চোখ ফুটতে খুব বেশি সময় লাগল না রবার্টোর। সেদিন সন্ধ্যার মধ্যেই ভিটো কর্লিয়নি সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে শুরু করল সে। আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করল না। ভিটো কর্লিয়নির দরজায় টোকা পড়ল সেই রাতেই। এত বেশি রাত করে আসার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়ে ভিটোর স্ত্রীর হাত থেকে এক গ্লাস মদ গ্রহণ করল। রবার্টো। লজ্জিত ভঙ্গিতে ভিটো কর্লিয়নিকেবলল, গোটা ব্যাপারটাই ভুল বুঝেছিল সে। কে বলেছে সিনিয়রা কলম্বো তার বাড়িতে থাকতে পারবেন না? একশো বার থাকতে পারবেন। থাকবেন তো বটেই, কুকুরটাকেও ফিরিয়ে নিয়ে এসে নিজেদের সাথে রাখবেন। আর সব ভাড়াটেরা, যারা অত কম ভাড়া দেয়, রাতে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে বলে তাদেরই বা নালিশ করার কি অধিকার আছে? কথা শেষ করে নিঃশব্দে টেবিলের উপর তিরিশটা ডলার রেখে দিল রবার্টো, তারপর আবার আন্তরিকতার সাথে বলল, আপনি মহৎ পুরুষ, সেজন্যেই এই বিধবা মহিলাকে এভাবে সাহায্য করছেন। বিশ্বাস করুন, নিজের আচরণে ভীষণ লজ্জা পেয়েছি। আমি। তবে, আমিও দেখাতে চাই যে খৃস্টান সূলভ কিছু সদগুণ আমার মধ্যেও আছে। সিনিয়রার ভাড়া বাড়ানো হলো না।
ছোট্ট একটা প্রহসন, কিন্তু যে যার ভূমিকায় আশ্চর্য সুন্দর ভাবে অভিনয় করে গেল। নিজের হাতে মদ ঢেলে পরিবেশন করলেন ভিটো, ফরমায়েশ দিয়ে কেক আনালেন, খুশি মনে রবার্টোর হ্যাণ্ডশেক করে তার সহৃদয়তার প্রশংসা করতেও ভুল করলেন না। রাবার্টোও একটা খুব বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে দৃঢ় কণ্ঠে জানাল, ভিটো কর্লিয়নির মত একজন মানুষের সাথে পরিচয় ঘটায় মানবজাতির উপর তার বিশ্বাস ফিরে এসেছে।
২.৯ একজন শ্রদ্ধেয় মাতবর
০৯.
একজন শ্রদ্ধেয় মাতবর হিসেবে পাড়ার সবাই আজকাল মেনে চলে ভিটো কর্লিয়নিকে। ভিটো কর্লিয়নি কাউকে কিছু বলতে যাননি, তাঁর বন্ধুরাও কিছু রটায়নি, কিন্তু তবু সবাই বলাবলি করে, তিনি নাকি সিসিলীয় মাফিয়া সংগঠনের একজন সদস্য। ফার্নিশ করা একটা কামরা ভাড়া নিয়ে জুয়ার আড্ডা বসায় এক লোক, প্রতি হপ্তায় যেচে পড়ে আসে সে, প্রতিবার, বিশটা করে ডলার দিয়ে যায় ভিটোকে, বিনিময়ে তিনি যেন তার বন্ধ থাকেন। বন্ধুত্বটা প্রকাশ করার জন্যে লোকটার আচ্ছায় হপ্তায় দুএকবার ঘুরে আসতে হয় তাকে, সবাই যাতে বুঝতে পারে লোকটা তার প্রশ্রয় পাচ্ছে।
