এই প্রথম মুখ খুললেন, ভিটো কর্লিয়নি। কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক, রাগের ছিটেফোঁটাও নেই। সম্মান দেখিয়েই কথা বললেন, ফানুচির মত নাম করা একজন বয়স্ক লোকের সাথে একজন সুবোধ তরুণের যেভাবে কথা বলা শোডন দেখায়। গলার স্বর নরম করে বললেন, আমার ভাগের টাকাটা বন্ধুদের কাছে রয়ে গেছে। ওদের সাথে আগে কথা বলতে হবে আমার।
দুশ্চিন্তা মুক্ত হলো ফানুচি। বেশ তো। কিন্তু সেই সাথে জানিয়ে দিয়ে, ওদের ভাগেও আমাকে যেন ঠোঁট ডোবাতে দেয়, অভয় দানের সুরে আবার বলল সে, কথাটা বলতে ভয় পেয়ো না যেন আবার। ক্লেমেঞ্জাকে ভালভাবে চেনা আছে আমার, এসব ব্যাপার বুঝতে দেরি করে না সে। চালু ছোকরা, ওর কথামত চললে উন্নতি হবে তোমার। অনেক কিছু শিখতে পারবে।
শ্রাগ করলেন ভিটো। একটু আনাড়ী আর কুণ্ঠিত ভাব ফুটিয়ে তুললেন চেহারায়। বললেন, আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনি তো বুঝতেই পারছেন, এসব ব্যাপারে একদম কাঁচা আমি, এখনও কিছু শিখে উঠতে পারিনি। আপনি যে আমার সাথে গুরুজনের মত কথা বলছেন সেজন্যে আমি কৃতজ্ঞ।
কথাগুলো শুনে খুব খুশি হলো ফানুচি। লক্ষ্মী ছেলে তুমি, বলেই লোমশ হাত দিয়ে ভিটোর একটা হাত ধরে আন্তরিক ভাবে ঝাঁকিয়ে দিল। আমারই ভুল হয়েছে, আসলে কিভাবে শ্রদ্ধা দেখাতে হয় তা তুমি অনেকের চেয়ে ভাল জানো। এত কম বয়েসে এই গুণ সবার মধ্যে দেখা যায় না। এর পরের বার কিন্তু তুমিই আমার কাছে গিয়ে প্রথম কথা বলবে, কেমন? আর একটা কথা বলে রাখি, বড়সড় ধরনের কোন দাও-এর খোঁজখবর পেলে আমার সাথে পরামর্শ করে নিয়ে, আমি হয়তো তোমাকে সাহায্য করতে পারব।
আজ যে ফানুচির সাথে এমন নরম আর নিখুঁত কৌশলে কথা বললেন ভিটো কর্লিয়নি তার কারণ অনেক বছর পর তিনি আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। আসলে সিসিলিতে মাফিয়াদের হাতে তার বদমেজাজী বাবার মৃত্যুর স্মৃতি ভোলেননি তিনি। ফানুচির সাথে কথা বলার সময় শুধুমাত্র একটা অনুভূতি কাজ করেছে তার মধ্যে, ঠাণ্ডা হিম একটা রাগ।
টাকাটা রোজগার করার জন্যে নিজের প্রাণ, নিজের স্বাধীনতা পর্যন্ত বাজি রাখতে হয়েছে তাকে, অথচ স্পর্ধা দেখিয়ে আরেকজন লোক এত কষ্টের টাকাটা তার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাইছে। কথা বলার সময় ফানুচিকে স্রেফ একটা বদ্ধ পাগল বলে মনে হচ্ছে তার। লোকটা এতবড় আহাম্মক ভেবে অবাক হচ্ছেন তিনি। এর মধ্যে ক্লেমেঞ্জাকে যতটুকু চিনেছেন তিনি, প্রকাণ্ডদেহী ওই সিসিলীয় প্রাণ দিয়ে লড়বে তবু নিজের ভাগ থেকে একটা কণা পর্যন্ত দিতে রাজি হবে না। এই তো সেদিনের কথা, ভোলেননি তিনি, সামান্য একটা গালিচা চুরি করার জন্যে একজন পুলিশের লোককেও খুন করতে তৈরি হয়ে গিয়েছিল সে। আর একহারা তীক্ষ্ণ চেহারার টেসিওর মধ্যে একরোখা একটা ভাব আছে, বিষধর সাপের মত ভয়ঙ্কর। কারও ভয়ে নতি স্বীকার করার পাত্র সে-ও নয়।
