পরে তার দুই ভাই কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগ দিয়ে নিহত হয়। গ্রামের স্কুলের পাঠ শেষ করে কিছুদিন গ্রামেই পড়াশুনা করলেন। প্রায় জোর করেই বাবার ইচ্ছের বিরুদ্ধে হুনানের প্রাদেশিক শহরে এলেন। ভর্তি হলেন এখানকার হাই স্কুলে। এই সময় নিয়মিত স্থানীয় লাইব্রেরীতে গিয়ে পড়াশুনা করতেন। কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি লাইব্রেরীর অর্ধেকের বেশি বই পড়ে শেষ করে ফেলেছিলেন।
১৯১৮ সালে ২৫ বছর বয়সে তিনি এলেন পিকিং শহরে। এই প্রথম তিনি প্রদেশ ছেড়ে বার হলেন। জীবনের এই পর্যায়ে দুবেলা দুমুঠো খাবার সংগ্রহের জন্য তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হত।
এক বছর পর মাও ফিরে এলেন তার গ্রামে। স্থানীয় একটা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতার কাজ পেলেন। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি সমতাদর্শী কয়েকজন তরুণকে সাথে নিয়ে একটি পত্রিকা প্রকাশ করলেন।
১৯২১ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠল। এর ৫০ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের মধ্যে মাও-ও ছিলেন।
ইতিপূর্বে মাও বেশ কিছু রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। সেই সময় চীনে সান ইয়াৎ সেনের নেতৃত্বের কুয়োমিংতাং দল অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। চীনা কমিউনিস্ট দল (CCP) এবং কুয়োমিংতাং (K.M.T) এর মধ্যে সংযুক্ত ঐক্য গড়ে উঠল।
রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির তরফে এই ঐক্যকে সমর্থন জানানো হল। চিয়াং কাইশেক গেলেন মস্কোতে। সেখানে তাকে সান ইয়াৎ সেনের উত্তরাধিকারী হিসাবে মনোনীত করা হল।
ইতিমধ্যে মাও বিবাহ করেছেন তার এক শিক্ষকের কন্যাকে-ইয়াং কাই হুই। হুই পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী অবস্থাতেই কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। সেই সূত্রেই দুজনে নিকট সান্নিধ্যে আসেন। ১৯৩০ সালে আন্দোলনের কাজে জড়িত থাকার সময়েই নিহত হন হুই।
CCP এবং KMT দুই রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হলেও অল্পদিনের মধ্যেই তাদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত প্রভেদ প্রকট হয়ে উঠল। মাও-এর উপর ভার ছিল এই দুটি দলের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা।
চীন ছিল মূলত কৃষিভিত্তিক দেশ। দেশের শতকরা আশি জন মানুষই ছিল কৃষিনির্ভর। তৈরি হল জাতীয় কৃষক আন্দোলন সংগঠন। এই সংগঠনের পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হল মাও-এর উপর।
অল্পদিনের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি এবং মাও-এর সামনে এক সংকট দেখা দিল।
মাও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছিলেন গতানুগতিক পথে নয়, কৃষকদের মধ্যে থেকেই বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। ১৯২৭ সালে তিনি হুনানের কৃষক আন্দোলনের উপর এক বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করে পার্টি নেতৃত্বের কাছে আবেদন জানালেন, অবিলম্বে দেশ জুড়ে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলা হোক। দলের অধিকাংশেরই এ ব্যাপারে সম্মতি ছিল না। তারা কৌতুক করে বলত ‘গেঁয়োদের আন্দোলন। মাওয়ের প্রস্তাব সমর্থিত হল না। তা সত্ত্বেও দলের মধ্যে বেশ কিছু সদস্য এর সমর্থনে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে এল।
কৃষক আন্দোলনের প্রতি এই প্রকাশ্য সমর্থনে কুয়োমিংতাং এর সাথে বিরোধ প্রকট হয়ে উঠল। সাথে সাথে কুয়োমিংতাং এর সভাপতি চিয়াং কাইশেক-এর কমিউনিস্ট বিরোধী মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল। দেশ জুড়ে শুরু হল কমিউনিস্টদের প্রতি সক্রিয় বিরোধিতা। নিষিদ্ধ করা হল কৃষক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে। দলের অধিকাংশ নেতাকে বন্দী করা হল। সাধারণ কর্মচারীদের উপর শুরু হল অত্যাচার।
মাও সে তুং আত্মগোপন করে পালিয়ে এলেন হুনানে। নতুন করে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে হাত দিলেন। সেই সময় ফসল কাটার কাট শুরু হয়েছে। মাও ক্ষেতমজুরদের নিয়ে শুরু করলেন ‘শরঙ্কালীন শস্য আন্দোলন’। কিন্তু আন্দোলনের বিস্তার ঘটার আগেই চিয়াং কাইশেকের অনুগামীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল আন্দোলনকারীর উপর। নির্মম হাতে ভেঙে দেওয়া হল আন্দোলন। ধরা পড়লেন মাও। তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হল। কয়েকজন বন্ধুর সহায়তায় বন্দীদশা থেকে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচালেন মাও।
কিন্তু তার এই আন্দোলনকে সমর্থন জানাল না কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি। মাওকে দলের পলিটব্যুরো এবং দলের সাধারণ সমিতি থেকে পদচ্যুত করা হল।
মাও দলের মধ্যে এতখানি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সিদান্তে সামান্যতম বিচলিত হলেন না। তিনি তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া প্রতিবিপ্লবী শক্তিকে উৎখাত করা সম্ভব হবে না। উত্তর ও মধ্য চীনে গড়ে তোলা হল ছোট ছোট বিপ্লবী সংগঠন। হুনানের সীমান্ত প্রদেশে মাও সংগঠিত করলেন প্রায় এক হাজার কৃষককে। রাত কাটাতে হয় পাহাড়ে-জঙ্গলে। সেখানেই চলে মহড়া।
বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এক দল সৈন্য পাঠানো হল। মাও জানতেন মুখোমুখি যুদ্ধে জয়লাভ অসম্ভব। শুরু হল পাহাড়-জঙ্গল থেকে অতর্কিতে আক্রমণ। কয়েকদিনের মধ্যেই পরাজিত হল সমস্ত সেনাবাহিনী। তাদের অস্ত্র কেড়ে নেওয়া হল।
প্রবল শীত আর অনাহারে কৃষক বাহিনীর অনেকেই মারা পড়েছে কিন্তু অদম্যমনোবল, সাহস আর উদ্যমে অবশিষ্টদের নিয়ে গড়ে তুললেন তার লাল ফৌজ। এই লাল ফৌজের সহায়তায় ছোট ছোট অঞ্চল দখল করে সেখানে স্বাধীন সরকার গড়ে তুললেন।
