তবু, নিয়তির পথে প্রথম পা ফেলার আগে তার আচরণের মধ্যে খানিকটা ইতস্তত ভাব দেখা গেল। এমন কি, ট্রাউজারের পকেটে সাতশো ডলার ভরে রাখলেন তিনি। আর ডান পকেটে রাখলেন পিস্তলটা, ট্রাক থেকে রেশমের পোশাক লুট করার সময় এটা তাকে দিয়েছিল ক্লেমেজা।
ঠিক সময়ে, নটা বাজতে না বাজতে এসে হাজির হলো ফানুচি! ক্লেমেঞ্জার উপহার দেয়া ঘরে তৈরি এক বোতল মদ টেবিলের উপর রাখলেন ভিটো কর্লিয়নি। মাথা থেকে খুলে সাদা ফিডরা টুপিটা মদের বোতলের পাশে রাখল ফানুচি। একটু আরাম পাবার জন্যে ফুল-কাটা রঙচঙে চওড়া টাইয়ের নটটা ঢিলে করে নিল সে, আরাম করে বসল। গ্রীষ্মের রাত, আজ আবার অন্য দিনের চেয়ে অনেক বেশি গরম পড়েছে। ক্ষীণ, আবছা আলো বিলি করছে গ্যাসের বাতি। বাড়িটা নিস্তব্ধ, কোথাও কোন শব্দ নেই। এই প্রচণ্ড গরমেও, আশ্চর্য, ঠাণ্ডা বরফ হয়ে আছে ভিটো কর্লিয়নির শরীর। সতোর নমুনা দেখাবার জন্যে ট্রাউজারের পকেট থেকে সাতশো ডলারের তোড়াটা বের করলেন তিনি, সেটা ফানুচির বাড়িয়ে দেয়া হাতে ধরিয়ে দিলেন। তার চোখে সতর্ক দৃষ্টি ফুটে উঠেছে, ফানুচি টাকাগুলো গুণছে, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি। গোণা শেষ করে পকেট থেকে মস্ত একটা চামড়ার ওয়ালেট বের করল ফানুচি, নোটের হোড়াটা তার ভিতর রেখে দিল সে। তারপর ধীরেসূন্থে মদের গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বলল, আরও দুশো ডলার পাওনা থাকল আমার।
বিনয়ের সাথে, অনুগ্রহ চাওয়ার ভঙ্গিতে ভিটো কর্লিয়নি বলেন, চাকরি-বাকরি নেই, আমার এখন হাত একটু টান যাচ্ছে। দয়া করে কয়েকটা হপ্তা আমাকে আপনার কাছে ঋণী থাকতে দিন।
কৌশলটা টিকে যেতে পারে, বেশিরভাগ টাকা তো পেয়েই গেছে ফানুচি। ভিটো ভাবলেন, অপেক্ষা করতে বলায় ফানুচি রেগে উঠবে বলে মনে হয় না, আর হাতে সময় পেলে তিনি হয়তো অনুনয় বিনয় করে বাকি টাকা না দেবার আর্জিও পেশ করতে পারবেন। বলা যায় না, ফানুচি হয়তো সে-আর্জি মঞ্জুরও করতে পারে।
মদের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে আর মিটিমিটি হাসছে ফানুচি। তুমি দেখছি দারুণ চালাক ছেলে, বলল সে। এতদিন তুমি আমার চোখে পড়োনি কেন বলো তো? শোনো এমন গা ঢাকা দিয়ে আর চুপচাপ থাকলে নিজের সুবিধে করা যায় না, বুঝলে? আমার সাথে যোগাযোগ রেখো; এমন সব কাজ পাইয়ে দেব, প্রচুর রোজগার করতে পারবে।
সবিনয় ভদ্রতার সাথে মাথা কাত করে উৎসাহ আর আগ্রহ দেখালেন ভিটা কর্লিয়নি। ফানুচির মদের গ্লাস্টা আবার ভরে দিলেন তিনি। কি যেন বলতে যাচ্ছে সে, কিন্তু কি মনে করে শেষ মুহূর্তে ক্ষান্ত হলো। চেয়ার ছেড়ে উঠে পঁড়াল সে, ভিটোর বাড়িয়ে দেয়া হাত ধরে ঝাঁকিয়ে দিল, বলল, কিছু মনে করোনি তো? হোমার কোন কাজ করে দিতে পারব বলে মনে করলে আমাকে শুধু একটা ব্বর দিয়ো। আজ আমার সাথে ভাল ব্যবহার করেছ, তাতে তোমারই অনেক সুবিধে হবে, দেখো।?
