অন্ধকার হলরূমে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। হঠাৎ একটা সাদাটে অস্পষ্ট ছায়া দেখতে পেলেন। দরজার দিকে এগিয়ে আসছে। হ্যাঁ, চিনতে পারছেন আবছা মূর্তিটাকে। ফানুচি।
পিছু হটলেন ভিটো, ভিতরের সিঁড়ির দিকে এগোবার দরজার কাছে পৌঁছে থামলেন। দরজার গায়ে হেলান দিয়ে অনায়াস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। যেন হাতে কোন কাজ নেই, চুপচাপ সময় কাটাচ্ছেন। অবশ্য, হাতটা বাড়িয়ে রেখেছেন সামনের দিকে, সময় হয়েছে বলে মনে করলেই যাতে গুলি করতে পারেন। বাইরের দরজাটা একেবারে কাছেই, বাড়িয়ে ধরা পিস্তলটা থেকে বড়জোর তিন হাত। দরজার কবাট দুটো খুলে যাচ্ছে। চৌকো একটা আলো পড়ল সামনে, সেটার উপর ফানুচির ছায়া পড়ছে, ঢাকা পড়ে যাচ্ছে আলোটা { একটা গন্ধ ঢুকল নাকে, ফানুচির গায়ের গন্ধ। চৌকো আলোটা সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে যেতে গুলি করলেন ভিটো।
দরজাটা খোলা থাকলেও গুলির আওয়াজ বাইরের রাস্তায় খুব সামান্যই পৌঁছুল, কিন্তু প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠল গোটা বাড়ি। দরজারদুদিকের মোটা কাঠ ধরে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছে ফানুচি, পিস্তলটা বের করার জন্যে পকেটের মুখ হাতড়াচ্ছে। গুলি লেগে কোর্টের বোতাম ছিঁড়ে গেছে তার, হাঁ হয়ে গেছে সেটা। তার পকেট থেকে উঁকি দিচ্ছে পিস্তলটা, দেখতে পাচ্ছেন ভিটো। সাদা শার্টে লাল মাকড়সার জালের মত একটা নকশা ফুটে উঠেছে। অত্যন্ত সাবধানে, কোনরকম তাড়াহুড়ো না করে, যেন অতি যত্নের সাথে সুচ দিয়ে শিরা ফুটো করে কাউকে ইঞ্জেকশন দিচ্ছেন, লাল মাকড়সার জালটার ঠিক মাঝখানে, লক্ষ্য স্থির করলেন তিনি। তারপর দ্বিতীয়বার গুলি করলেন। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল ফানুচি, তার শরীরের ধাক্কা খেয়ে পুরোপুরি খুলে গেল দরজাটা। ভয়ঙ্কর একটা গোঙানির আওয়াজ বেরিয়ে আসছে গলার ভিতর থেকে, অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণায় মানুষ যেমন বিকট আর্তনাদ ছাড়ে, অথচ অদ্ভুত হাস্যকর শোনায় কানে। তার সেই গোঙানির শব্দ থামেনি, ভিটো কর্লিয়নির পরে মনে পড়েছিল অন্তত বার তিনেক আর্তনাদটা কানে ঢুকেছিল তার।
চর্বি ভরা প্রকাণ্ড মুখটা ঘামে চক চক করছে ফানুচির। পিস্তলের নলটা তার কপালে ঠেকালেন ভিটো। নলটা একটু বাঁকা করে গুলি করলেন, যাতে মগজে ঠিকমত গিয়ে ঢেকে বুলেটটা। বসা অবস্থা থেকে শুয়ে পড়ল ফানুচি, খোলা, দরজাটার উপর একটা নিষ্প্রাণ জড় পদার্থের স্থাপ-এর মত দেখাচ্ছে। দুই সেকেণ্ড আগেই মারা গেছে সে। প্রথম গুলি করার পর মাত্র পাঁচ সেকেণ্ড পেরিয়েছে।
