দুই বন্ধুর সাথে মদ খাচ্ছেন ভিটো কর্লিয়নি। এই মুহূর্তে যেভাবে বুদ্ধির চর্চা করছেন তিনি, এর আগে আর কখনও সেভাবে চিন্তা করেননি। নিজের চিন্তাশক্তির স্বচ্ছতা দেখে নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছেন। প্রথমে তিনি ফানুচি সম্পর্কে যা কিছু জানেন সব স্মরণ করার চেষ্টা করলেন। সবচেয়ে আগে মনে পড়ল, তার গাল চিরে দেয়ার কথাটা! ঝরে পড়া রক্ত ধরার জন্যে চিবুকের নিচে টুপি নিয়ে ছুটছে ফানুচি, দৃশ্যটা পরিষ্কার ভেসে উঠল চোখের সামনে। এর পরের ঘটনা কি? যে-ছেলেটা তার গালে ছুরি চালিয়েছিল, তাকে গুলি করে মেরে ফেলে সে। কিন্তু বাকি দুই ছোকরা বেঁচে গেল কেন? তারা ফানুচিকে টাকা দিয়ে নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল। হঠাৎ বুঝতে পারলেন ভিটো কর্লিয়নি, জবরদস্ত কোন সমর্থক বা ওস্তাদ কখনোই ছিল না ফানুচির, নেই, থাকতে পারে না। যে নোক পুলিশকে তথ্য যোগান দেয়, টাকা খেয়ে প্রাণের শত্রুকে ক্ষমা করে, প্রতিশোধ নেয় না, তার পিছনে বড় কোন শক্তির সমর্থন থাকতে পারে না। ও যদি সত্যি মাফিয়া গুণ্ডা হত, তাহলে বাকি দুজনকেও প্রাণ হারাতে হত। মাফিয়া গুণ্ডারা এ-ধরনের সিরিয়াস ব্যাপারে কখনও আপস করে না। সুযোগ পেয়ে একজনকে খুন করল বটে ফানুচি, কিন্তু সাথে সাথে এও বুঝল যে অন্য দুজন এবার সাবধান হয়ে গেছে, তাদেরকে খুন করা এখন আর সহজ নয়, তাই প্রতিশোধের বদলে টাকা নেয়া ছাড়া উপায় দেখেনি সে। বস্তি এলাকার জুয়ার আড়ালো আর দোকানদারদের কাছ থেকে সেফ গায়ের জোর দেখিয়ে টাকা খায় ও। ভিটো কর্লিয়নির মনে পড়ল, অন্তত একটা জুয়ার আড্ডার কথা জানেন তিনি, যেখান থেকে একটা কানাকড়িও আদায় করতে পারে না ফানুচি। দুএকবার চেষ্টা করে সুবিধে করতে না পেরে আশা ছেড়ে দিয়েছে ও। কিন্তু, কই, সেই জুয়ার আড্ডা তো বন্ধ হয়নি বা আড্ডার মালিকের তো কোন ক্ষতি হয়নি।
এসবের একটাই মানে, কারও সাহায্য বা উৎসাহ পেয়ে নয়, ফানুচি একাই কাজ করে। প্রয়োজনে বড়জোর নগদ টাকা দিয়ে পিস্তলধারী ভাড়া করে ও, এবং ওই পর্যন্তই ওর দৌড়। এটুকু পরিষ্কার বোঝার পর ভিটো কর্লিয়নিকে এবার জীবনের সবচেয়ে কঠিন আর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবার জন্যে মনে মনে তৈরি হতে হলো।
আজকের এই অভিজ্ঞতার ফলেই তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল যে প্রত্যেক মানুষের জীবনে একটা মাত্র নিয়তি আছে। কথাটা তিনি তার পরবর্তী জীবনে অসংখ্যবার পুনরাবৃত্তি করেছেন। আজ রাতে ফানুচির দাবি মেনে নিয়ে আবার তিনি মুদি দোকানের একজন অতি সাধারণ কেরানী হয়ে যেতে পারেন, দূর ভবিষ্যতে একদিন হয়তো তার নিজেরও একটা দোকান হবে। কিন্তু নিয়তির অমোঘ নির্দেশে তাঁকে একজন ডন হতে হবে। সেজন্যেই তার জীবনে ফানুচির আগমন, সে এসেই তাকে তার নির্দিষ্ট পথে দাঁড় করিয়ে দিল।
