পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায় যে, প্রায় প্রত্যেক মনীষীই নিজ মাতৃভূমিতে মর্যাদা পাননি বরং নির্যাতিত, বিতাড়িত এবং ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। ইবনে খালদুন ও তাদের থেকে আলাদা নন। তিউনিসিয়ার ‘বগী’ রাজ্যে তিনি বেশি দিন অবস্থান করতে পারেননি। সেখানে তিনি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হন। সুলতান আবু আবদুল্লাহকে তাঁর ভাই আবুল আব্বাস হত্যা করে রাজ্য ছিনিয়ে নেন এবং ইবনে খালদুনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করেন। তিনি কোন উপায়ে বগী রাজ্য ত্যাগ করে চলে যান তেলেমচীন রাজ্যে যা মরক্কোর একটি ক্ষুদ্র রাজ্য ছিল। মরক্কোর সুলতান আবদুল আজীজ ইবনে আল হাসান এ ক্ষুদ্র রাজ্যটি দখল করে নিলে তিনি সুলতানের হাতে বন্দী হন। সুলতান ইবনে খালদুনের জ্ঞান প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাকে মুক্তি দানের আদেশ দেন। তখন প্রায় অধিকাংশ দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। আন্দলুসিয়ার সুলতান কর্তৃক মরক্কো দখল হলে ইবনে খালদুন পুনরায় গ্রেফতার হন এবং আনুমানিক ১৩৭৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি মুক্তি লাভ করেন।
মুক্তি পেয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ে তিনি চলে আসনে আন্দলুসিয়ায় এবং জ্ঞান সাধনা ও ইতিহাস রচনায় মনোনিবেশ করেন। কিন্তু এখানেও তিনি শান্তি ও নিরাপত্তা পেলেন না। জালেম, নিষ্ঠুর ও ক্ষমতা লিন্দু শাসকদের ষড়যন্ত্রের কারণে তাঁকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে দেশ থেকে দেশান্তরে, পোহাতে হয়েছে অনেক দুর্ভোগ। এ সময় আন্দালুসিয়ার সুলতান ছিলেন আল আহমার। তিনি ইবনে খালদুনকে খুব সম্মান দিয়েছিলেন। কিন্তু এ সময় মরক্কোর নতুন আমীর ইবনে খালদুনকে গ্রেফতার করার জন্যে লোক পাঠালে ইবনে খালদুন আন্দালুসিয়া ত্যাগ করে চলে যান উত্তর আফ্রিকায়। সে সময় উত্তর আফ্রিকায় ইবনে খালদুনের খুব প্রভাব ও সুখ্যাতি ছিল।
তিনি ছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব; যিনি দুঃখ কষ্টকে বরণ করে নিয়েছেন। কিন্তু সত্য ও ন্যায়কে প্রকাশ করতে কাউকে ভয় করতেন না। তখন তেলেমচীনের আমীর আবু হামুর এর মন্ত্রী ছিলেন তার ভাই ইয়াহিয়া। তিনি এখানে সর্ব সাধারণ বিশেষ করে গরীব ও সমাজের নির্যাতীত ও নিপীড়িত মানুষের সাথে মেলামেশা করতে লাগলেন। ক্রমে ক্রমে ইবনে খালদুনের মানব সেবা, প্রতিভা ও আদর্শে মুগ্ধ হয়ে জনগণ তাঁর ভক্ত হতে লাগল এবং তার নিকট তাদের বিভিন্ন অভাব অভিযোগের কথা প্রকাশ করতে শুরু করল। আমীর আবু হামু ভাবলেন, জনগণ যেভাবে তার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে তাতে দেশে যে কোন সময় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে। তাই আমীর আবু হামু ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ইবনে খালদুনের বিরুদ্ধে প্রজা বিদ্রোহের অভিযোগ উত্থাপন করেন। এতে ইবনে খালদুন তেলেমচীন ত্যাগ করে বানু আরিফ প্রদেশে চলে যান এবং শান্তিতে বসবাস শুরু করেন। এখানেই তিনি আমীর মুহাম্মদ ইবনে আরিফের দেয়া নিরাপত্তা ও সহযোগিতায় বিশ্ববিখ্যাত কিতাব ‘আল্ মোকাদ্দিমা’ রচনা করেন। এ কিতাবের মাধ্যমে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজ বিজ্ঞানী, ঐতিহাসিক ও দার্শনিক হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করেন। আল মুকাদ্দিমায় তিনি যে মৌলিক চিন্তা ধারায় পরিচয় দিয়েছেন তা পৃথিবীতে আজও বিরল। তিনি সুস্পষ্ট ভাষাই বলেছেন যে, ঐতিহাসিক বিবরণ ও ঘটনাপঞ্জী লিপিবদ্ধ করাই ঐতিহাসিকের কাজ নয় বরং জাতির উত্থান পতনের কারণগুলোকেও বিশ্লেষণ করতে হবে। তিনি আল মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে জাতিসমূহের উত্থান পতনের কারণগুলো সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
