শুরুটা সহজ আর স্বাভাবিক ভাবেই হলো।
গেনকোর বিশুদ্ধ তেল কোম্পানির মাল আনা নেয়া করার জন্যে ছটা ট্রাক কেনা হয়েছে। হঠাৎ, প্রায় রাতারাতি, অন্য কাজে লাগিয়ে দেয়া হলো সেগুলোকে।
চোরা পথে বেআইনীভাবে মদ, আনায় এমন একদল লোক একদিন দেখা করতে এল ভিটো কর্লিয়নির সাথে, ক্লেমেঞ্জাই নিয়ে নিল তাদেরকে। কানাডা থেকে অ্যালকোহল আর হুইস্কি নিয়ে আসে তারা। এখন তারা নিউ ইয়র্কেও এগুলো সরবরাহ করতে চাইছে, সেজন্যে তাদের কম আর ট্রাক দরকার। সাধারণ লোকজন হলে চলবে না, তাদেরকে বিচক্ষণ, নির্ভরযোগ্য আর সৎ হতে হবে, থাকতে হবে গায়ের আর মনের জোর। লোক আর ট্রাকের জন্যে ভিটো কর্লিয়নিকে মোটা টাকা দিতে রাজি আছে তারা। ভাড়ার অঙ্ক শুনে খুশি হলেন ভিটো কর্লিয়নি। এত খুশি হলেন যে তার তেলের ব্যবসা বেশ একটু খাটো করে এনে প্রায় সারাক্ষণের জন্যে ট্রাকগুলোকে বেআইনী মদ ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিলেন। অথচ লোকগুলোর প্রস্তাবের মধ্যে মোলায়েম একটা শাসানি ছিল, তারা ভিটো কর্লিয়নিকে প্রচ্ছন্ন ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিল তাদের দুর্বলতার কোন রকম সুযোগ নিতে চেষ্টা করলে বা অন্য কোন ধরনের চালাকি করার চেষ্টা করলে পরিণতি ভাল হবে না। তা সত্ত্বেও ওদেরকে সাহায্য করলেন ভিটো। এই অল্প বয়সেও তার বুদ্ধি এতটা হয়ে উঠেছে যে দুএকটা হুমকি, শাসানি, আর অল্প স্বল্প চোখ রাঙানিতে তিনি অপমান বোধ করেন না। রাগ করে কোন লাভজনক প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়া তার স্বভাব নয়। অবশ্যই তিনি চোরাকারবারীদের শাসানিটা যাচাই করে দেখে নিলেন, তাতে কোন সার-পদার্থ আছে বলে মনে হয়নি। তবে নতুন সহকর্মীদের যোগ্যতা সম্পর্কে তার বিশ্বাস একটু কমে গেল। এমন নির্বোধ ব্যাটারা, ভাবলেন তিনি, শাসাবার কোন দরকার নেই যেখানে, শুধু শুধু সেখানেও শাসায়। মনে মনে ঠিক করে রাখলেন, বিষয়টা নিয়ে তাকে আরও কিছু ভাবনা চিন্তা করতে হবে।
নতুন কর্মক্ষেত্রেও সাফল্য অর্জন করলেন ভিটো। তিনি নিজে অবশ্য সাফল্যটাকে খুব বড় করে দেখলেন না। খানিকটা জ্ঞান, কিছু যোগাযোগ আর একটু অভিজ্ঞতা–এগুলোকেই ৭ড় গাওয়া বলে মনে করলেন তিনি। ব্যাংকাররা যেমন জামিনের দলিল-পত্র আর টাকা জমা রাখে, ভিটো কর্লিয়নিও সেই রকম সৎকর্ম সংগ্রহ করতে শুরু করেছেন। উপকার করো, উপকার পাও, তাঁর নিজের জীবন দর্শনের একটা পরিচ্ছেদের সারমর্ম এটাই। উপকার কেউ চাইলে তাকে তিনি ফিরিয়ে দিতে পারেন না। আরও কটা বছর কেটে গেল। সেই সাথে প্রমাণিত হয়ে গো একজন আশ্চর্য গুণী ব্যক্তিই শুধু নন ভিটো কর্লিয়নি, নিজের ক্ষেত্রে অসাধারণ একটা প্রতিভাও বটেন।
