তাঁর ব্যবসার ধরন অন্য ব্যবসায়ীদের চেয়ে একটু আলাদা, তার কারণ খুব অল্প টাকা নিয়ে প্রায় অসহায় অবস্থায় শুরু করেছেন তিনি। বিজ্ঞাপন দেয়াতেও বিশ্বাস নেই তার। বিক্রি বাড়াবার কৌশল হিসেবে নির্ভর করেন মুখের কথার উপর। তাছাড়া, সত্যি কথা হলো, প্রতিযোগীদের তুলনায় তার কোম্পানীর জলপাই তেলটা কোন দিক থেকেই সরেস নয়। তাই সাধারণ ব্যবসায়ীদের মামুলি কৌশলগুলো ব্যবহার করার সুযোগ নেই তাঁর। তিনি নির্ভর করেন নিজের ব্যক্তিত্বের উপর, শ্রদ্ধেয় মাতবর হিসেবে তার একটা বিস্ময়কর খ্যাতি আছে, তিনি সেটাকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করেন।
এখনও অল্প বয়েস, কিন্তু এরই মধ্যে ভিটো কর্লিয়নিকে একজন তীক্ষ্ণবিচার বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ বলে চিনে নিয়েছে সবাই। তার ধৈর্য লক্ষ করে অবাক হয়ে যায় সবাই। হুমকি দেয়া তো দূরের কথা, কাউকে কখনও ধমক পর্যন্ত মারেন না। কেউ বলতে পারবে না, আজ পর্যন্ত কাউকে তিনি শাসিয়েছেন। তাঁর নিয়মই হলো সব সময় যুক্তি দেখিয়ে কথা বলা। আর তার যুক্তিগুলোও এমন বলিষ্ঠ যে সেগুলো অস্বীকার বা খণ্ডন করার জো থাকে না কারও। কেউ যাতে না ঠকে, সবাই যাতে লাভের ন্যায্য ভাগ পায়, সেদিকেও তার তীক্ষ্ণ নজর। কেউ কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হোক বা ব্যবসায় লোকসান দিক তা তিনি চান না। তাঁর এই নীতির কথা তিনি সংশ্লিষ্টদের কাছে পরিষ্কার করে ব্যাখ্যাও করে থাকেন। প্রতিযোগীদেরকে তিনি বোঝাতে চেষ্টা করেন, হয় একচেটিয়া ব্যবসা করো, নয়তো কেটে পড়ো, পাততাড়ি গোটাও। মুক্ত প্রতিযোগিতায় লাভ কম, ঝামেলাও পোহাতে হয় অনেক বেশি। আসল মজা হলো একচেটিয়া ব্যবসাতে। একজন প্রতিভাবান ব্যবসায়ী বলেই ব্যাপারটা শুধু বুঝতে পেরেই ক্ষান্ত হননি তিনি, প্রতিযোগীদেরকে সময় থাকতে ভরাডুবি এড়াবার উপায় বাতলে দিয়ে, স্রেফ উপকার করার উদ্দেশ্যে, এক এক করে কিনে নিতে শুরু করেছেন তাদের ব্যবসাগুলো। অর্থাৎ ব্যবসা থেকে আসল মজা পেতে চান তিনি, নিজের জগতে হতে চান একচ্ছত্র অধিপতি। এটা তার একটা স্বপ্ন। স্বপ্নটাকে বাস্তবে রূপ দেবার সাধনাই তিনি করছেন।
কিন্তু নানা দিক থেকে বাধাও আসছে বৈকি।
কয়েকজন পাইকারী তেল ব্যবসায়ী আছে ব্রুকলিনে, খুব বদমেজাজী তারা, সাংঘাতিক গোঁয়ার, যুক্তির ধারেকাছে আসতে রাজি নয়। ভিটো কর্লিয়নির যে একটা স্বপ্ন আছে, শত চেষ্টা করেও সে-কথা তাদেরকে বোঝানো যায় না। অথচ প্রচুর ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে সমস্ত খুঁটিনাটিসহ গোটা ব্যাপারটা তাদেরকে তিনি নিজে, বুঝাবার চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত এদের ব্যাপারে হতাশই হতে হলো তাকে। অসহায় ভঙ্গিতে, অনেকটা আত্মসমর্পণের কায়দায় শরীরের পাশ থেকে হাত দুটো তুলে নৈরাশ্য প্রকাশ করলেন তিনি।
