মাথা নেড়ে ক্লেমেঞ্জা বলল, টাকার আমার দরকার নেই।
নিঃশব্দে টাকাগুলো পকেটে ভরে রাখলেন ভিটো। অপেক্ষা করছেন তিনি। ওঁরা তিনজন পরস্পরকে পরিষ্কার বুঝতে পারছেন। সবচেয়ে বড় কথা মনের মিল খুঁজে পাচ্ছেন ওঁরা। ক্লেমেঞ্জা আর টেসিও জানে, ভিটো খুন করেছেন ফানুচিকে। যদিও দুজনের কেউই কথাটা মুখে আনেননি। বাইরের কারও সামনে তো নয়ই, এমন কি ভিটো কর্লিয়নির সামনেও নয়। তবু কিছুদিনের মধ্যেই পাড়াসুদ্ধ সবাই জেনে গেল ব্যাপারটা। ব্যস, আর যায় কোথা, একজন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি হিসেবে সবাই ভিটো কর্লিয়নিকে খাতির করতে শুরু করে দিল। কিন্তু, ভিটো কর্লিয়নি ফানুচির বেআইনী ব্যবসা আর টাকা আদায়ের সুযোগগুলোর একটাও হস্তগত করার কোন চেষ্টা করলেন না। ব্যাপারটা কি বুঝতে না পেরে হতভম্ব হয়ে গেল সবাই।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা ঘটবার তাই ঘটল।
তখন রাত। ভিটো কর্লিয়নিকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই তার স্ত্রী প্রতিবেশিনী এক বিধবাকে সাথে করে বাড়িতে নিয়ে এলেন। মহিলা ইতালীয়, চরিত্রে কোন খুঁত নেই। বাপহারা ছেলেপুলেদের মানুষ করার জন্যে হাড়ভাঙা খাটতে হয় তাকে। বড় ছেলেটির বয়েস মোনলা, ফেলে আসাদেশের ঐতিহ্য অনুযায়ী মাস শেষে বেতনের টাকার সবটাই মায়ের হাতে তুলে দেয়। আর মেয়েটির বয়েস সতেরো, কাজ করে। একটা দর্জির দোকানে। ভাইয়ের মত সেও বেতনের টাকা নিজের কাছে রাখে না। ওদের পরিবারের সবাই বাড়তি কিছু আয়ের জন্যে রাত জেগে কার্ডের উপর বোতাম সেলাই করে। খাটনির তুলনায় এই কাজের পারিশ্রমিক এত কম যে এই কাজ করার জন্যে লোকই পাওয়া যায় না। যাদের আর কোন উপায় নেই শুধু তারাই কাজটা করে। এই পরিবারটি সেই দলের। মহিলার নাম সিনিয়রা কলম্বো।
সিনিয়রা তোমার কাছ থেকে একটা উপকার চাইতে এসেছেন, ভিটোকে বললেন তার স্ত্রী। বলছেন, ইচ্ছা করলে ওর সমস্যাটা মিটিয়ে দিতে পারো তুমি।
ভদ্রমহিলা নিশ্চয়ই টাকা চাইবেন, ভাবছেন ভিটো কর্লিয়নি, টাকা দেবার জন্যে মনে মনে তৈরিও হয়ে গেলেন। কিন্তু তার কথা শুনে নিজের ভুল বুঝতে পারলেন তিনি। মহিলার সমস্যা টাকা নয়, একটা কুকুর। তার ছোট ছেলের ভারি প্রিয় ওটা। কিন্তু বাড়িওয়ালার কানে নালিশ গেছে রাতে নাকি কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করে। তাতে খুব রাগ হয়েছে বাড়িওয়ালার, সাথে সাথে হুকুম দিয়েছে কুকুরটাকে যেন বিদায় করে দেয়া হয়। মহিলাও পরে এমন ভাব দেখিয়েছেন যেন কুকুরটাকে বিদায় করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু একটা জ্যান্ত কুকুরকে তো আর দিনের পর দিন গোপন করে রাখা