অপেক্ষা করছেন ভিটো কর্লিয়নি। সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে ফানুচি, ধীরে ধীরে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে। প্রচুর লোকজন রয়েছে রাস্তায়, তারা সবাই দেখল বহাল তবিয়তে ভিটোর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল ফানুচি। তারমানে, প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর কোন অভাব হবে না (অবশ্য আদৌ যদি সাক্ষী দেবার কোন দরকার পড়ে)।
জানালা দিয়ে দেখলেন ভিটো, ইলেভেনথু স্ট্রীটের দিকে বাঁক নিচ্ছে ফানুচি। বুঝলেন, বাড়িতেই ফিরছে সে। আদায় করা টাকা বাড়িতে তুলে রেখে আবার হয়তো বেরোবে, নতুন দাও-এর সন্ধানে টহল দিয়ে বেড়াবে রাস্তায় রাস্তায়। পিস্তলটাও হয়তো রেখে দেবে বাড়িতে।
নিজের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠলেন ভিটো কর্লিয়নি। চৌকো ছাদগুলো একটার পর একটা নিঃশব্দ পায়ে দৌড়ে পেরিয়ে যাচ্ছেন তিনি। একটা গুদামঘরের ছাদে পৌঁছে থামলেন, চারদিকে চোখ বুলিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে নিলেন কেউ তাকে লক্ষ করছে কিনা। রাতের অন্ধকারে কাউকে দেখতে পাচ্ছেন না, তারমানে তাকেও দেখতে পাচ্ছে না কেউ। লোহার সিঁড়ি বেয়ে একটা বাড়িতে নামলেন। পা দিয়ে এক ধাক্কায় গুদাম ঘরের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলেন। সামনের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন বাইরে। সস্তাদরের একটা ভাড়া করা ফ্ল্যাটে থাকে ফানুচি, রাস্তার ওপারেই দেখা যাচ্ছে সেটা। এদিকে সারি সারি গুদামঘর ছাড়া আর কিছুই নেই, মরুভূমির মত খা খা করছে, মাঝখানে শুধু একটা বাড়ি, সেটাতেই থাকে ফানুচি। বাড়ির ভাড়াটেরা বেশিরভাগই রেললাইনের শ্রমিক আর সস্তাদরের নোংরা বেশ্যা। কাজ থেকে ফিরে এরা সবাই বিয়ারের দোকানে মদ গিলতে চলে যায়, ভদ্র ইতালীয়দের মত রাস্তায় বসে গল্প করার ধাত নয় এদের। গোটা ইলেভেনথ এভিনিউ মরা সাপের মত পড়ে আছে, ফাঁকা, নির্জন। কারও চোখে না পড়েই রাস্তাটা পার হলেন ভিটো। ফু্যাট বাড়ির হলরুমে ঢুকে পিস্তলটা বের করলেন। জিনিসটার দিকে ভাল করে তাকাবেন না, কিভাবে গুলি করবেন সে ব্যাপারেও মাথা ঘামাচ্ছেন না। অথচ এটা তিনি এখনও ব্যবহারই করেননি।
কাঁচের দরজা দিয়ে তাকিয়ে আছেন বাইরে, জানেন, টেন এভিনিউ-এর দিক থেকে আসবে ফানুচি। ক্লেমেঞ্জা তাকে আনাড়ী ভেবেই পিস্তলটা দেবার সময় এটা ব্যবহার করার পদ্ধতি দেখিয়ে দিয়েছিল। তার অবশ্য জানা থাকার কথা নয় যে একেবারে ছোটবেলায় বাবার সাথে প্রায়ই শিকারে বের হতেন তিনি, মাত্র নবছর বয়সেই ভারি লুপারা শটগান ছুঁড়তে পারতেন। অত কম বয়েসে লুপারা ছোঁড়ায় তাঁর নৈপুণ্য দেখেই বাপকে খুন করার পর হত্যাকারীরা তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল।