কিন্তু সেদিনই রাত আর একটু গম্ভীর হতে, ক্লেমেঞ্জার বাড়িতে বসে সদ্য শুরু নতুন শিক্ষা জীবনের আরেক পাঠ নিলেন ভিটো কর্লিয়নি। অশ্রাব্য খিস্তি আর অভিশাপ দিতে শুরু করল ক্লেমেঞ্জা, ভুরু কুঁচকে প্রচণ্ড রাগে মুখ বিকৃত হয়ে উঠল টেসিওর, কিন্তু দুজনেই নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করে দিল দুশো ডলার করে দিলে সন্তুষ্ট করা যাবে কিনা ফানুচিকে।.টেসিওর ধারণা, হয়তো যাবে।
কিন্তু ক্লেমেঞ্জার দৃঢ় বিশ্বাস ফানুচিকে এত কমে রাজি করানো অসম্ভব। উঁহু, বেজন্মা কুত্তাটা নিশ্চয়ই পাইকারদের কাছ থেকে শুনেছে কত টাকার মাল লুট করেছি আমরা, শালাকে তিনশো ডলারেই রাজি করা কঠিন হবে। মান হয়ে গেল তার চেহারা। ওকে টাকা না দিয়ে উপায় নেই আমাদের।
আশ্চর্য হয়ে গেলেন ভিটো কর্লিয়নি, কিন্তু সযত্ন চেষ্টায় মুখের চেহারায় তা প্রকাশ পেতে দিলেন না। মৃদু কণ্ঠে তিনি বললেন, টাকা দিতেই হবে তার কি মানে? আমরা তিনজন, ও একা। ওর চেয়ে আমাদের জোর বেশি। আমাদের পিস্তল আছে। কি করতে পারে আমাদের ও? টাকাটা আমাদের, আমরা খেটে রোজগার করেছি-ওকে কেন দেব?
ভিটো কর্লিয়নি এ-লাইনে নতুন, তাই তার উপর বিরক্ত না হয়ে ধৈর্য ধরে তাকে বোঝাতে শুরু করল ক্লেমেঞ্জা। অনেক বন্ধু আছে ফানুচির, হিংস্র পশু এক একটা। পুলিশও রয়েছে ওর হাতে। আমরা কিভাবে টাকা কামাই সেটা জানাই ওর। আসল উদ্দেশ্য, পুলিশকে কথাটা ফাস করে দিয়ে তাদের মন রাখতে চায়। তাহলে পুলিশও ওর সুবিধে করে দেবে। ওর কাজের ধারাই তো এই রকম। এদিকে কাজ করার জন্যে খোদ মারান জালার কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে এসেছে ও।খুব বড় একজন গুণ্ডা মারান জালা, খবরের কাগজে প্রায়ই তার নামে নানান ধরনের অভিযোগ তোলা হয়। শোনা যায়, সে নাকি সুসংগঠিত একটা দুষ্কৃতকারী দলের নেতা। প্রাণের ভয় দেখিয়ে টাকা খসানো, জুয়ার আড্ডা কসানো আর ডাকাতি করা ওদের পেশা।
নিজের তৈরি মদ খাওয়াল ওদেরকে ক্লেমেঞ্জা। ওর বউ টেবিলের উপর সাজিয়ে রেখে গেল এক প্লেট সালামি, জলপাই আর ইতালীয় রুটি। কামরা থেকে বেরিয়ে যাবার সময় একটা চেয়ার তুলে নিয়ে গেল সে, বাড়ির সামনে বসে বান্ধবীদের সাথে গল্প জুড়ে দিল। বয়স কম মেয়েটার, এই তো কবছর হলো আমেরিকায় এসেছে, ইংরেজি ভাষাটা এখনও বুঝতে শেখেনি।
