১৯২৮ সাল নাগাদ তার সাহায্যে কৃষক নেতা চু তে বিরাট বাহিনী নিয়ে এগিয়ে এলেন। চু মাও-এর নীতিতে বিশ্বাস করতেন।
এই সময় কমিউনিস্ট পার্টির অধিকাংশ সদস্যই আত্মগোপন করেছিল। প্রকৃতপক্ষে তাদের কার্যদারা এতখানি সীমিত হয়ে পড়েছিল, মাও হয়ে উঠলেন কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম পুরোধা।
মস্কোতে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির আন্তজার্তিক সম্মেলনে স্টালিন মাও-এর বিপ্লবী প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানালেন। তাকে আবার দলের কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরোর সদস্য হিসাবে নির্বাচিত করা হল।
চিয়াং কাইশেক তার বাহিনীকে আদেশ দিলেন কমিউনিস্টদের সমূলে বিনাশ করতে। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে চারবার বিশাল বাহিনী পাঠনো হল বিদ্রোহীদের দমন করবার জন্য। এই বাহিনী ছিল সম্পূর্ণ আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত তবুও তারা জয়লাভ করতে পারেনি। এ পাহাড় অরণ্য অধ্যুষিত অঞ্চল ছিল সৈন্যদের অগম্য কিন্তু তার চেয়েও বড় কারণ মাও-এর লাল ফৌজের অদম্য মনোবল এবং শৃঙ্খলাবোধ। লাল ফৌজের সাফল্যের পেছনে আরো একটি বড় কারণ ছিল স্থানীয় মানুষের সহায়তা।
চিয়াং অনুভব করতে পারছিলেন এর সুদূর প্রসারিত প্রতিক্রিয়া। তাই জার্মান সামরিক উপদেষ্টাদের পরামর্শ মত পঞ্চমবার প্রায় এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল অভিযানের প্রস্তুতি নিলেন।
সামরিক বাহিনী বীরদর্পে এগিয়ে চলল। এই সুসজ্জিত বাহিনীর প্রতিরোধ করা সম্ভবপর ছিল না মাও-এর লাল ফৌজের। তারা ক্রমশই পিছু হটতে আরম্ভ করল। একের পর এক মুক্ত অঞ্চল অধিকৃত হতে থাকে চিয়াং কাইশেকের বাহিনীর।
লাল ফৌজ পিছু হটতে হটতে এসে কিয়াংসাই পার্বত্য প্রদেশে। এই স্থান প্রশিক্ষণের উপযুক্ত বিবেচনা করে মাও উত্তর-পশ্চিমে বিখ্যাত চীনের প্রাচীরের কাছে এসে আশ্রয় নিলেন।
১৯৩৪ সালের অক্টোবরে লাল ফৌজের শুরু হল ঐতিহাসিক অভিযান। এই অভিযান সহজসাধ্য ছিল না। পথের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টেও লাল ফৌজের মনোবল এতটুকু ভেঙে পড়েনি। প্রত্যেকেই ছিল মা-এর বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ। অবশেষে অক্টোবর ১৯৩৫ সালে তারা এসে পৌঁছল উত্তরের সেনসি প্রদেশে। এখানেই শিবির স্থাপন করলেন মাও। ইতিমধ্যে আরো বহু তরুণ কৃষক শ্রমিক এসে যোগ দিয়েছে লাল ফৌজে। সেখানে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হল। বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে আবার গড়ে উঠল মুক্ত স্বাধীন শাসনব্যবস্থা।
এই সময় একজন আমেরিকান সাংবাদিক এডগার স্নো বহু কষ্টে চীনা কমিউনিস্ট ঘটিতে গিয়ে পৌঁছান। তার এই অভিজ্ঞতার কথা পরবর্তীকালে বিবরণ দিয়েছেন তার বিখ্যাত “চীনের আকাশে লাল তারা” (Red star over China) বইতে। মাও সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন “যেমন মজার তেমনি গম্ভীর দর্বোদ্য প্রকতির মানুষ। তার মধ্যে জ্ঞান আর কৌতুকের এক আশ্চর্য সমন্বয় ঘটেছে। নিজের অভ্যেস পোশাক-পরিচ্ছদ সম্বন্ধে যতখানি উদাসীন, নিজের দায়িত্ব কর্তব্য সম্বন্ধে ততখানিই সজাগ। কি অফুরন্ত প্রাণশক্তি, রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রতিভাধর।