ফানুচির পকেট থেকে সাবধানে ওয়ালেটটা বের করে নিজের পকেটে ভরলেন ভিটো কর্লিয়নি। রাস্তাটা পেরোবার সময় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার দেখে নিলেন চারদিক। রাস্তার দুই দিকই ফাঁকা, নির্জন। গুদামঘর পেরিয়ে উঠানে বেরিয়ে এলেন, সেখান থেকে লোহার সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠলেন। উঁকি দিয়ে আরেকবার দেখে নিলেন নিচের রাস্তাটা। দরজার উপর এখনও পড়ে আছে ফানুচি, কেউ নেই তার ধারে কাছে। শুধু দুটো জানালা খুলে গেছে ফ্যাট-বাড়ির, কয়েকটা কালো রঙের মাথা উঁকি দিচ্ছে বাইরের দিকে। ওদের কারও মুখ দেখতে পাচ্ছেন না ভিটো, তার মানে, তিনি ধরে নিলেন, ওরাও তার মুখ দেখতে পাচ্ছে না। আর দেখতে পেলেই বা কি? এরা অন্য জাতের লোক, কখনও পুলিশে খবর দেয় না। ওই দরজার উপর ফানূচি সম্ভবত সারারাত পড়ে থাকবে, তবে টহলে বেরিয়ে এদিকে যদি আসে তাহলে কোন পুলিশ.ধাক্কা খেতে পারে লাশটার সাথে। যেচে পড়ে এ-বাড়ির একজন লোকও পুলিশকে কিছু জানাতে যাবে না। জিজ্ঞেস করলে সবাই একই কথা বলবে, কেউ কিছু দেখেনি, কেউ কিছু শোনেনি।
তাড়াহুড়ো করার কোন কারণই দেখছেন না ভিটো কর্লিয়নি। শান্ত, অনুত্তেজিতভাবে একটা একটা করে ছাদগুলো পেরোলেন তিনি, নিজেদের বাড়ির ছাদে এসে দরজাটা খুললেন, তারপর নেমে এলেন নিচে। ফ্ল্যাটের দরজার তালা খুলে ভিতরে ঢুকে ভিতর থেকে আবার তালা মেরে দিলেন। নিহত ফানুচির ওয়ালেটটা খুলে দেখলেন তার দেয়া সাতশো ডলার ছাড়া আর একটা মাত্র পাঁচ ডলারের নোট রয়েছে। খুঁজতে গিয়ে গোপন একটা খোপ পেয়ে গেলেন তিনি, তাতে একটা স্বর্ণমুদ্রা রয়েছে, পাঁচ ডলারের। ভিটো কর্লিয়নি ভাবলেন, ফানুচি পয়সাওয়ালা গুণ্ডা ছিল না, নয়তো সাথে টাকা নিয়ে ঘুরে বেড়াবার অভ্যাস ছিল না তার। যাই হোক, ওয়ালেটের হাল-অবস্থা দেখে তার পুরানো কয়েকটা সন্দেহ সমর্থন লাভ করুল।
ওয়ালেট আর পিস্তলটা যে গায়েব করে দিতে হবে তা তিনি জানেন, সেই সাথে এও বুঝলেন যে ওয়ালেটের ভিতর স্বর্ণমুদ্রাটাও রেখে দেয়া দরকার। সিঁড়ি বেয়ে আবার উঠলেন তিনি, কয়েকটা ছাদ আর পাঁচিল পেরোলেন। তারপর একটা বাতাস চলাচলের জায়গায় ফেলে দিলেন ওয়ালেটটা। বাকি বুলেটগুলো বের করলেন পিস্তল থেকে, কিন্তু পাচিলে আছাড় মেরেও ভাঙতে পারলেন না মলটাকে। শেষ পর্যন্ত উল্টো করে ধরে একটা চিমনির গায়ে প্রচণ্ড শক্তিতে কয়েকটা বাড়ি মারতে দুভাগ হয়ে গেল সেটা। নল আর হাতল আলাদা করার জন্যে আরও কয়েকটা শক্ত বাড়ি মারতে হলো। প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে একেকটা এয়ার শাফটের ভিতর ফেলে দিলেন। পাঁচতলা থেকে সোজা নিচে, মাটিতে পড়ার সময় কোথাও ঘষা খেয়ে বা ধাক্কা লেগে একটু শক্ত হলো না। সবগুলো টুকরো আবর্জনা স্তূপে পড়ে একেবারে ডুবে গেল। সকালেই সবগুলো জানালা থেকে আরও আবর্জনা ফেলা হবে, তখন ওগুলো পুরোপুরি চাপা পড়ে যাবে। এরপর নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে এলেন ভিটো।
