শুধু মাথা নাড়লেন ভিটো কর্লিয়নি। উত্তরে কিছু বলার কষ্টটুকু পর্যন্ত স্বীকার করলেন না। একটু পর টেসিওকে বললেন, টাকাটা নেবার জন্যে আজ রাত নটার সময় এখানে আসতে হবে, ফানুচিকে শুধু এই কথাটা জানিয়ে দিয়ে। একটু মদ খাইয়ে, রসের গল্প করে, মন গলাবার চেষ্টা করব ওর, তারপর বুঝিয়ে শুনিয়ে ঠিক রাজি করে ফেলব কম টাকায়।
অসম্ভব! এদিক ওদিক মাথা দুলিয়ে বলল টেসিও। নিজেকে অতবড় ভাগ্যবান মনে কোরো না। ফানুচি তার দাবি থেকে একচুল পিছু হটেছে বলে শুনিনি কখনও।
যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করব, বললেন ভিটো কর্লিয়নি। পরবর্তী জীবনে এই কথাটা তার মুখে এত বেশি বার শোনা গেছে যে শুধু বিখ্যাত নয়, এর নির্দিষ্ট আলাদা একটা অর্থ দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। নিষ্ঠুর, মর্মান্তিক, চরম আঘাতের আগে এটা ছিল শেষ সতর্কবাণীর মত, তার মানে বিষধর সাপ ফণা তুলেছে, এখন শুধু ছোবল মারার অপেক্ষা, যে-কোন মুহূর্তে তা মারা হতে পারে। ভিটো কর্লিয়নি ডন হবার পর প্রতিপক্ষদের সাথে আলোচনায় বসে যখন এই কথাটা বলতেন, সাথে সাথে বুঝে নিত তারা রক্তপাত আর খুন-খারাবি বাদ দিয়ে আপস করার এটাই শেষ সুযোগ দিচ্ছেন তিনি।
স্ত্রীকে ডেকে ভিটো কর্লিয়নি বললেন, খাওয়ার পাট চুকলে ছেলেদুটোকে পাড়ারই অন্য কারও বাড়িতে যেন রেখে আসে সে। তার অনুমতি ছাড়া ওদেরকে যেন ফিরিয়ে আনা না হয়। ছেলেদেরকে পৌঁছে দিয়ে এসে স্ত্রীকে ফিরে আসতে হবে, তার কাজ হবে বাড়ির দরজায় বসে পাহারা দেয়া। কারণ হিসেবে জানালেন, খুব গুরুত্বপূর্ণ আর অত্যন্ত গোপনীয় কিছু পরামর্শ আছে ফানুচির সাথে তার, সে সময় কোন রকম বাধা পড়লে চলবে না। স্ত্রীর চেহারায় ভয় ফুটে উঠতে দেখে বিরক্তির সাথে কিন্তু নিচু গলায় বললেন, আমাকে মি বোকা মনে করো?
তাঁর স্ত্রী কোন উত্তর দেয়নি, উত্তর দেননি ভয়ে। ভয় তার ফানুচিকে নয়, ভয় নিজের স্বামীকে। একসাথে ঘর-সংসার করছেন, স্বামীর পরিবর্তন ঠিকই দেখতে পাচ্ছেন তিনি। প্রতি ঘন্টায় বদলে যাচ্ছেন তিনি। কোথা থেকে যেন অতি ভয়ঙ্কর একটা শক্তি এসে ভর করেছে তার উপর, তাঁর গা থেকে সেই শক্তির আলো আর উত্তাপের আঁচ আসছে। স্বামী তার চিরকালই চুপচাপ স্বভাবের মানুষ, কথা বলেন কম, প্রকৃতিটা মাটির মত শান্ত, কখনও কোন অন্যায় করেন না, সব সময় যুক্তি মেনে চলেন-এমন দেবতার মত স্বামী পেয়ে নিজেকে তিনি মহাভাগ্যবতী বলে মনে করেন। কমবয়েসী সিসিলীয় তরুণরা এমন হয় না। দুনিয়ার যত খারাপ কাজ করে বেড়ানোই তো এই বয়েসী তরুণদের স্বভাব।
স্বামীকে বদলে যেতে দেখছেন বটে, কিন্তু কি থেকে কি হচ্ছেন তিনি তা বোঝার ক্ষমতা তার নেই। নিরাপত্তার খাতিরে এতদিন নিরীহ ভালমানুষের খোলস পরে ছিলেন তিনি, এখন তার আর প্রয়োজন নেই বুঝতে পারার সাথে সাথে ঝেড়ে ফেলে দিচ্ছেন। বয়েস হয়েছে পঁচিশ, শুরুটা একটু দেরিতেই হয়ে যাচ্ছে বটে, কিন্তু আড়ম্বর আর সমারোহের সাথেই শুরু করছেন।
