এরপর সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়া হলো টেসিওর দলকে, তার উপর ছেড়ে দেয়া হলো ব্রুকলিনের দায়িত্ব। এর অন্যতম কারণ, আসলে ক্লেমেঞ্জার কাছ থেকে টেসিওকে দূরে সরিয়ে দিলেন তিনি। সময় বয়ে যাবার সাথে সাথে আভাসে ইঙ্গিতে তিনি ওদেরকে বুঝিয়ে দিলেন যে ওরা দুজন খুব বেশি মেলামেশা করে সেটা তাঁর পছন্দ নয়। এমন কি, একান্ত দরকার না পড়লে, সামাজিক জীবনেও নয়। বুদ্ধি চিরকালই একটু বেশি টোসওর, তাই কথাটা,শোনা মাত্র সে এর অন্তর্নিহিত কারণটা বুঝে নিল। কারণ হিসেবে ভিটো কর্লিয়নি অবশ্য বললেন, আইনের চোখে যাতে পড়তে না হয় সেজন্যেই এটা চাইছেন তিনি। কিন্তু আসল কারণ ঠিকই ধরতে পেরেছে টেসিও, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার কোন সুযোগ ক্যাপোরেজিমিদের দিতে চাইছেন না ভিটো কর্লিয়নি।
কথাটা বুঝতে পেরে মন খারাপ হয়নি টেসিওর, এর মধ্যে যে আসলে কোন, আক্রোশ, ভয় বা সন্দেহ নেই তাও বুঝতে পেরেছে সে। এটা হলো, নিরাপত্তা বিধানের বিচক্ষণ ব্যবস্থা। বিপদ ঘটে যাবার আগে সাবধানতা অবলম্বন করা। এতে দোষের কিছু নেই। দূরে সরিয়ে দেবার বিনিময়ে ব্রুকলিনে অনেকটা স্বাধীনতা দিলেন ভিটো টেওিকে। কিন্তু ক্লেমেঞ্জার ব্রঙ্কসের জায়গীরটা নিজের মুঠোর ভিতর রাখলেন। টেসিও কেন, অনেকের চেয়ে অনেক বেশি সাহসী ক্লেমেঞ্জা, মানুষ হিসেবে বেপরোয়া, কাউকে কেয়ার করা ওর ধাতে নেই। বাইরে থেকে যতই হাসিখুশি দেখাক তাকে, তার নিষ্ঠুরতাও বিস্ময়কর। তাই তাকে একটু শক্ত বাধনে রাখতে চান ভিটো কর্লিয়নি।
ত্রিশ দশকের মন্দাও এল, সেই সাথে হু হু করে বেড়ে যেতে লাগল ভিরে কর্লিয়নিদের ক্ষমতা। ঠিক এই সময় থেকেই সবাই তাকে ডন বলে সম্বোধন কর শুরু করল। ডন। ডন কর্লিয়নি। ডন ভিটো কর্লিয়নি।
সৎ আর ভালমানুষ লোকেরা খামোকা শহর চষে জুতোর সুকলা খুইয়ে ফেলে সৎ একটা চাকরির খোঁজে, বাজার মন্দা বলে কেউ তারা কোথাও সুবিধে করতে পারে না। এদের মধ্যে কিছু লোক, যাদের এক ধরনের গর্ব আর ন্ত আছে, তারাও বাধ্য হয়ে অপমান হজম করে, নিজের আর পরিবারের মাথা হেঁট করে সরকারী লঙ্গরখানা থেকে ভিক্ষার দান গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু ডন কর্লিয়নির লোকেরা? তারা ফিটফাট বাবুসাহেব হয়ে বেরোয়, বুক উঁচিয়ে হাঁটে, তাদের সবগুলো পকেট টাকায় ভর্তি হয়ে ফুলে থাকে। চাকরি হারাতে হবে, এদের কারও মনে সে-ভয় নেই। এসব দেখেশুনে এমন কি ডন ভিটো কর্লিয়নির মত একজন বিনয়ী মহান পুরুষও একটু একটু গর্ব অনুভব করেন। নিজের এলাকা আর নিজের লোকদের জন্যে যতটা করা সম্ভব তার চেয়ে বেশি করেন তিনি। তার উপর নির্ভর করে যারা, কাজে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, তাকে উৎসর্গ করে দিয়েছে নিজেদের জীবন আর ভাগ্য, তাদেরকে তিনি ডুবিয়ে দেন না। যদি বা কখনও তার কোন লোক অ্যারেস্ট হয়ে