দোকানদাররাও আসে তার কাছে। ছোকরা কিছু গুণ্ডা তাদেরকে জালাতন করে, ওরা এসে তার কাছে বিচার দাবি করে। বিচার মানে। দোকান এলাকায় মাঝে মধ্যে যেতে হবে তাকে, তাতেই কেটে পড়বে ছোকরাগুলো। নাছোড়বান্দা এই সব দোকানদারদের অনুরোধও ফেলতে পারেন না ভিটো, অগত্যা যেতে হয় তাঁকে, বিনিময়ে উপযুক্ত সম্মানীও নিতে হয়। এই সময় আর এই জায়গার তুলনায় রাতিমত মোটা অঙ্কের টাকা রোজগার হচ্ছে তাঁর, হপ্তায় একশো ডলারের কম নয়। বন্ধু আর শিষ্য বলতে সেই দুজন, ক্লেমেঞ্জা আর টেসিও। এদেরকেও ভাগ দেন তিনি। চায়া কখনও, তবু নিজে থেকেই দেন। এর মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আশ্রয়দাতা আবানদাণ্ডোর ছেলে অর্থাৎ তার কৈশোরের বন্ধু গেনকো আবানদাড়োকে জলপাই-তেল আমদানির ব্যবসায়ে নামাবেন। সম্পূর্ণ ব্যবসাটা সামলাবে গেনকো, তার মানে, ন্যায্য দাম দিয়ে ইতালি থেকে কিনে জলপাই-তেল আমদানি করবে সে, নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা করবে তার বাবার গুদামে। কারবারের এই সব দিক সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা আছে, ভিটো কর্লিয়নি তার সেই অভিজ্ঞতাটা কাজে লাগাতে চান। আর তেল বিক্রি করার দায়িত্ব নেবে তাঁর দুই শিষ্য, ক্লেমেঞ্জা আর টেসিও। প্রথমে ম্যানহাটান, তারপর ব্রুকলিন, সবশেষে ব্রঙ্কসের সবগুলো ইতালীয় দোকানে যাবে ওরা দোকানদারদেরকে গেনকোর বিশুদ্ধ জলপাই তেল কিনতে রাজি করাবার চেষ্টা করবে। সবিনয় সরলতার সাথে তিনি জানালেন এই ব্যবসার সাথে তার নাম কোন ভাবেই জড়ানো হবে না। অবশ্যই কারবারের মালিক থাকবেন তিনি, কারণ, পুঁজির প্রায় সবটুকু তিনিই যোগাবেন। ঠিক হলো, যে-সব ক্ষেত্রে দোকানদাররা ক্লেমেঞ্জা আর টেসিওর অনুরোধ সত্ত্বেও তাদের মাল কিনতে রাজি হবেনা, সে-সব ক্ষেত্রে তিনি নিজে যাবেন। এ-ধরনের সমস্যায় তার শারীরিক উপস্থিতিই যে যথেষ্ট সে-ব্যাপারে কারও মনে কোন সন্দেহ নেই। তাতেও যদি কাজ না হয় তখন তিনি নিজের পদ্ধতি অনুযায়ী কাজ হাসিল করবেন।
পরবর্তী কটা বছর ছোট একজন ব্যবসায়ী হিসেবে যথেষ্ট উন্নতি করলেন ভিটো কর্লিয়নি। ক্রমশ ব্যবসার আয়তন বাড়ছে তাঁর, নিজের সবটুকু শক্তি আর মেধা এর পিছনে ব্যয় করছেন তিনি। ছেলেদের একজন কর্তব্যপরায়ণ বাবা, স্ত্রীর একজন দায়িত্বশীল স্বামী হওয়া সত্তেও হাতে তার এত বেশি কাজের চাপ থাকে যে এদের দিকে নজর রাখার জন্যে খুব বেশি সময় তিনি দিতে পারেন না। বিশুদ্ধ গেনকোর জলপাই তেল ক্রমশ আমেরিকার সবচেয়ে নাম করা আর জনপ্রিয় তেল হয়ে উঠেছে, আর সেই সাথে ব্যবসা থেকে অগাধ টাকা কামাচ্ছেন ভিটো কর্লিয়নি। বুদ্ধিমান যে-কোন একজন ব্যবসায়ীর মত ধারে ধীরে তিনিও বুঝলেন, ব্যবসা বড় করতে হলে বাজার দরের চেয়ে জিনিসের দাম একটু কম রাখতে হয়। অন্য কোম্পানীর মাল দোকানে একেবারে না রাখতে বা খুব কম করে রাখতে দোকানদারদেরকে রাজি করিয়ে প্রতিযোগীদেরকে ব্যবসা থেকে হটিয়ে দেবার ব্যবস্থা করতে হয়। যে-কোন উচ্চাভিলাষী এবং মেধাবী ব্যবসায়ীর মত তারও ইচ্ছা প্রতিযোগীদের ব্যবসায় লাল বাতি জ্বালিয়ে অথবা তার কাছে তাদের সবার ব্যবসা বিক্রি করে দিতে রাজি করিয়ে, ক্রমশ একটা একচেটিয়া ব্যবসার মালিক বনে যাওয়া।