খুব সহজেই সিদ্ধান্তটা নিতে পেরেছেন ভিটো কর্লিয়নি। ফানুচিকে তিনি খুন করবেন। তাতে সরাসরি বাড়তি সাতশো ডলার ব্যাঙ্কে জমা পড়বে তার নামে। ক্লেমেঞ্জার দুশো, টেসিওর দুশো আর নিজের তিনশো, এই মোটা সাতশো ডলার দেবার কথা ফানুচিকে। তাকে যদি বেঁচে থাকতে দেন তিনি, এই সাতশো ডলার হাতছাড়া হয়ে যাবে। ফানুচিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে এত টাকা খরচ করতে তিনি রাজি নন। কঠিন ব্যারামে পড়ে ফানুচি আজ যদি হাসপাতালে ভর্তি হয়, আর অপারেশন করার জন্যে তার যদি সাতশো ডলার দরকার হয়, তিনি কি টাকাটা নিজের পকেট থেকে তাকে দেবেন? না। কোন কারণে তিনি কি ফানুচির কাছে ঋণী? না। তার সাথে ওর কি কোন রক্তের সম্পর্ক আছে? না। তিনি কি তাকে ভালবাসেন? না। তাহলে কেন তাকে দিতে যাবেন সাতশো ডলার? দেবার কোন কারণই তো দেখতে পাচ্ছেন না। সুতরাং দেবেন না।
কিন্তু দেবেন না বললেই তো আর হলো না, ফানুচি জোর করে টাকাটা আদায় করার চেষ্টা করবে। তাহলে, ভাবলেন ভিটো কর্লিয়নি, তাকে আরেকটা সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে হয়। যে-লোক তাঁর কাছ থেকে সাতশো ডলার কেড়ে নিতে চায় তাকে কেন তিনি মেরে ফেলবেন না?
সেই সাথে একথাও ভাবলেন, ফানুচিকে খুন করার বিরুদ্ধে কিছু যুক্তিও অবশ্য রয়েছে। সন্দেহ নেই, তার মত লোক না থাকলেও দুনিয়ার কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু বলা তো যায় না, ফানুচির হয়তো কিছু শক্তিশালী বন্ধু আছে। তারা প্রতিশোধ নিতে চেষ্টা করবে। তাছাড়া, ফানুচি নিজেও সাংঘাতিক সতর্ক আর শক্তিশালী লাক, ওকে খতম করা খুব সহজ কাজ হবে না। পুলিশের কথা মনে রাখতে হবে, মনে রাখতে হবে ইলেকট্রিক চেয়ারের কথা।
তারপর আবার ফানুচিকে খুন করার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে শুরু করলেন ভিটো কর্লিয়নি। নিজেকে প্রশ্ন করলেন, বিপদের কথা ভাবছেন কেন তিনি? বারো বছর বয়েস থেকেই কি তিনি বিপদের মধ্যে বাস করছেন না? বাবার সাথে কি তাকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়নি? বাবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরী করা হয়ে গেছে, তারটা এখনও হয়নি, পার্থক্য তো এইটুকুই। ব্যাপারটা তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে? বিপদের মধ্যেই বাস করছেন তিনি, সুতরাং এই প্রথম বিপদের ঝুঁকি নিতে যাচ্ছেন মনে করার কোন কারণ নেই। সমুদ্রেই যার শয়ন, শিশিরে তার কিসের ভয়? বারো বছর বয়েস থেকে আততায়ীরা যাতে নাগাল না পায় সেজন্যে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি, মহাসাগর পাড়ি দিয়ে অচেনা বিদেশ বিভূঁইয়ে চলে এসে ছদ্মনাম নিয়ে আত্মগোপন করে আছেন। একটানা অনেক বছর নিঃশব্দে দুনিয়াদারির হালচাল পর্যবেক্ষণ করে তার মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে তার বুদ্ধি আর সাহস আর সব লোকের তুলনায় অনেক বেশি, আজ পর্যন্ত সেই গুণগুলো কাজে লাগাবার সুযোগ পাননি তিনি এই যা।