মাও একদিকে যখন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে জনজাগরণ গড়ে তুলছিলেন, অন্যদিকে তখন চিয়াং কাইশেকের বাহিনী দেশের শত শত কমিউনিস্ট ও তরুণ ছাত্রকে হত্যা করতে আরম্ভ করল। লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ও কৃষকের উপর চলতে থাকে নির্যাতন।
এই সময় উত্তরাঞ্চলে শুরু হল জাপানী আক্রমণ। জাপান সরকার বুঝতে পেরেছিল চীনের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তার সমস্ত শক্তি নিয়োগ করেছে কমিউনিস্ট বিরোধী অভিযানে।
মাও অনুভব করতে পেরেছিলেন জাপানী আক্রমণের বিপদ। তাই কুয়োমিংতাং এর সাথে ইতিপূর্বে তিনি ঐক্যবদ্ধভাবে জাপানীদের প্রতিরোধ করতে চেয়েছিলেন।
এই সময় সেনসি প্রদেশের কাছে আকস্মিকভাবে বন্দী হলেন চিয়াং কাইশেক ও তার সেনাদল। লাল ফৌজের তরফে জোরালো দাবি উঠল চিয়াং কাইশেককে হত্যা করা হোক। মাও তার গভীর দূরদৃষ্টি দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন চিয়াং কাইশেককে হত্যা করে জাপানী আগ্রাসন রোধ করা সম্ভব নয়। তিনি তাকে মুক্তি দিলেন যাতে সম্মিলিতভাবে জাপানীদের আক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।
ইতিমধ্যে পৃথিবী জুড়ে শুরু হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা। পরাজিত হল জাপানের সৈন্যবাহিনী। কিন্তু বিপ্লবের আগুন নিভল না। লাল ফৌজ তখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রান্তে প্রান্তে। চিয়াং কাইশেক উপলব্ধি করতে পারছিলেন মাও-এর নেতৃত্বে যে বিপ্লব শুরু হয়েছে তাকে ধ্বংস করবার মত তার ক্ষমতা নেই। তাই আমেরিকার সাহায্য প্রার্থী হলেন। কিন্তু আমেরিকান মদতপুষ্ট হয়েও নিজেকে রক্ষা করতে পারলেন না চিয়াং কাইশেক। লাল ফৌজের সৈন্যবাহিনী চারদিক থেকে পিকিং শহর ঘিরে ফেলল। আমেরিকান সেনাবাহিনীর সাহায্যে চিয়াং পালিয়ে গেলেন ফরমোসা দ্বীপে। ১লা অক্টোম্বর ১৯৪৯ সালে লাল ফৌজ পিকিং দখল করে নিল। নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হল। তার চেয়ারম্যান হিসাবে নির্বাচিত হলেন পঞ্চান্ন বছরের মাও সে তুং। সমাপ্ত হল তার দীর্ঘ সংগ্রাম।
কয়েক বছরের মধ্যেই দেখা গেল মানুষের মন থেকে বিপ্লবের উন্মাদনা ক্রমশই ফিকে হয়ে আসছে হ্রাস পাচ্ছে মাও-এর জনপ্রিয়তা।
দেশে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হল। নেতৃত্বের এক অংশ তার সাথে একমত না হলেও সরাসরি বিরুদ্ধাচারণ করতে সাহস পেল না। ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের স্বেচ্ছাকৃত উদ্যমের উপর। মাও বিশ্বাস করতেন আর্থিক কারণে নয়, আদর্শগত উৎসাহেই মানুষ কাজ করবে। কিন্তু অচিরেই প্রমাণিত হল তার বাস্তবতাশূন্য তাত্ত্বিক মতাদর্শের ব্যর্থতা।
