ডন যা আশা করেছিলেন তাই হলো। শত্রুপক্ষ নত হলো তার হিংস্রতার নমুনা দেখে নয়, তার বিদ্যুৎ গতি সম্পন্ন প্রতিক্রিয়া লক্ষ করে। শর্করা বুঝল, কর্লিয়নিদের গুপ্তচর বিভাগ অত্যন্ত দক্ষ, তাদেরকে তুচ্ছ জ্ঞান করে আর একটা কিছু করতে গেলে এবারের আঘাতটা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে আসবে। ঝুঁকি নিয়ে দরকার নেই, ভাবল তারা, তার চেয়ে অনেক ভাল ভনের বন্ধুত্বের প্রস্তাব মেনে নিয়ে তার দেয়া সুবিধেগুলো গ্রহণ করা। চিঠির জবাবে ক্যাপনি জানাল, সে আর নাক গলাবে না।
দুপক্ষের হাতের তাস এবার সমান সমান হলো। ক্যাপনি নতি স্বীকার করায় সারা যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধ জগতে ডন কর্লিয়নির নাম ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়ল, সব ধরনের অপরাধীর কাছে তিনি একজন শ্রদ্ধেয়, সম্মানী ব্যক্তি হয়ে উঠলেন। কিন্তু। মানজানোর সাথে যুদ্ধ তাতে থামল না। যুদ্ধ চলছে, তবে মারানজানোদের উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে কর্লিয়নিরাই। একটানা ছমাস ওদেরকে নাকানিচোবানি খাওয়ালেন ডন। মারানজানোর ক্রাপ খেলার আজ্ঞায় হানা দিয়ে সব তছনছ করে দেয়া হলো। হারলেমে তার প্রধান পলিসি ব্যাংকারকে খুঁজে বের করা হলো, তার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হলো একদিনের সমস্ত খেলার ফল, শুধু টাকাগুলো নয়, সেই সাথে, নথিপত্রগুলোও।
ডন কর্লিয়নি খুঁজে পেতে নতুন নতুন যুদ্ধক্ষেত্র আবিষ্কার করছেন। তাঁর ইচ্ছা, একবার যখন তাঁকে নামানো হয়েছে, শত্রুর জড় পর্যন্ত উপড়ে ফেলবেন তিনি। যেখানে শত্রু সেখানেই তিনি না দিচ্ছেন, মুখোমুখি হচ্ছেন তাদের। ক্লেমেঞ্জাকে পাঠালন রেডিমেড পোশাক তৈরি কারখানাগুলোর শ্রমিক সংঘের পক্ষ নিয়ে মারানজানো আর মালিকদের ভাড়াটে গুণ্ডাদেরকে শায়েস্তা করার জন্যে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কার্নিয়মিদের রণ-কৌশল তুলনামূলক ভাবে অনেক ভাল, সবখানেই জিতছে তারা। ক্লেমেঞ্জার মাংসল মুখে ছড়িয়ে আছে সদয় হাসি কিন্তু মনে তার চরম হিংসতা, সেটাকে অতি সুকৌশলে কাজে লাগাচ্ছেন ডন। দ্রুত যুদ্ধের মোড় ঘুরে যাচ্ছে তার ফলে। সবশেষে তিনি সযত্নে আলাদা করে রাখা টেসিওর দলকে পাঠালেন স্বয়ং মারানজানোর উদ্দেশ্যে।
এর মধ্যে শান্তি প্রার্থনা করে বিশেষ দূত পাঠাতে শুরু করেছে মারানজানো। কিন্তু তাদের সাথে দেখা করেননি ডন। নানা অজুহাত দেখিয়ে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। ওদিকে মারানজানোকে ফেলে পালাতে শুরু করেছে তার দলের লোকেরা। চলতি যুদ্ধে মারানজানোর পরাজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। সবার জানা হয়ে গেছে ব্যাপারটা, এরপরও কোন্ বোকা তার জন্যে বেহুদা সড়ে প্রাণ দিতে যাবে? মারানজানোর বুকমেকার আর মহাজনেরা কর্লিয়নিদের প্রশ্রয় আর সমর্থন পাবার জন্যে টাকা দিতে শুরু করেছে। বলতে গেলে এক রকম শেষই হয়ে গেছে।