অসংখ্য ইতালীয় পরিবার তাদের বাড়িতে ছোট ছোট মদের আড্ডা বসায়। অবিবাহিত শ্রমিকরা এই সব আড্ডার খদ্দের, একগ্লাস মদ কিনতে পনেরো সেন্ট খরচ হয় তাদের। এই সব খদ্দের আর আড্ডাগুলোর রক্ষাকর্তা হয়ে উঠলেন ভিটো কর্লিয়নি। সিনিয়রা কলম্বোর ছোট ছেলেটা যখন গির্জায় বিশ্বাস আনল, তিনি তার ধর্মবাপ হলেন, তাকে একটা বিশ ডলারের স্বর্ণমুদ্রা উপহার দিলেন। ওদিকে মাঝে মধ্যে পুলিশ যেতার দুটো একটা ট্রাক আটক করবে তাতে আর আশ্চর্য হবার কি আছে, এমন তো হবেই। তাই গেনকে আবানাতো আগেই একজন তুখোড় ওস্তাদ উকিল ভাড়া করে রেখেছে। এই উকিলের আবার যত কড়া মেজাজের পুলিশ অফিসার অ.কোটের জজসাহেবের সাথে খুব খাতির আর দোস্তি। তারা যাতে দয়া করে টাকা নিতে রাজি হয় তার ব্যবস্থা করা হলো। দেখতে দেখতে দয়া করে টাকা খাওয়ার দল সংখ্যায় বিস্ময়করভাবে বেড়ে যেতে শুরু করল। ফলে বিরাট একটা তালিকা তৈরি করার প্রয়োজন দেখা দিল কলিয়নি পরিবারের। প্রতি মাসে টাকা যত বেশি দিতে হয় ততই খুশি হন ভিটো কর্লিয়নি, ততই ফুলে-ফেঁপে ওঠে তার ব্যবসা। এখনও টাকা দেবার দরকার মেই এমন লোকদের নাম তালিকা থেকে কেটে দিতে চাইল উকিল, কিন্তু ভিটো বললেন, না, না, সবার নাম থাকুক। গুরুত্বপূর্ণ আর কেউ যদি থাকে তাদের নামও টুকে রাখো। এদের কাছ থেকে এখনি হয়তো কাজ পাব না আমরা, তবু নামগুলো থাকুক। শুধু বন্ধুতেই বিশ্বাস রাখি। আমি, আর আমি যে তাদের বন্ধুত্ব চাই সেটা আমার তরফ থেকেই প্রথম প্রকাশ পাক।
যত দিন যাচ্ছে, আরও বিরাট বিশাল হয়ে উঠছে কর্লিয়নি সামাজ্য। আরও অনেক ট্রাক কেনা হয়েছে, দয়া করে টাকা খাওয়ার দল সংখ্যায় আরও বেড়েছে। আগে ক্লেমেঞ্জা আর টেসিও যত লোক নিয়ে কাজ করত তাদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে দ্বিগুণ তিনগুণ হয়ে উঠেছে। ব্যবসার আয়তন আর কর্মচাঞ্চল্য এত বেশি ব্যাপক হয়ে উঠল যে গোটা ব্যাপারটা সামাল দেয়া মুশকিল। সময় হয়েছে বলে মনে হতেই সংগঠনটাকে একটা সুশৃঙ্খল নিয়মের মধ্যে বেঁধে ফেললেন ভিটো কর্লিয়নি।
ক্লেমেঞ্জা আর টেসিওর আনুষ্ঠানিক পদোন্নতি ঘটল, কাপ্তান বা ক্যাপোরেজিমি উপাধি পেল ওরা। এদের নিয়ে যারা কাজ করছে তারা সবাই সৈনিক। নিজের কনসিলিয়রি হিসেবে বেছে নিলেন গেনকো আনদাণ্ডোকে, অর্থাৎ সে হলো তাঁর উপদেষ্টা। তার নিজের আর প্রত্যক্ষ কর্ম-তৎপরতা ও ক্রিয়াকলাপের মাঝখানে আরও অনেক নিরাপত্তার কঠিন পাচিল তৈরি করে রাখলেন, যাতে আইন বা আর কারও পক্ষে তাকে ছোঁয়া অসম্ভব হয়ে ওঠে। আদেশ বা হুকুম করলে গেনকো অথবা ক্যাপোরেজিমিদের কাউকে করেন, তখন সেখানে আর কারও উপস্থিতি সম্ভব নয়। অনেক সময় বিশেষ কোন আদেশ শুধু বিশেষ একজনকেই দেন, তৃতীয় আর কারও কানে সে-কথা যায় না। তার মানে কোন সাক্ষী রেখে কোন হুকুম দেন না তিনি।
