মৃদু একটু কাঁপছে শরীরটা, কিন্তু সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আছেন তিনি। পোশাক ছাড়ার সময় ভাবলেন নিজের অজান্তে কাপড়-চোপড়ের কোথাও দুএক ফোঁটা রক্ত লেগে থাকতে পারে। কাপড় কাঁচার সোডা আর মেটে রঙের সাবান একটা ধাতব গামলায় ফেলে কাপড়গুলোকে ভিজিয়ে রাখলেন কিছুক্ষণ, তারপর বাসনকোসন ধোবার সিঙ্কের শক্ত ধাতব পাতের উপর ফেলে ভাল করে রগড়ালেন সেগুলো। সবশেষে সোডা সাবান দিয়ে মেজে ঘষে সাফ করলেন গামলা আর সিঙ্কটা। স্ত্রীর সদ্য ধোয়া একগাদা কাপড়চোপড় শোবার ঘরে আগেই দেখে এসেছেন, সেগুলোর সাথে নিজেরগুলো মিলিয়ে রাখলেন তিনি। নতুন, পরিষ্কার শার্ট আর ট্রাউজার পরে ধীরেসুস্থে হেঁটে চলে এলেন বাড়ির সামনের দিকে, ছেলেদেরকে নিয়ে পাড়া প্রতিবেশীদের সাথে গল্প করছেন সেখানে তার স্ত্রী।
এত সাবধানতা অবলম্বনের আসলে কোন দরকার ছিল না। পরদিন ভোরে আবিষ্কার হলো ফানুচির লাশ, পুলিশই প্রথম দেখতে পেল। কিন্তু এ-ব্যাপারে কোন প্রশ্নই করা হলো না ভিটো কর্লিয়নিকে। ফামুচি খুন হবার রাতে ফানুচি যে তার বাড়িতে এসেছিল এ-কথাটা পর্যন্ত কানে যায়নি পুলিশের। বেশ আশ্চর্যই হলেন ভিটো। পুলিশের কানে কথাটা গেলে কিছু এসে যেত না তার, বহাল তবিয়তে ক্ষানুচিকে তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে দেখেছে অনেক লোক, এই সব লোকের সাক্ষ্য থেকেই প্রমাণিত হয়ে যাবে খুনটার সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। ঘটনাটা ঘটে যাবার অনেকদিন পর ভিটো শুনেছিলেন, পুলিশ ফানুচির খুনীকে ধরার কোন চেষ্টাই করেনি, ফানুচি খুন হওয়াতে তারা বরং খুশিই হয়েছিল। গুণ্ডা-গোষ্ঠীদের নিজেদের ব্যাপার এটা, রেষারেষির আরেকটা ফল, এই ধরে নিয়েছে তারা। একেবারে কর্তব্য এড়িয়ে যাওয়া হয় বলে চোরাকারবারের সাথে জড়িত কিছু গুণ্ডাপাণ্ডাকে জিজ্ঞাসাবাদ করল বটে, কিন্তু কাউকে আটক করার ঝামেলা পোহাতে গেল না পুলিশ। সবাই জানে ভিটো কর্লিয়নি কখনও কোন গোলমালে পড়েননি, শান্ত আর ভালমানুষ হিসেবে তার সুখ্যাতি আছে, তাই ব্যাপারটার সাথে কেউ তাকে জড়ায়নি।
তাই বলে সবার চোখে ধুলো দিতে পারেননি ভিটো কর্লিয়নি। পুলিশ কিছুই টের পেল না, কিন্তু সঙ্গীরা? ঘটনাটা ঘটার দিন থেকে আজ প্রায় হপ্তা দুই তাঁকে এড়িয়ে চলছে ক্লেমেঞ্জা আর টেসিও। তারপর, অনেকটা আনুষ্ঠানিক ভঙ্গিতে, তার সাথে দেখা করার জন্যে এক সন্ধ্যায় তার বাড়িতে এসে হাজির হলো ওরা। শ্রদ্ধা, জানাবার জন্যে মনস্থির করেই এসেছে, কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বলছে না। ওরা যে প্রকাশ্যে তাকে সম্মান জানাতে এসেছে তা ভিটো কর্লিয়নি বুঝতে পারছেন ওদের চেহারা দেখে; চোখের দৃষ্টিতে সবিনয় আত্মসমর্পণের ভাব দেখে। তিনি নিজেও কিছু বলতে গেলেন না, এমন কি কিছু বলতে হবে কিনা সে-ব্যাপারে মাথা পর্যন্ত ঘামালেন না। মুখের চেহারা ভাবলেশহীন, কিন্তু নির্বিকার সৌজন্যের সাথে ওদেরকে অভ্যর্থনা জানালেন তিনি, যত্নের সাথে মদ পরিবেশন করলেন।
