কাউকে প্রত্যাখ্যান করেন না তিনি সবাইকে সাহায্য করেন। শুধু দয়া দেখাবার জন্যে নয়, বড়লোকি ফলাবার জন্যে নয়, সাহায্য তিনি খুশি মনে, যে উপকার করার জন্যে করেন। শুধু তাই নয়, সেই সাথে দুটো উৎসাহের কথাও শোনান, ভিক্ষা গ্রহণের তিক্ত স্বাদটা যাতে ভুলে যায় তারা। তাই, রাজ্যের আইনসভায়, পৌর সংস্থায় অথবা কংগ্রেসে এই সব ইতালীয় লোকেরা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে কাকে সেব্যাপারে পরামর্শ নেবার জন্যে ডন কর্লিয়নির কাছে ছুটে আসবে না তো কার কাছে ছুটে যাবে? আর তাদেরকে পরামর্শ দেবার সময় নিজের স্বার্থটা যে দেখবেন তিনি, এতে আর আশ্চর্য হবার কি আছে? এইভাবে ধারে ধীরে রাজনীতির একজন নেপথ্য নায়ক হয়ে উঠলেন তিনি। বাস্তব বুদ্ধি আছে এমন সব দলীয় নেতারা তাঁর কাছে আসে, কি করলে তাদের ভাল হবে সে-ব্যাপারে উপদেশ পরামর্শ চায়। এই অবস্থা ডন কর্লিয়নির হাতে আরও ব্যাপক এবং প্রচুর ক্ষমতা এনে দিল, এবং একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাষ্ট্রনীতিবিদের প্রতিভা নিয়ে তিনি অনায়াসেই তাঁর এই নতুন পাওয়া প্রচণ্ড ক্ষমতাটাকে কাজে লাগিয়ে আরও বিশাল এবং দুর্ভেদ্য হয়ে উঠলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা তার দূরদৃষ্টি সম্পর্কে প্রশংসা না করে পারে না। গরীবের ছেলে, অথচ মাথাটা ভাল, এই ধরনের সবাইকে তিনি লেখাপড়া শেখান নিজের খরচে। এই সব ইতালীয় ছেলেরা কলেজ থেকে বেরিয়ে উকিল হয়, আঞ্চলিক সহকারী অ্যাটর্নি হয়, এমন কি কেউ কেউ কোর্টের বিচারক পর্যন্ত হয়ে বসে। এরা সবাই ডন কর্লিয়নির প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে। একজন মহান জাতীয় নেতা যেভাবে তার সামাজ্যের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেন, ডন কর্লিয়নিও ঠিক সেভাবে তার সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রচনা করেন।
কিন্তু মদের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যেতেই ডনের এই সাম্রাজ্য প্রচণ্ড এক আঘাত খেয়ে টলমল করে উঠল। তবে, এক্ষেত্রেও তাঁর দূরদৃষ্টির পরিচয় পাওয়া গেল। এই ধরনের কিছু একটা ঘটতে পারে, তা তিনি আগেই অনুমান করতে পেরে প্রতিকারের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। ম্যানহাটনের সমস্ত জুয়া খেলা পরিচালনা করে যে লোকটা, তার কাছে প্রতিনিধি পাঠালেন তিনি। লোকটার নাম সালভাতোরি মারানজানো। ডকের ক্রাপ খেলা থেকে শুরু করে, ঘোড় দৌড়ের বাজি, বেআইনী পোকার খেলা, পলিসি আর নম্বর নিয়ে যত রকম জালিয়াতি আছে সব তার হাতের মুঠোয়। নিউ ইয়র্কের গোটা অপরাধ জগতের সবাই তাকে যমের মত ভয় করে। সেৎসোনোভান্তি, নব্বই ক্যালিবার অর্থাৎ সর্দার বলে একবাক্যে স্বীকার করে। ডন কর্লিয়নির প্রতিনিধিরা সরাসরি প্রস্তাব করল, ব্যবসা এবং লাভের বা আধাআধি থোক, তাতে দুপক্ষেরই সুবিধা হবে। কর্লিয়নিদের আছে দৃঢ় মজবুত সংগঠন, পুলিশ আর রাজনীতিকদের প্রশ্রয়! এসবের সাহায্যে ডন কর্লিয়নি মারানজানোদের সমস্ত তৎপরতার উপর একটা বিপদ নিবারক নিচ্ছিদ্র ছাতা ধরতে পারবেন। তাছাড়া, ইচ্ছা করলে তারা ব্রুকলিন এবং ব্রঙ্কস পর্যন্ত নিজেদের কর্মতৎপরতার বিস্তৃতি ঘটাতে পারবে, সেজন্যে সব ধরনের ক্ষমতা ধার দেবেন ডন কর্লিয়নি। কিন্তু, মুশকিল হলো, মারানর্সানো লোকটার দূরদৃষ্টি বলতে গেলে কিছুই নেই, নিজের কিসে ভাল হবে তা ভেবে না দেখেই ডন কর্লিয়নির প্রস্তাব ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করল সে।
বিখ্যাত আল ক্যাপনি হলো মারানজানোর বন্ধু, তাছাড়া তার নিজেরও রয়েছে একটা সংগঠন, রয়েছে প্রচুর গোলাবারুদ। শক্তিতে কারও চেয়ে নিজেকে সে কম মনে করবে কেন? ডন কর্লিয়নিকে একজন ভূঁইফোড় ছাড়া আর কি ভাবতে পারে সে? তার তো ধারণা, অপরাধ জগতে না এসে লোকটার পার্লামেন্টের সদস্য হওয়া উচিত ছিল, তর্ক আর যুক্তি দিয়ে নোকটা দুনিয়া জয় করতে চায়। পাগল আর কি!
