কিন্তু…লোকটা, মানে বাড়িওয়ালার কথা বলছি, তাকে আপনি সত্যি রাজি করাতে পারবেন তো?
সিনিয়র রবার্টো? অবাক হয়ে বললেন ভিটো। সে কি, রাজি হবেন না কেন? সব ভালমানুষই যুক্তি মেনে চলে, উনিও তো একজন ভালমানুষ। আপনার অসুবিধেটা একবার যদি তাকে ভালভাবে বুঝিয়ে বলতে পারি, নিশ্চয় আপনার ওপর দয়া হবে তার। এত দুশ্চিন্তা করবেন না তো। দুশ্চিন্তা করলে শরীর খারাপ হয়। ছেলেমেয়েদের ভালর কথা ভেবেই নিজের স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখবেন।
এই পাড়াতেই পাঁচটা কম ভাড়ার ফুাট-বাড়ি আছে সিনিয়র রবার্টোর, রোজ একবার করে সেগুলো দেখতে আসে সে।এক সময় লোকটা আদম বেপারী ছিল, ইতালীয় শ্রমিকরা জাহাজ থেকে নামতে যা দেরি, সাথে সাথে তাদেরকে সে বড় বড় কর্পোরেশনগুলোর কাছে বিক্রি করে দিত। এই আদম ব্যবসাতে প্রচুর টাকা কামিয়েছে সে, সেই টাকা দিয়েই কিনেছে এই বাড়িগুলো। জন্ম উত্তর ইতালিতে, লেখাপড়াও শিখেছে, কিন্তু দক্ষিণের সিসিলি আর নেপলস থেকে আমদানি এই সব নিরক্ষর লোকগুলোকে দুচোখে দেখতে পারে না সে। তার বাড়িতে নোংরা পোকার মত কিলবিল করে এরা, বাতাস চলাচলের জায়গায় আবর্জনা ফেলে, ঘরের দেয়াল আরশোলা আর ইঁদুর খুবলে খেলেও নিজেদের সম্পত্তি নয় বলে এসব ক্ষতি দেখে একটা আঙুল পর্যন্ত তোলে না। মানুষ হিসেবে মন্দ বলা যাবে না রবার্টোকে। বাপ হিসেবে ভাল, স্বামী হিসেবে সৎ। রাত দিন টাকা বাড়াবার ফিকির খোঁজা যদি দোষের হয়, তবে এই একটা দোষ খুব বেশি পরিমাণেই আছে তার। কোথায় কত টাকা খাটছে, লাভ হলো না লোকসান হলো, আরও লাভ কোন পথে আসবে, হিসাব-পত্র নির্ভুল হচ্ছে কিনা-এইসব নিয়েই চব্বিশ ঘণ্টা মাথা ঘামাচ্ছে সে। ফলে মেজাজটা তার সবসময় খিঁচড়ে থাকে। একটা বিষয়ে আলাপ করার জন্যে ভিটো কলিয়নি তাকে যখন পথে দাঁড় করাল, দ্রুত এবং সংক্ষেপে কথা বলল সে। রেগেমেগে অভদ্র ব্যবহারই করতে যাচ্ছিল, কিন্তু ভেবেচিন্তে নিজেকে সংযত করে রাখল। ছোকরাকে অতি ভালমানুষ আর নিরীহ দেখালেও, এইসব দক্ষিণ দেশীয়দের। একটুও বিশ্বাস করা যায় না, খারাপ ব্যবহার করলে, কোন নিশ্চয়তা নেই, ঘ্যাচ করে, হয়তো ছোরা সেঁধিয়ে দেবে পেটে।
সিনিয়র রবার্টো, অত্যন্ত ভদ্রতার সাথে বললেন ভিটো কর্লিয়নি, আমার গিন্নীর বান্ধবী একজন গরীব বিধবা, তার ওপর না আছে স্বামী, না আছে কোন পুরুষ অভিভাবক। শুনলাম তাকে নাকি বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছে। সেই থেকে বেচারি তো একেবারে ভেঙে পড়েছেন হতাশায়। তাই তাকে বলেছি, আপনার সাথে কথা বলে দেখব আমি। বলেছি, সিনিয়র রবার্টো তো আর অন্যান্য কিছু করতে পারেন না, তিনি হয়তো কিছু ভুল বুঝেছেন! যত গণ্ডগোলের মূল লতা ওই জানোয়ারটা, সেটাকে যখন বিদায় করেই দিয়েছে, এখন আর থেকে যেতে অসুবিধে কোথায়। ঠিক কিনা? আমি একজন ইতালীয়, আপনিও তাই। দয়া করে আপনি আমার এই উপকারটা করুন।
সামনে দাঁড়ানো যুবকের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রবার্টো।দেখছে, ছোকরা লম্বায় মাঝারি, কিন্তু গড়নটা বলিষ্ঠ। সম্ভবত গেঁয়ো ভূত, গোটা একটা চাষা। তবে গুণ্ডা, খুনে বা ডাকাত যে নয় সে-ব্যাপারে তার কোন সন্দেহ নেই। অন্তত হাবভাব, চেহারা-সুরত দেখে তা মনে হচ্ছে না। তবে, ছোকরার স্পর্ধা আছে বলতে হবে, হাস্যকর দুঃসাহস দেখাচ্ছে কেমন!-ব্যাটা নাকি একজন ইতালীয়।
শ্রাগ করল রবার্টো। বলল, অন্য ভাড়াটে ঠিক করে ফেলেছি আমি। তারা আরও বেশি ভাড়া দেবে তোমার লোকের জন্যে তাদেরকে আমি নিরাশ করতে পারি না।
এমন ভাবে মাথা নাড়লেন ভিটো কর্লিয়নি দেখে মনে হলো রবার্টোর যুক্তিটা তিনি মেনে নিলেন। জানতে চাইলেন, কত বেড়েছে ভাড়া?
