কামাল তার গভীর দূরদৃষ্টি দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন এই সংস্কারের অঙ্গীকার সুলতানের সিংহাসন রক্ষার একটা কৌশল মাত্র।
কামাল পাশার অনুমান অভ্রান্ত হল। ১৯০৯ সালে সুলতানের কিছু অনুগামী ইসলাম ধর্ম বিপন্ন বলে দেশময় আন্দোলন শুরু করল। দেশে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করা হল। সব কিছুর জন্য দায়ী করা হল সংস্কারবাদীদের। একদিন যারা হয়ে উঠেছিল সমাজের সবচেয়ে শ্রদ্ধার–তারাই হয়ে উঠল সবচেয়ে ঘৃণায়। জেনারেল নিয়ামি পথের মাঝে খুন হলেন, এনভার বেকে একটি সামরিক দলের সঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়া হল জার্মানিতে। কামালকে পাঠানো হল ত্রিপলিতে।
দেশের এই বিবাদ-বিসংবাদের সুযোগ নিয়ে ইউরোপের অন্য দেশগুলো তুরস্কের অধিকৃত বিভিন্ন অঞ্চল অস্ট্রিয়া, বসনিয়া অধিকার করল। গ্রীস ক্রীট দ্বীপ দখল করে নিল। বুলগেরিয়া তাদের স্বাধীনতা ঘোষণা করল।
গুপ্তচরদের ক্রমাগত প্ররোচনায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল সাধারণ সৈন্যরা। সেখানকার সংস্কারবাদী সমস্ত নেতাকে হত্যা করে সুলতানের আনুগত্য স্বীকার করে নিল।
এই সংবাদ পাওয়া মাত্রই এনভার বে ও কামাল পাশা তাদের অনুগত সৈন্যদের নিয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সুলতানের অনুগত বাহিনীর উপর। মাত্র একদিনের যুদ্ধেই সুলতানের বাহিনী পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করল। সুলতানের ভাইপোকে নামমাত্র সিংহাসনে বসানো হল।
এই সময় কামাল উন্নত সামরিক জ্ঞান লাভ করবার জন্য ফ্রান্সে গেলেন। এই প্রথম তুরস্কের বাইরে নতুন কোন দেশ প্রত্যক্ষ করলেন তিনি। ফ্রান্সের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিমণ্ডল দেখে মুগ্ধ হলেন।
ফ্রান্সে সামরিক শিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরে এলেন। কিছুদিনের মধ্যেই এই শিক্ষার সুফল পেলেন। ১৯১১ সালে ইতালির সৈন্যবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল তুরস্কের উপর। তুরস্কের উপর এনভারের অধীনে কামাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে রওনা হল। একদিকে যখন এনভার বিলাসবহুল তাবুতে নিজের বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছে, অন্যদিকে সাধারণ তাবুতে বসে কামাল যুদ্ধের পরিকল্পনায় সমস্ত রাত্রি বিনিদ্র। কাটিয়ে দিচ্ছেন। পরদিন যুদ্ধ শুরু হতেই অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করলেন কামাল।
এই যুদ্ধে তুরস্ক পরাজিত হল। দেশের বিরাট অংশ দিতে হল মিত্রপক্ষের হাতে। এনভার বে দেশের মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে নিজেই সব ক্ষমতা দখল করলেন। সাময়িক যুদ্ধ বিরতি হল। কিন্তু কয়েক মাস পরেই মিত্রপক্ষের নিজেদের মধ্যেই বিবাদ দেখা দিল। এই সুযোগে বেশ কিছু অঞ্চল পুনরুদ্ধার করলেন এনভার বে। তার জয়গানে সমস্ত দেশের মানুষ মুখরিত হয়ে উঠল। অন্যদিকে যার শৌর্যে বীরত্বে এই জয় সম্ভব। হল সেই কামাল রয়ে গেলেন সকলের অজ্ঞাতে।
এই যুদ্ধে জয়লাভ করে এনভার নতুন তুর্কী সাম্রাজ্য গড়ে তোলবার স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করলেন।
শুরু হল সৈন্যসংগ্রহের কাজ। একজন জার্মান জেনারেলকে এই সৈন্যদের গড়ে তোলবার ভার দেওয়া হল। এই কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠলেন কামাল।
এনভারের কিরুদ্ধে এ সমালোচনা করবার জন্য তাকে সোফিয়ার দূতাবাসে সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হল।
ইউরোপের বুকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। এনভার মাথায় এক নতুন ভাবনা জেগে উঠল। ঠিক করলেন, রাশিয়া আক্রমণ করে তাদের ককেশাসের সীমান্তের ওপারে বিতাড়ন করবেন। এনভার শুধু রুশ সৈন্যদের কথা চিন্তা করেছিলেন, সে দেশের প্রচণ্ড শীতের কথা চিন্তা করেননি। বরফাবৃত পাহাড়ি পথে যেতে যেতে প্রায় ৮০,০০০ হাজার সৈন্য পথেই মারা পড়ল।
অন্যদিকে মিত্রপক্ষের পক্ষে ইংল্যাণ্ড কনস্তান্তিনোপল অধিকার করবার জন্য সৈন্যবাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসে। কামাল অতুলনীয় সাহস আর বীরত্বের সাথে ইংরেজ বাহিনীর গতিরোধ করে তাদের বিতাড়ন করলেন। তার এই অভাবনীয় সাফল্যের জন্য এনভার তাকে পাঠালেন ককেশাস অঞ্চলে। সেখানে রুশ বাহিনীর কাছে তুর্কীর সেনাদল পরাজয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছিল। সৈন্যদল নিয়ে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চললেন। কামাল। এইবার ভাগ্য তাকে সাহায্য করল। রাশিয়ায় লেনিনের নেতৃত্বে জারের উৎখাত হল। তার সেনাপতিরা রণে ভঙ্গ দিল।
এদিকে মিত্রপক্ষের ক্রমাগত চাপের মুখে বিপর্যস্ত তুরস্ক। বিপদ আসন্ন অনুভব করে। এনভার দেশ ত্যাগ করে পালিয়ে গেলেন।
দেশের এই বিপদের মুহূর্তে কামাল এগিয়ে এলেন। তিনি এ্যাঙ্গোরাতে একটি জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত করলেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই গ্রীস তুরস্ক আক্রমণ করল। দেশের অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চল জয় করে নিল।
এই সময় কামাল ছিলেন এ্যাঙ্গোলার কাছেই এক গ্রামে। জীবনের এক চরমতম সঙ্কটে পড়লেন কামাল। তার হাতে নিয়মিত সৈন্যের সংখ্যা ছিল নগণ্য। বেশির ভাগই ছিল উপজাতিদের থেকে সংগ্রহ করা লোকজন। সৈন্যদের দেবার মত প্রয়োজনীয় অস্ত্র নেই, পরিবহন ব্যবস্থা অপ্রতুল। খাবারের অভাব।
কামাল বুঝতে পারলেন এই সীমিত শক্তি নিয়ে শক্তিশালীকে এক বিরাট প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব নয়। তাই তিনি কৌশল অবলম্বন করলেন। গ্রীক সৈন্যদের অগ্রসর হবার সুযোগ দিলেন না। নিজে সাখারিয়া নদীর তীরে সুবিধাজনক জায়গায় সৈন্য সাজালেন। ১৯২১ সালের ২৪শে আগস্ট দুই পক্ষে শুরু হল তুমুল যুদ্ধ। কামাল পাশার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ যুদ্ধ। চৌদ্দ দিন লড়াইয়ের পর গ্রীক বাহিনী পিছু হটতে আরম্ভ করল।
