যখন তার সাত বছর বয়স তখন বাবা মারা গেলেন। চাচা এসে তাকে নিজের কাছে নিয়ে গেলেন। চাচার ভেড়ার পাল চরাতে হত। জুবেইদা চাচাকে বলে তাকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন।
সহপাঠীদের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে ঝগড়া-ঝাটি মারামারি লেগেই থাকত। কোন বিষয়ে অন্যায় দেখলে মেনে নিতে পারতেন না। জন্ম থেকে তার মধ্যে ছিল বিদ্রোহী সত্তা। একদিন কোন এক শিক্ষকের অন্যায় দেখে স্থির থাকতে পারলেন না। তার সাথে মারামারি করে স্কুল ছাড়লেন।
বাড়ি ফিরে এসে স্থির করলেন, স্কুলে আর ফিরে যাবেন না। তিনি সৈনিক হবেন। বাড়ির লোকের অজান্তে সৈনিক স্কুলে ভর্তির জন্য দরখাস্ত করলেন। তারপর ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে স্যালেনিকার সৈনিক স্কুলে ভর্তি হলেন।
এখানেই তার সুপ্ত প্রতিভার প্রথম স্ফুরণ ঘটল। কুচকাওয়াজ ড্রিল যুদ্ধবিদ্যায় তিনি ছিলেন সকলের সেরা। অন্য সব বিষয়ের মধ্যে অঙ্ক ছিল তার সবচেয়ে প্রিয়। অঙ্কে তার অসাধারণ জ্ঞান লক্ষ্য করে তার এক অধ্যাপক তাকে কামাল অর্থাৎ সম্পূর্ণ ত্রুটিহীন উপাধি দিয়েছিলেন। সেই থেকে সকলে তাকে কামাল বলেই ডাকত।
তিনি কৃতিত্বের সাথে সতেরো বছর বয়সে সৈনিক স্কুল থেকে পাশ করলেন।
এরপর ভর্তি হলেন মনাস্টির সামরিক উচ্চ বিদ্যালয়ে। এখানে এসে এক নতুন একদিন যে অটোমান সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীর এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য, আজ তার কি করুণ পরিণতি। দেশের সুলতান অন্য দেশের কাছে অবজ্ঞার পাত্র। কামাল অন্তরে অনুভব করেন এই অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।
একদিকে মনের মধ্যে জেগে উঠছিল নতুন স্বপ্ন অন্যদিকে চলছিল সামরিক শিক্ষা। কুড়ি বছর বয়েসে কনস্তান্তিনোপল সৈনিক কলেজে ভর্তি হলেন। এখানে থাকবার সময়েই তিনি বতন অর্থাৎ পিতৃভূমি (Vatan=Fatherland) নামে গোপন সমিতি গড়ে তুললেন। সেই সমিতির সকলেই ছিল সৈনিক কলেজের ছাত্র।
চার বছর পর কলেজ থেকে পাশ করে অশ্বারোহী বাহিনীর ক্যাপ্টেন হিসাবে নিযুক্ত হলেন। তখন বতনের সভ্যরা মাঝে মাঝেই মিলিত হয়ে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা স্থির করত। এই দলের মধ্যে একজন সুলতানের পুলিশের তরফে ঘুষ নিয়ে গুপ্তচরের কাজ করতে আরম্ভ করল। একদিন যখন সব সদস্যরা গোপন আলোচনায় যোগ দিয়েছে, সে সকলের অগোচরে পুলিশের কাছে সংবাদ পৌঁছে দিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সকলকে বন্দী করে পাঠিয়ে দেওয়া হল কারাগারে। বিচারে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল। কিন্তু সুলতানের মনে হল এই তরুণ অফিসারদের মৃত্যুদণ্ড দিলে সামরিক বাহিনীর উপর তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। নিজেদের সহকর্মীর মৃত্যুতে হয়ত তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করতে পারে। তাই শেষ মুহূর্তে তার মার্জনা ঘোষণা করলেন।
সকলকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হল। কামালকে পাঠিয়ে দেওয়া হল সুদূর দামাস্কাসে অশ্বরোহী বাহিনীর সেনানী করে। পার্বত্য বন্ধুর অঞ্চল।
স্যালেনিকাতে গড়ে উঠেছিল বতনের একটি শাখা। কামাল পাশার কাছে সংবাদ এল স্যালেনিকায় বতনের সভ্যরা বৃহত্তর আনোদালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি স্থির করলেন সেখানে গিয়ে সকলের সাথে মিলিত হবেন। ছদ্মবেশে বেরিয়ে পড়লেন। মিশর এবং গ্রীসের পথ ধরে সবেমাত্র এসে পৌঁছেছেন, এমন সময় এক গুপ্তচরের নজর পড়ল তার উপর।
কর্তৃপক্ষের কাছে সংবাদ যেতেই নির্দেশ এল কামাল পাশাকে বন্দী কর। এক বিশ্বস্ত বন্ধুর মারফৎ এই গোপন সংবাদ পেতেই এক ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে আবার পালিয়ে গেলেন গ্রীসে, সেখান থেকে এলেন জাফায়। কামাল পৌঁছবার আগেই তাকে বন্দী করবার নির্দেশ সেখানে এসে পৌঁছেছিল।
জাফায় সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন আহমেদ বেগ। বতনের প্রতি বের ছিল গভীর সমর্থন। তিনি তৎক্ষণাৎ কামালকে নিজের কাছে নিয়ে এসে সৈনিকের পোশাক পরিয়ে জাহাজে করে গোপনে পাঠিয়ে দিলেন গাঁজায়। সেখানে তুর্কী সেনাদলের সাথে স্থানীয় বিদ্রোহী আদিবাসীদের লড়াই চলছিল। কামালও সেই লড়াইয়ে যোগ দিলেন। আহমেদ বে সুলতানের কাছে সংবাদ পাঠালেন কামাল পাশা সিরিয়া ত্যাগ করে কোথাও যায়নি। সে গাঁজায় যুদ্ধ করছে।
বিপদ থেকে রক্ষা পেলেন কামাল পাশা। কিন্তু বুঝতে পারলেন স্যালেনিয়া ছাড়া অন্য কোথাও বিপ্লবকে সংগঠিত করা সম্ভব হবে নাই। তিনি সুলতানের কাছে আবেদন জানালেন, যেন তাকে তার জন্মভূমি স্যালনিকাতে বদলি করা হয়। শেষ পর্যন্ত তার অনুরোধে সাড়া দিয়ে তাকে স্যালনিকয় বদলি করা হল।
এখানে ইতিপূর্বেই একটি রাজনৈতিক সমিতি গড়ে উঠেছিল। অটোমান ফ্রিডম সোসাইটি (Ottoman Freedom Society)। কামাল এই দলের একজন সক্রিয় সদস্য হলেন। কিন্তু এই দলের অন্যদের সাথে দলের লক্ষ্য কর্মপন্থা নিয়ে মতভেদ দেখা দিল। কামাল চাইতেন স্বৈরতন্ত্র ধ্বংস হোক, কোন আপোষ মীমাংসা নয়, প্রয়োজন নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার।
দলের অন্য নেতারা ছিলেন সংস্কারবাদী। তারা চাইতেন প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যেই সংস্কার সাধন। এদের প্রধান ছিলেন এনভার বে ও মেজর নিয়ামি। তাদের রাজনৈতিক কার্যকলাপের সংবাদ সুলতান আবদুল হামিদের কাছে পৌঁছতে বিলম্ব হল না।
সুলতানের প্রধান সেনাপতি বিরাট সৈন্যদল নিয়ে স্যলনিকা অবরোধ করল। বিদ্রোহীদের সপক্ষেও এগিয়ে আসে আরো সৈন্য। সুলতান বুঝতে পারলেন গৃহযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এই যুদ্ধ এড়াবার জন্য সুলতান বিদ্রোহীদের সংস্কারের দাবি মেনে নিয়ে তাদের ক্ষমা করলেন। চারদিকে বে আর নিয়ামির জয়ধ্বনি উঠল। দুজনে হয়ে উঠলেন জনগণের নতুন নেতা।