নিঃশব্দে মদের গ্লাসটা খালি করলেন ভিটো কৃর্লিয়নি। তারপর অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ওদেরকে বললেন, তোমরা প্রত্যেকে দুশো ডলারের বেশি দিতে চাইছ না, আবার ভাবছ, এত কম টাকায় রাজি হবে না ফানুচি। বেশ, টাকাগুলো তোমরা বরং আমাকেই দাও, তোমরা যেভাবে চাইছ সেভাবেই সমস্যাটা মিটিয়ে দেব আমি। আমার কাছ থেকে ঠিকই ওই পরিমাণ টাকা নিতে রাজি হবে ফানুচি। অবশ্য নিক বা না নিক সেটা তোমাদের দেখার বিষয় নয়, কিভাবে ওর সাথে আপস করব সেটা আমার ব্যাপার, আমার ওপর সব দায়িত্ব ছেড়ে দেবে তোমরা।
তীব্র সন্দেহের চোখে তাকাল ক্লেমেঞ্জা। কিন্তু শান্ত কণ্ঠে ভিটো কর্লিয়নি বললেন, যাদেরকে বন্ধু বলে মেনে নিই তাদের কাছে কখনও মিথ্যে কথা বলি না আমি। তুমি কালই ফানুচির সাথে কথা বলে সত্য মিথ্যে জেনে নাও। সত্যি টাকা চেয়েছে কিনা, কত টাকা চেয়েছে, সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু নিজেদের হাতে ওকে তোমরা দিয়ো না টাকা। তাই বলে ঝগড়াঝাটি করতে যেয়ো না আবার। বলবে, টাকাটা জোগাড় করতে একটু সময় লাগবে। তারপর যা দিতে চাইছ আমাকেই দিয়ো, আমি নিজের হাতে ওকে দেব সেটা। কথা বলতে গেলে দেখবে পাঁচশো ডলারের কমে কোনমতে রাজি হচ্ছে না, তাই বলে দর কষাকষি করতে যেয়ো না ভুলেও। যাই দাবি করুক, একটু মনমরা ভাব দেখিয়ে তাতেই রাজি হয়ে যেয়ো। দর কষব আমি। ওর সম্পর্কে তোমরা যা বলছ তা যদি সত্যি হয়, তাহলে মেনে না নিয়ে উপায় নেই যে লোকটা ভয়ঙ্কর, সুতরাং কি দরকার তার সাথে গোলমাল পাকিয়ে? ওকে খেপাবার কোন মানেই হয় না। দাবি মিটিয়ে দিয়ে ঝামেলা চুকিয়ে ফেলাই সবদিক থেকে ভাল।
ভেবেচিন্তে দেখে শেষ পর্যন্ত ভিটো কর্লিয়নির প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল ওরা। পরদিনই ফানুচির সাথে কথা বলে যাচাই করে নিল ক্লেমেঞ্জা, ভিটো যে মিথ্যে বলেননি সে-ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হলো সে। খানিক পর ভিটোর বাড়িতে এসে দুশো ডলার তুলে দিল তার হাতে। টাকাটা দেবার সময় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভিটোকে লক্ষ করছে সে! জানতে চাইল, কথা বলে যা বুঝলাম, তিনশো ডলারের কমে ফানুচিকে রাজি করা অসম্ভব, তুমি কমাবে কিভাবে?
সহজ সরল ভঙ্গিতে বললেন ভিটো কর্লিয়নি, তা জেনে তোমার কি দরকার। শুধু মনে রেখো, আমি তোমার একটা উপকার করলাম।
আরও অনেক পরে এল টেসিও। ক্লেমেঞ্জার তুলনায় অনেক বেশি চালাক চতুর, ধারাল, আর চাপা স্বভাবের, কিন্তু শক্তির প্রচণ্ডতা অনেক কম। অনুভূতি দিয়ে ঠিকই আঁচ করতে পেরেছে সে, কোথায় যেন একটা গোলমাল আছে। মনটা খুঁতখুত করছে তার, একটু উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। ও শালা কালো হাত দলের লোক, যা করার সাবধানে করবে, গভীর ভাবে বুদ্ধি ধার দিচ্ছে সে ভিটো কর্লিয়নিকে। হারামীর হাড়, শিয়ালের চেয়ে ধূর্তটাকাটা দেবার সময় একজন সাক্ষী থাকলে ভাল হয়, তুমি বললে আমি তোমার সাথে যেতে পারি।