পাঁচ ডলার, মিথ্যে কথা বলল রবার্টো। রেল লাইনের পাশে ফ্ল্যাট, চারটে অন্ধকার ঘুপচি, এর জন্যে সিনিয়রা কলম্বো দেয় বারো ডলার, নতুন ভাড়াটেকেও এরচেয়ে বেশি দিতে রাজি করাতে পারেনি রবার্টো।
পকেট থেকে এক তাড়া নোট বের করে তা থেকে দশ ডলারের তিনটে নোট খুলে নিয়ে ভিটো কর্লিয়নি বললেন, এই নিন, ছমাসের অ্যাডভান্স। সিনিয়রাকে দয়া করে কিছু বলবেন না, খুব বেশি আত্মসম্মানবোধ তার, ব্যাপারটা জানতে পারলে লজ্জা এবং দুঃখ পাবেন। আবার আপনি আমার সাথে ছমাস পর দেখা করবেন। আর একটা কথা কুকুরটাকে অবশ্যই ওদের কাছে থাকতে দেবেন।
কচু দেব! খেপে গিয়ে প্রায় ভেংচে উঠল রবার্টো। কোথাকার লাটসাহেব হে তুমি এত বড় স্পর্ধা, আমার উপর হুকুম চালাচ্ছ। ফের যদি একটা বাজে কথা মুখে আনো, এ্যায়সা এক লাথি মারব, বাপের নাম পর্যন্ত ভুলে ঋবে।
বিশুদ্ধ বিস্ময়ে ভিটো কর্লিয়নির হাত দুটো আপনাআপনি শরীরের পাশ থেকে উপর দিকে উঠে এল। কয়েক সেকেণ্ড অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর বললেন, আপনার কাছে শুধু একটু দয়া ভিক্ষা চাইছি আমি, আর তো কিছু নয়। বন্ধুর সাহায্য কখন কার দরকার হয়, কে বলতে পারে, বলুন? টাকাটা নিন, মনে করুন এটা আমার সদিচ্ছার নমুনা, তারপর ভেবেচিন্তে দেখে মনস্থির করুন। আপনার ইচ্ছার উপর তো আর জোর নেই আমার। রবার্টোর হাতে নোটগুলো খুঁজে দিলেন ভিটো ৫ টাকাটা নিলেই মনে করব আপনি আমার একটা উপকার করলেন। তারপর যা স্থির করবেন, তাই হবে। কাল সকালে এটা যদি ফিরিয়ে দিতে চান, তাই দেবেন। সিনিয়রা কলম্বোকে আপনি যদি বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন, দেবেন, আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিই বা আমার করার আছে, বলুন! বাড়িটা তো আর আমার নয়, ওটা আপনার সম্পত্তি। আপনার কথা মতই তো চলবে সব। কুকুর রাখতে দিতে চান না, কারণটা বুঝি। আমি নিজেও জন্তু-জানোয়ার ভালবাসি না। হাত তুলে রবার্টোর কাঁধ চাপড়ে দিয়ে আবার বলতেন তিটো, দয়া করে আমার এই উপকারটুকু করুন আপনি, কেমন? চিরকাল মনে রাখব। এদিকে আপনার যারা বন্ধু-বান্ধব আছে, তাদেরকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে দেখবেন। সবাই আপনাকে জানাবে, কেউ উপকার করলে আমি তার প্রতিদান দিতে ভালবাসি। আমি যে অকৃতজ্ঞ নই, এটুকু আপনার জানা হয়ে যাবে।