দুজনের মধ্যে আগে মুখ খুলল ক্লেমেঞ্জা । মৃদু কণ্ঠে বলল, একটা কথা। নাইনথ এভেনিউয়ের দোকান মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা নিচ্ছে না কেউ। একই অবস্থা জুয়ার আড্ডাগুলোর, ওদের কাছ থেকেও টাকা নেবার কেউ নেই।
একদৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে আছেন ভিটো কর্লিয়নি। শুনলেন। কিন্তু কোন উত্তর দিচ্ছেন না। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখল ওরা, কিন্তু এরপরও যখন ভিটো কর্লিয়নি চুপ করে থাকলেন, আবার কথা বলতে হলো ওদেরকে। এবার বলল টেসিও, ফানুচির ভূমিকাটা তো আমরা নিতে পারি। যাদের কাছ থেকে টাকা নিত ও, তারা আমাদেরকেও টাকা দেবে।
পাথরের মত স্থির হয়ে বসে আছেন ভিটো কর্লিয়নি। হঠাৎ কাঁধ ঝাঁকালেন তিনি। বললেন, আমার কাছে কেন এসেছ? এসব ব্যাপারে আমার কোন আগ্রহ নেই।
হাসল ক্লেমেঞ্জা। এই অল্প বয়সেও, বিরাট ভূড়ি বাগাবার আগেই, একটু হাসলেই প্রকাণ্ড মুখটা আরও বড় দেখায় তার, যেন সাংঘাতিক একজন মোটাসোটা মানুষ হাসছে। হাসিটা মুখে ধরে রেখেই এতক্ষণে একটা প্রশ্ন করল সে ভিটো কর্লিয়নিকে, তোমাকে একটা পিস্তল দিয়েছিলাম। কোথায় সেটা? ওটা যখন আর দরকার নেই তোমার, আমাকে ফিরিয়ে দিলেই পারো।
অত্যন্ত ধীর এবং নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে সাইড পকেট থেকে একতাড়া নোট বের করলেন ভিটা, কর্লিয়নি, গুণে পাঁচটা নোট আলাদা করলেন, তারপর বাড়িয়ে ধরলেন সেগুলো ক্লেমেঞ্জার দিকে। নাও, এটা তোমার পিস্তলের দাম। ট্রাক লুট করার পর ফেলে দিয়েছিলাম ওটা। দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসছেন তিনি।
এই জিনিসটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কর্লিয়নির, কিন্তু আজও তিনি নিজে এই হাসির ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া টের পান না। ভয় দেখাবার কোন চেষ্টা নেই, তবে ঠাণ্ডা হিম একটা ভাব আছে তাতে। ভঙ্গিটা এমন, যেন কি একটা ভারি মজার কৌতুক মনে পড়ে গেছে, যার তাৎপর্য এবং রস তিনি ছাড়া আর কেউ উপভোগ করতে পারছেন না। সাংঘাতিক কোন পরিস্থিতি ছাড়া এই হাসি দেখা যায় না তার মুখে, আর যেহেতু মজার কৌতুকটা মোটেই গোপনীয় বা ব্যক্তিগত কিছু নয়, তার উপর তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হলো তিনি যুক্তি মেনে চলেন, কথা বলেন কম, এবং সেই মুহূর্তে তার চোখ দুটো কখনও হাসে না, তাই অকস্মাৎ ওই হাসির ভিতর দিয়ে তার আসল চেহারা বেরিয়ে পড়লেই হ্যাঁৎ করে ওঠে বুক, যেন ঝপি থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এসে ফণা তুলে ছোবল মারতে উদ্যত হয়েছে বিষধর গোক্ষুর। কিন্তু তার সেই হাসিতে কোন ফোঁস-ফোসানি নেই, ব্যঙ্গ নেই, নেই কোনরকম চেষ্টাকৃত ভাবের প্রলেপ।