যায় না, রাখতে চাইলেই বা সে থাকতে রাজি হবে কেন! যাই হোক, বাড়িওয়ালা বুঝল, তাকে ঠকানো হয়েছে। তাতে আরও বেশি রেগে গেল সে, চরম পত্র দিয়ে মহিলাকে জানিয়ে দিল, বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে তাদেরকে। ব্যাপারটা এতদূর গড়াবার পর মহিলা বুঝলেন কুকুরটাকে সত্যি এবার বিদায় করে দিতে হবে, দিলেনও তাই। কিন্তু বদরাগী বাড়িওয়ালা এখন আর কোন কথা শুনতে রাজি নয়, বাড়ি ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ প্রত্যাহার করছে না সে। হুমকি দিয়ে বলেছে, ভালয় ভালয় যদি বাড়ি ছেড়ে দেয়া না হয়, পুলিশ ডেকে বের করে দেয়া হবে। এদিকে, কুকুরটাকে দেখতে পাচ্ছে না বলে ছোট ছেলেটা এমন কান্নাকাটি করছে যে পরিবারের সবাই তার জন্যে চিন্তিত হয়ে পড়েছে। কুকুরটা তো গেছেই, সেই সাথে শুধু শুধু বাড়িটাও ছাড়তে হচ্ছে।
মৃদু গলায় জানতে চাইলেন ভিটো কর্লিয়নি, কিন্তু এ-ব্যাপারে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারব তা আপনার মনে হলো কেন?
সিনিয়রা কলম্বো ভিটোর স্ত্রীর দিকে ইঙ্গিত করে বলল, উনিই তো বললেন কথাটা আপনার কানে তুললে আপনি একটী ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন।
আশ্চর্য হয়ে গেলেন ভিটো। ফানুচিকে খুন করার রাতে তিনি কাপড় কেচেছিলেন, কিন্তু সে-ব্যাপারে তাকে কোন প্রশ্ন করেননি তাঁর স্ত্রী। চাকরি-বাকরি নেই অথচ কখনও জানতে চাননি এত টাকা আসে কোত্থেকে। এখন, এই মুহূর্তেও তিনি স্ত্রীর চেহারায় কোন ভাবের প্রকাশ দেখছেন না। স্ত্রীর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে সিনিয়রার দিকে তাকালেন তিনি, বললেন, বাড়ি বদল করা খরচের ব্যাপার, আপনি চাইলে এই খরচটা আমি দিয়ে দিতে পারি।
দ্রুত এদিক ওদিক মাথা দোলালেন মহিলা, চোখে তার পানি এসে গেছে। নিজেকে সামলে নিতে নিতে বললেন, আমার সব বন্ধু আর আপনজনেরা এই এলাকায় থাকে, দেশে এদের সাথেই মানুষ হয়েছি আমি। এদেরকে ছেড়ে অন্য পাড়ায় অচেনা লোকদের সাথে থাকতে একেবারেই মন বসবে না আমার। বাড়িওয়ালাকে বলে এখানেই যাতে থাকতে পারি, তার একটা ব্যবস্থা করে দিন আপনি।
ঘাড় কাত করে ভিটো কর্লিয়নি বললেন, সমাধান তাহলে হয়েই গেল। বাড়ি আপনি ছাড়তে চাইছেন না, তার পিছনে যথেষ্ট যুক্তিও রয়েছে। অন্য কোথাও যাবার দরকার নেই আপনার। সকালে আমি কথা বলব বাড়িওয়ালার সাথে।
স্বামীর দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন মিসেস ভিটো। কিছু বললেন না ভিটো কর্লিয়নি, তার চেহারা দেখেও বোঝা গেল না কিছু, কিন্তু মনে মনে তিনি খুশি হলেন। সিনিয়রার দিকে তাকালেন তিনি, মনে হলো এখনও পুরোপুরি নিশ্চয়তাবোধ করছে না সে।