ফিরে এসে টেসিওকে রুকলিনে পাঠালেন তিনি। তার উপর নির্দেশ থাকল ওখানে একটা আস্তানা গাড়তে হবে, এবং সমস্যাটার একটা সমাধান বের করতে হবে। টেসিওঁর জন্যে কাজটা কঠিন তো নয়ই, বরং পানির চেয়েও সহজ হলো। কারণ সমাধানটা কি হবে সে ব্যাপারেও স্বচ্ছ পরামর্শ দিয়েছেন ভিটো কর্লিয়নি।
এরপর একের পর এক পুড়তে শুরু করল ব্রুকলিনের গুদামগুলো! রাস্তার উপর টন টন জলপাই তেলের পুকুর তৈরি হলো। এমন অবস্থা কেউ কখনও দেখেনি, এমন কি স্বপ্নে পর্যন্ত ভাবেলি-সারা দিনরাত গুদাম এলাকায় বিশাল ধোয়ার স্তম্ভ আর আগুনের লকলকে শিখা দেখা যায়। এই সব চলছে, এর মধ্যে ঘটল আরেক ঘটনা। ঘটনার যে নায়ক, তার কাণ্ডজ্ঞান বলতে কিছুই নেই। বাড়ি ছিল মিলানে, নিজের সম্পর্কে তার ধারণা সব সময়ই খুব উঁচু, এমন দাম্ভিক লোক খুব কমই দেখেছেন ভিটো কর্লিয়নি। সেন্টরা যীশুর উপর যতটা বিশ্বাস রাখে, পুলিশের উপর এই লোকের তার চেয়েও বেশি বিশ্বাস। কি সম্পর্ধা লোকটার, সত্যি সত্যি দেশীভাইদের নামে নালিশ করার জন্যে থানায় গেল সে। সেই সাথে দশ দশটা শতকের পুরানো ওমের্তো অর্থাৎ ঠোঁট না খোলার নিয়ম পর্যন্ত ভাঙতে ইতস্তত বোধ করল না। নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারল বেচারা। ব্যাপারটা তো বেশি দূর গড়াতে দেয়া যায় না। তাই তাকে গায়েব হয়ে যেতে হলো। তারপর থেকে কারও চোখে পড়েনি সে। সবাই শুধু জানল লোকটা বাতাসে মিলিয়ে গেছে, তবে নিজের ইচ্ছায় নয়। ধরে নেয়া হলো সতী স্ত্রীটি বিধবা, আর ছেলেমেয়ে তিনটে বাপহারা হয়েছে। তবে যীশুর দয়ায় ছেলেমেয়েগুলোর বয়স একেবারে কম নয়, বাপের ব্যবসা চালাবার দায়িত্ব নিতে পারল তারা। বাপের চেয়ে বরং বেশিই বুদ্ধি রাখে ছেলেগুলো, কোন ঝামেলায় না গিয়ে নিজেরাই যেচে পড়ে গেনকোর বিশুদ্ধ জলপাই তেল কোম্পানীর সাথে আপস মীমাংসা করে নিল।
মায়ের পেট থেকে মহান ব্যক্তি হয়ে জন্মায় না কেউ! যারা মহান আর মহৎ ই, নিজেদের চেষ্টায় আর কর্মফলে একটু একটু করে হয়ে ওঠেন। সব মহান বাক্তির বেলাতে এই একই নিয়ম। এই নিয়মে ভিটো কর্লিয়নিও তাই হয়ে উঠেছেন।
এর মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত দ্রব্যের তালিকায় মদও পড়ে গেল, বন্ধ করে দেয়া হলো মদ বেচাকেনার ব্যবসাগুলোকে। ঠিক এই সময় চরম পদক্ষেপ নিলেন ভিটো কর্লিয়নি, অর্থাৎ নিয়তির পথে আরও এক ধাপ এগোলেন। এতদিন ছিলেন একজন সাধারণ ব্যবসায়ী, ব্যবসাটাকে বড় করার জন্যে ছোটখাট এক-আধটু নির্মমতার পরিচয় কখনও দিতেন, এই যা। কিন্তু এবার তিনি ঢুকলেন পুরোপুরি বেআইনী ব্যবসার জগতে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত ছিলেন সাধারণ একজন ব্যবসায়ী মানুষ, সেই পদ থেকে উঠে এলেন ডন বা নেতার পদে। একদিন বা একবছরে সম্ভব হয়নি এটা। মদের উপর নিষেধাজ্ঞা জারির মেয়াদ যখন শেষ হয়ে আসছে আঁর আমেরিকা জুড়ে ইতিহাসখ্যাত ব্যবসায়িক মন্দা যখন শুরু হতে যাচ্ছে, তার আগেই ভিটো কর্লিয়নি মহাপরাক্রমশালী একজন অধিপতি হয়ে উঠেছেন। হয়ে উঠেছেন গড়ফাদার। ডন। ডন কর্লিয়নি।