১৩৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি মাতৃভূমি তিউনিসে পুনরায় ফিরে আসেন কিন্তু মাতৃভূমির জনগণ তাকে সম্মান দেয়নি। অবশেষে ১৩৮২ খ্রিস্টাব্দে চলে যান মিসরে। সেখানে তিনি আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং পরবর্তীতে মিসরের সুলতান তাঁকে প্রধান বিচারপতির পদে নিযুক্ত করেন। মিসরের কায়রোতে তিনি প্রায় ২৪ বছর কাটিয়েছিলেন। এখানেই তিনি আত তারিক’ নামক আত্মচরিত্র গ্রন্থ রচনা করেন।
তিনি সমাজ বিজ্ঞান ও বিবর্তনবাদ সম্পর্কে অনেক নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কার করেন। বিবর্তনবাদের নতুন তথ্য ইবনে খালদুনই সর্বপ্রথম উদ্ভাবন করেছিলেন। ইতিহাস সম্পর্কে তার লেখা কিতাব আল ইবর’ বিশ্বের প্রথম এবং সর্ববৃহৎ ইতিহাস গ্রন্থ। ইবনে খালদুনের বিভিন্ন রচনাবলী ইউরোপে বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হবার পর সমগ্র বিশ্বে তাঁর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। উল্লেখ্য যে, এমন এক সময় ছিল যখন মুসলিম জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প ও সাহিত্যে পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। পরবর্তীতে ইউরোপের লোকের মুসলিম মনীষীদের জ্ঞান বিজ্ঞান ও শিল্প সাহিত্যকে চর্চা করে ক্রমান্বয়ে আজ উন্নতির শিখরে উঠেছে। কিন্তু মুসলিম জাতি তাদের পূর্ব পুরুষদের সুবিশাল জ্ঞান ভান্ডারকে উপেক্ষা করায় আজ বিশ্বের বুকে অশিক্ষা, দরিদ্র ও পরমুখাপেক্ষী জাতি হিসেবে পরিণত হয়েছে।
১৪০০ খ্রিস্টাব্দে দিগ্বিজয়ী বাদশা তৈমুর সিরিয়া আক্রমণ করেন এবং মিসর অভিযানের প্রস্তুতি নেন। ঠিক এ সময় ইবনে খালদুন মিসরের সুলতানের অনুরোধে একটি শান্তি চুক্তির প্রস্তাব নিয়ে বাদশা তৈমুরের দরবারে উপস্থিত। দীর্ঘ আলোচনার পর বাদশা তৈমুর ইবনে খালদুনের জ্ঞান, বুদ্ধি ও প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তার শান্তি প্রস্তাব মেনে নেন। তৈমুর তার মিসর অভিযান স্থগিত ঘোষণা করেন। এভাবে ইবনে খালদুন তাঁর জ্ঞান ও প্রতিভা দিয়ে একটি অনিবার্য সংঘাত থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করলেন। বাদশা তৈমুরের বিশেষ অনুরোধে ইবনে খালদুন দামেস্কে কিছুদিন অবস্থান করেন। এরপর ফিরে আসেন মিসরে। মিসরেই এ বিখ্যাত মনীষী ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। এ মনীষী মুসলিম জাতির জন্যে যে জ্ঞান রেখে গেছেন তা ইতিহাস চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।
১৯. কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬ খ্রীঃ)
পারিবারিক সীমাহীন দুঃখ দুর্দশার মধ্যেও যিনি আজীবন বাংলা কাব্য ও সাহিত্য চর্চায় ব্রতী ছিলেন, যিনি ছিলেন বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী, যিনি বাংলা কাব্য ও সাহিত্যে প্রচন্ড বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, যিনি দেশের স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যে জালেম শাসক গোষ্ঠীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে কারাগারে বন্দী জীবন কাটিয়েছিলেন, যার কাব্য ও সাহিত্যে ইসলামী ও ঐতিহ্য বলিষ্ঠ ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে, যার কবিতা, হামদ, নাত, গজল ও ইসলামী গান প্রায় প্রতিটি বাঙালী মুসলিমের হৃদয়কে করেছে জাগরিত, যিনি ছিলেন একাধারে শ্রমিক, সৈনিক, কবি, সাহিত্যিক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এবং একজন খাঁটি দেশ প্রেমিক তার নাম কাজী নজরুল ইসলাম। বাল্যকালে তাঁর ডাক নাম ছিল দুখু মিয়া।