অবশেষে, উনিশশো তেত্রিশ সালের বর্ষা শুরুর আগের রাত এসে পড়ল। এর আগেই মারানজানোর সুরক্ষিত এলাকার ভিতর ঢুকে পড়েছে টেসিওর দল। ডনের নির্দেশ অনুযায়ী একটা প্রস্তাব প্লাঠাল টেসিও, মারানজানোর কাছে নয়, তার লেফটেন্যান্টদের কাছে। তারা আপস করার জন্যে একপায়ে খাড়া হয়ে আছে। জানে, মিটমাট না হলে তাদের একজনের প্রাণও বাঁচবে না। যে-কোন শর্তে শান্তি চায় তারা। হ্যাঁ, নেতার সাথে বেঈমানী পর্যন্ত করতে রাজি আছে। এখন নিজেদের প্রাণ বাঁচাবার তাগিদ ছাড়া আর কিছুই অনুভব করছে না তারা।
লেফটেন্যান্টরাই মারানজানোকে জানাল, আপস-মীমাংসায় বসার জন্যে ব্রুকলিনের একটা রেস্তোরাঁ নির্বাচন করা হয়েছে। বডিগার্ড হিসেবে তারাও এল সেখানে মারানজানোর সাথে। মারানজানোকে একটা টেবিলে বসিয়ে দিয়ে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছে তারা। একটুকরো রুটি নিয়ে সেটা চিবাচ্ছে মারানজানো, চেহারায় বিমর্ষ ভাব। এই সময় চারজন লোক ঢুকল রেস্তোরাঁয়, সাথে টেসিও। এদেরকে দেখেই যে যেদিকে পারল ছুটে পালাল বডিগার্ডরা। শান্তি দিতে কখনও দেরি করে না টেসিও। আধা চিবানো পাউরুটি এখনও রয়েছে মুখের ভিতর, কিন্তু অসংখ্য বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে মারানজানোর শরীর। মারানজানো খতম, সেই সাথে যুদ্ধেরও পরিসমাপ্তি।
বলাই বাহুল্য, এরপর আপনাআপনি মারানজানো সাম্রাজ্যে কর্লিয়নি সংগঠনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। চাঁদা বা খাজনা, যাই বলা হোক, নিজের নিয়মে সেগুলো সংগ্রহের ব্যবস্থা করলেন ডন কর্লিয়নি। বুকমেকিং আর পলিসি জালিয়াতির কাজে যারা আগে ছিল, তাদেরকে স্ব স্ব পদে বহাল রাখলেন তিনি। অনেক লাভের মধ্যে একটা হলো, রেডিমেড পোশাক তৈরির শ্রমিক সংঘে একটা পা ফেলার জায়গা পাওয়া গেল–ভবিষ্যতে এই ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।
ব্যবসা সংক্রান্ত ঝামেলা তো মিটল, কিন্তু ডন দেখলেন বাড়িতে অশান্তির সূচনা হয়েছে।
সনি, সান্তিনো কর্লিয়নি মাত্র ষোলো বছরে পা দিয়েছে। সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে লম্বায় ছয় ফুট, মস্ত চওড়া দুই কাঁধ, মুখটা প্রকাণ্ড আর ভারি, দেখেই মনে হয় ইন্দ্রিয়পরায়ণ, প্রচণ্ড কামুক। শক্তিশালী বঁড় একটা। মেজ ছেলেটা শান্ত আর বোকা টাইপ। মাইকেল তো সবে হাঁটতে শিখেছে। যত গণ্ডগোল ওই সনিকে নিয়েই। যার তার সাথে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে, স্কুল ফাঁকি দেয়। একদিন একটা অভিযোগ নিয়ে এল ক্লেমেঞ্জা। সনির ধর্মবাপ সেই, অভিযোগ করা তার কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে।