কিন্তু, ডন কর্নিয়নিকে চিনতে ভুল করল মারানজানো। ডন কর্লিয়নির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার ফলেই তোত বেঁধে গেল উনিশশো তেত্রিশ সালের বিখ্যাত দলীয় যুদ্ধ। এই যুদ্ধের ফলে নিউ ইয়র্ক শহরে অপরাধ জগতের গঠন প্রণালী আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ বদলে গেল।
যুদ্ধের শুরুতে মনে হলো দুপক্ষের শক্তি এক নয়। সালভাতোরি মারানজানোর সংগঠনটা খুব শক্তিশালী। তার দলের গুণ্ডারা যেমন নিষ্ঠুর তেমনি বেপরোয়া। তাছাড়া শিকাগোর আল ক্যাপনি তার বন্ধু, সেখান থেকে সৈনিক এবং অন্য সব ধরনের সাহায্য আনতে পারে সে। এদিকে তার সদ্ভাব রয়েছে টাটাগ্রিয়া পরিবারের সাথে, যাদের হাতে রয়েছে শহরের বেশ্যা ব্যবসার সবটুকু আর এখনও অবশিষ্ট কিছুটা মাদক দ্রব্যের কারবার। এসব ছাড়াও ব্যবসায়ী সমিতির প্রভাবশালী কিছু নেতাদের সাথে যোগাযোগ আছে মারাজানোর। তারা ওর কাছ থেকে গুণ্ডা ভাড়া নিয়ে অত্যাচার চালায় রেডিমেড পোশাক তৈরির শ্রমিক-সংঘের সদস্যদের উপর আর ইমারত তৈরি ব্যবসার ইতালীয় নৈরাজ্যবাদী সংঘের উপর।
মারানজানোর এই ব্যাপক শক্তির বিরুদ্ধে ডন কর্লিয়নি মাত্র দুটো ছোট ছোট দল-নামাতে পারেন। সংখ্যায় মাত্র দুটো আর আকারে ছোট হলেও দল দুটো ক্লেমেঞ্জা আর টেসিওর দক্ষ নেতৃত্বে নিখুঁতভাবে সুসংগঠিত, একটা সুশিক্ষিত সেনাদলের মত। ডন কর্লিয়নি পুলিশ আর রাজনীতিকদের প্রশ্রয় পাবেন বটে, কিন্তু মারানজানোর রয়েছে বণিক সমিতির সমর্থন। এক্ষেত্রে, ডনের ক্ষমতা মারাজানোর তুলনায় কিছুই নয়, ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। তবে ডনের মস্ত একটা সুবিধে হলো এই যে তাঁর সংগঠন সম্পর্কে কোন খবরই জানা নেই শত্রুপক্ষের। তার একটা সেনাদল থাকতে পারে, অনুমান করত অনেকেই, কিন্তু সেই দলের প্রকৃত ক্ষমতা সম্পর্কে কারও কোন স্পষ্ট ধারণা নেই। তাছাড়া, সবাই মনে করত ব্রুকলিনের টেসিওর দলটার সাথে ডনের কোন সম্পর্ক নেই, সেটা টেপিওর নিজস্ব একটা দল। কিন্তু এসব সত্ত্বেও দুদলের শক্তি সমান নয়। ডন কলিয়ান তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট আর দুর্বল, যুদ্ধে তার কোন আশা নেই। তবে বিরোধী দলের মত শুধু শক্তির উপর ভরসা করে নেই তিনি। প্রথম দিকে মার খেয়ে মার হজম করতে হলো তাকে। কিন্তু তা খুব বেশি দিন নয়। আশ্চর্য এক মোক্ষম আর নিপুণ চালে সমস্ত বিজোড় সংখ্যাগুলোকে জোড় সংখ্যায় পরিণত করলেন তিনি, শক্তির অসাম্য সৃষ্টি করলেন।
