন। আচ্ছা! কথাটা বলে চেয়ারে হেলান দিলেন, ছেলে আর কি বলে শোনার অপেক্ষায় রয়েছেন।
বিদায় নিয়ে ফানুচি বাড়ি থেকে চলে যাবার পর মা বলল, এবার আমি বাড়ির ভিতরে ঢুকতে পারি। বাড়িতে ঢুকে দেখি, তুমি ছাদে চড়ছ। তোমার পিছু পিছু আমিও গেলাম। যা যা করেছিলে সব দেখেছি।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডন বললেন, তাহলে তো কিছু বলার নেই তোমাকে আমার। কিন্তু, তুমি কি পড়াশোনাটা শেষ করতে চাইছ না, তোমার কি উকিল হবার সত্যি কোন ইচ্ছা নেই? বন্দুকধারী এক হাজার ডাকাত যত টাকা লুট করতে পারে তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা ছিনতাই করতে পারে একজন ব্রীফকেসধারী উকিল।
চতুর একটু হেসে সনি বলল, পারিবারিক ব্যবসাতে ঢুকতে চাই আমি। কিন্তু বাবার মুখে ভাবের কোন পরিবর্তন দেখল না সে, তার রসিকতা শুনেও তিনি হাসলেন না, তাই দেখে তাড়াতাড়ি আবার বলল, সে, আমাকে তুমি জলপাই তেল বিক্রি করতে শেখাতে পারো।
তবু কোন উত্তর দিলেন না ডন। অনেকক্ষণ কেটে গেল। অবশেষে বললেন তিনি, প্রত্যেক মানুষের একটা নিয়তি থাকে। তারপর কাঁধ ঝাঁকালেন। কিন্তু এ প্রসঙ্গে আরেকটা কথা বললেন না, তা হলো, ফানুচির হত্যাকাণ্ড দেখার সাথে সাথে তাঁর বড় ছেলের নিয়তি নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে শুধু অন্য দিকে ফিরিয়ে নিলেন মুখটা, বললেন, কাল সকালে এসো। নটার সময়। কি করতে হবে গেমকো জানাবে তোমাকে।
ডন আসলে কি চাইছেন তা উপযুক্ত কনসিলিয়রির গভীর অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে পরিষ্কার বুঝতে পারল. গেনকো আবাদাণ্ডা। সনিকে প্রধানত ডনের বডিগার্ডের কাজে বহাল করল সে। এতে করে বাপের কাজকর্মের ধরন, পদ্ধতি, কৌশল ইত্যাদি দেখে ভবিষ্যৎ ডন হবার শিক্ষা পেতে শুরু করবে সনি। আর ডন ভিটো কর্লিয়নির বিরাট একটা লাভ হলো এই যে তিনি একটা মাস্টারি পেয়ে গেলেন। ছেলেকে হাতে কলমে শিক্ষা দেবার এই সুযোগটাকে তিনি সদ্ব্যবহার করতে ছাড়লেন না। সাফল্য লাভ করতে হলে কি ভাবে কি করতে হয়, এই বিষয়ে প্রায়ই তিনি বক্তৃতা দেন। বড় ছেলের নিয়তি নির্দিষ্ট হয়ে গেছে, তা জানার পরও সনির ব্যাপারে দুশ্চিন্তা মুক্ত হতে পারেন না তিনি। কারণে অকারণে রেগে ওঠা স্বভাব সনির। সেজন্যে ছেলেকে তিনি তিরস্কারও কম করেন না। বলেন, এবং কথাটা তিনি নিজে মনে প্রাণে বিশ্বাসও করেন, সবচেয়ে বোকার মত নিজের দুর্বলতা প্রকাশের উপায় হলো কাউকে শাসানো। দুর্বলতা প্রকাশের এর চেয়ে মৃঢ়তম পথ আর হতে পারে না। খামোকা রাগ দেখানো একজন মানুষের সবচেয়ে বিপজ্জনক অভ্যাস। ডন সরাসরি ভয় দেখাচ্ছেন কাউকে, এমন ঘটনা কেউ কখনও দেখেনি বা শোনেনি। সংযম হারিয়েছেন তিনি, তার সম্পর্কে কেউ বলতে পারবে না এ-কথা। নিজের জ্ঞান আর অভিজ্ঞতাগুলো সনিকে তিনি শেখাবার চেষ্টা করেন। বলেন, শত্রুরা যদি তোমার দোষগুলোকে বড় করে দেখে, এর চেয়ে ভাল পরিস্থিতি জীবনে আর আসতে পারে না। আর, মনে রেখো তোমার গুণগুলোকে তোমার বন্ধুরা যদি ছোট করে দেখে, এর চেয়ে খারাপ অবস্থা জীবনে আর আসতে পারে না।
এদিকে সনির ধর্মবাপ, ক্যাপোরেজিমি ক্লেমেঞ্জা তাকে গুলি ছুঁড়তে, ফাস পরাতে শেখাচ্ছে। ওই ইতালীয় নিয়মে দড়ির ফাস লাগানো পছন্দ করে না সনি। স্বভাবটা একটু বেশি মার্কিনী ওর। সাদামাঠা, সহজ অ্যাংলোস্যাক্সন আগ্নেয়াস্ত্র পছন্দ করে ও। এসর দেখে মনে মনে দুঃখ পায় ক্লেমেঞ্জা।
ক্রমশ বাপের নিত্য সহচর হয়ে উঠছে সনি। বাবার গাড়ি চালায় এটা সেটা নানা কাজে সাহায্য করে। পরবর্তী দুবছর দুজনের ঘনিষ্ঠতা দেখে মনে হতে লাগল বাপের কাছ থেকে ব্যবসার অন্ধিসন্ধি সব শিখে নিচ্ছে ছেলে। কিন্তু বুদ্ধির ধার খুব বেশি নয় ওর, শেখার আগ্রহও তেমন জোরাল নয়, বাপের সাথে সাথে থাকার চাকরিটাই যেন দরকার ওর, সেটা পেয়েই সন্তুষ্ট হয়ে আছে।