জেলে যায়, তার পিরবারের কথা ভেবে মুষড়ে পড়তে হয় না তাকে, কারণ সে জানে, তার স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, বুড়ো মা-বাপ-পিরবারের সবাই ভাল খেয়ে, ভূল পরে দিন কাটাবে, যতদিন না সে আবার বেরুতে পারছে জেল থেকে। এই এ ধরনের হতভাগাদের পরিবারকে দয়া করে, বাধ্য হয়ে সামান্য খুঁদকুড়ো দেয়া হয়, ব্যাপারটা মোর্টেও সে-রকম নয়। মুক্ত অবস্থায় লোকটা যা বেতন পেত তার সবটাই দেয়া হয়।
এর পিছনে সবটাই সৎ খৃস্টান সুলভ বদান্যতা আছে, ব্যাপারটা তাও নয়। ডনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ, অন্তরঙ্গ বন্ধুরাও তাকে বেহেশতের ফেরেশতা বলে মনে করে না। এই দয়া-দাক্ষিণ্যের মধ্যে কিছুটা স্বার্থও আছে বৈকি। কোন বুদ্ধিমান মানুষ, সে মহান হোক বা নিকৃষ্ট হোক, তার প্রতিটি কাজে স্বার্থ থাকতে হবে, একজন সাধারণ মানুষের বেলাতেও এই কথা সত্যি। ডন ভিটো কর্লিয়নির যে সব লোকেরা জেলে যায় তারা জানে, যত জেরাই করা হোক, মুখ ভোলা চলবে না। শুধু মুখ বুজে থাকলেই তার পরিবারের সবাই আগের মতই সুখে-শান্তিতে থাকবে। ডনের প্রতি শ্রদ্ধা আর সততা বজায় রাখলে জেল থেকে বেরুলে রাজকীয় অভ্যর্থনা জুটবে তার কপালে। তার বাড়িতে বিরাট খানাপিনার ব্যবস্থা করবেন ডন। আত্মীয় স্বজন আর বন্ধুরা আসবে সেই উৎসবে, সবাই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠবে। তারপর, উৎসবের শেষে রাত যখন অনেক গভীর, তখন তার কাছে আসবে কনসিলিয়রি গেনকৈা আবানদাণ্ডো, কিম্বা হয়তো এমন কি স্বয়ং ডন নিজেই। তার সাহস আর সতোর প্রশংসা করে যাবেন তারা। তাকে সম্মান দেখিয়ে তিনি হয়তো তার বাড়িতে তৈরি একগ্লাস মদ নিয়ে দুচুমুক খাবেন, আর ফেরার সময় তাকে দিয়ে যাবেন প্রচুর টাকা, উপহার হিসেবে। সে যাতে তার দৈনন্দিন কাজে আবার যোগ দেবার আগে সপরিবারে কোথাও থেকে বেড়িয়ে আসতে পারে বা কয়েকটা দিন মামোদ ফুর্তি করে বেড়াতে পারে। এই রকম অপার ভালবাসা, সহানুভূতি আর বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে থাকেন ডন কর্লিয়নি।
বৃহত্তর জগৎ যারা পরিচালনা করে তারা তার উন্নতির পথে বাধা তো বটেই, তাদেরকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। কিন্তু এক সময় উপলব্ধি করলেন, তাদের তুলনায় নিজের আয়ত্তাধীন এলাকাটা তুলনামূলকভাবে অনেক ভালভাবে পরিচালনা করেন নিজে। পাড়ার গরীব লোকেরা সাহায্যের জন্যে তার কাছে বারবার এসে ধারণাটাকে আরও দৃঢ় করে তোলে। তাদের কি না উপকারে লাগছেন তিনি। সরকারী সাহায্য পাবার জন্যে, অল্পবয়েসী ছেলেকে একটা চাকরি পাইয়ে দেবার জন্যে, এই সাংঘাতিক দুর্দিনে কিছু টাকা ধার পেতে, বিপদে পড়লে দয়া ভিক্ষা করতে, ফ্যাসাদে পড়লে মধ্যস্থতা করে দেবার অনুরোধ জানাবার জন্যে সবাই আসছে তার কাছে– তিনি ছাড়া এসব ব্যাপারে তাদেরকে সাহায্য করার আর আছেইবা কে?
