ইবনুন নাফিস কেবল মাত্র একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানীই ছিলেন না; বরং তিনি সাহিত্য, আইন, ধর্ম ও লজিক শাস্ত্রেও অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে তিনি বহু বৃহৎ গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি ২০ খন্ডে ইবনে সিনার বিখ্যাত গ্রন্থ কানুন ‘ এর ভাষ্য প্রণয়ন করেন। এতে তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন কঠিন সমস্যার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বিভিন্ন রোগের ঔষধ সম্পর্কে তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের নাম হচ্ছে ‘কিতাবুশ শামিল ফিল সিনায়াত তিব্বিয়া’। গ্রন্থটি প্রায় ৩০০ খন্ডে সমাপ্ত হবার কথা ছিল কিন্তু তার অকাল মৃত্যুতে তা সম্ভব হয়নি। এ গ্রন্থটির হস্তলিপি দামেস্কে রয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে তিনি হিপোক্রেটস, গ্যালেন, হুনায়েন ইবনে ইসহাক এবং ইবনে সিনার গ্রন্থের ভাষ্য প্রণয়ন করেন।
তিনি হাদীসশাস্ত্রের উপরও কয়েকখানা ভাষ্য লেখেন। এছাড়া তিনি আরো বহু গ্রন্থ রচনা করেন যেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে–আল মুখতার মিনাল আগজিয়া (মানবদেহে খাদ্যের প্রভাব সম্পর্কে), রিসালাতু ফি মানাফিয়েল আদাল ইনসানিয়াত (মানবদেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কার্য সম্বন্ধে)’, আল কিতাবুল মুহাজ ফিল কুহল (চক্ষু রোগ সম্বন্ধে), শারহে মাসায়েলে ফিত তিব্ব’, ‘তারিকুল ফাসাহ, মুখতাসারুল মানতেক’ প্রভৃতি।
তিনি ৬৮৭ হিজরী মোতাবেক ১২৮৮ খ্রীঃ কায়রোতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে সুস্থ করে তোলার প্রায় সকল চিকিৎসাই ব্যর্থ হয়ে যায়। অবশেষে মৃত্যু শয্যায় তার মিসর ও কায়রোর চিকিৎসক বন্ধুরা তাঁর রোগের প্রতিষেধক হিসেবে তাকে মদ পান করতে অনুরোধ করেন। মদ পান করলেই তাঁর রোগ সেরে যাবে বলে তারা পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি এক ফোঁটা মদ পান করতেও রাজি হলেন না। তিনি বন্ধুদেরকে উত্তর দিলেন, “আমি আল্লাহ পাকের দরবারে চলে যেতে প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি চিরদিন এ নশ্বর পৃথিবীতে থাকতে আসিনি। আল্লাহ আমাকে যতটুকু ক্ষমতা দিয়েছেন আমি চেষ্টা করেছি মানুষের কল্যাণে কিছু করে যেতে। বিদায়ের এ লগ্নে শরীরে মদ নিয়ে আল্লাহ পাকের দরবারে উপস্থিত হতে আমি চাই না।”
অতঃপর ৬৮৭ হিজরীর ২১শে জিলকদ মোতাবেক ১২৮৮ খ্রীষ্টাব্দের ১৮ই ডিসেম্বর রোজ শুক্রবার সকালে এ মহামনীষী ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তিনি তাঁর একমাত্র বাড়ীটি এবং তার সমস্ত বইপত্র মনসুরী হাসপাতালে দান করে যান।
১৮. ইবনে খালদুন (১৩২২–১৪০৬ খ্রীঃ)
মানব জাতির কল্যাণে আল্লাহ রাব্বর আলামীন যুগে যুগে এ ধরাতে পাঠিয়েছেন অসংখ্য নবী-রাসূল ও মনীষীদেরকে। যে ক’জন মুসলিম মনীষী মানুষের কল্যাণে বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসা, শিল্প, সাহিত্য, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে তাদের অমূল্য অবদানের জন্যে আজও সমগ্র বিশ্বে অমর হয়ে আছেন, ব্যক্তি স্বার্থের জন্যে যারা কখনো অন্যায় ও অসত্যের কাছে মাথা নত করেননি, যারা জ্ঞান সাধনার উদ্দেশ্যে দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন, ভোগ বিলাসকে উপেক্ষা করে যারা সারাটা জীবন কাটিয়েছেন মানুষের কল্যাণে, যারা জালেম শাসকদের স্বৈরশাসনকে সমর্থন না দিয়া কারাগারে কাটিয়েছেন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, তাদের মধ্যে ইবনে খালদুন অন্যতম।
১৩২২ খ্রিস্টাব্দের ২৭ মে আফ্রিকার তিউনিসিয়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ইবনে খালদুনের পুরো নাম আবু জায়েদ ওয়ালী উদ্দিন ইবনে খালদুন। তার পিতার নাম মুহাম্মদ ইবনে খালদুন। খালদুন’ হচ্ছে বংশের উপাধি। তাঁর পূর্ব পুরুষগণ ইয়েমেন থেকে এসে তিউনিসে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর পিতামহ তিউনিসের সুলতানের মন্ত্রী ছিলেন। পিতা ছিলেন খুব জ্ঞান পিপাসু। বাল্যকাল থেকেই ইবনে খালদুন জ্ঞান সাধনায় মশগুল হন। তাঁর মেধা ও স্মরণশক্তি ছিল বিস্ময়কর। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি পবিত্র কুরআনের তাফসীর শিক্ষা শেষ করেন। দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ বিজ্ঞান, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞান সাধনার প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। যে কোন বিষয়ে কোন বই পেলেই তা তিনি পড়ে শেষ করে ফেলতেন। ফলে অল্প বয়সেই তিনি বিভন্ন বিষয়ে গভীর জ্ঞান লাভ করেন।
জ্ঞান সাধনায় মত্ত এ মনীষীর জীবনের এ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নেমে আসে এক ভয়ানক দুর্যোগ। ১৩৪৯ খ্রিস্টাব্দে তিউনিসে দেখা দেয় ‘প্লেগ’ নামক মহামারী। এ মহামারীতে তার পিতামাতা, শিক্ষক, আত্মীয়-স্বজন ও অনেক বন্ধুবান্ধব মারা যান। এ সময়ে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ১৭/ ১৮ বছর। পিতামাতাকে হারিয়ে তিনি শোকে-দুঃখে মুহ্যমান হয়ে পড়েন এবং সংসারে নেমে আসে অভাব অনটন। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন তিউনিসের সুলতান আবু মুহাম্মদ এর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে তিনি চাকুরিতে যোগদান করেন। যেহেতু সংসারে মা বোন কেউ ছিল না, তাই ২২ বছর বয়সে ১৩৫৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিবাহ করতে বাধ্য হন। জ্ঞান পিপাসু এ মনীষী বিবাহের পর আমোদ প্রমোদ ও ভোগ বিলাসে ডুবে যাননি বরং গভীর আগ্রহে জ্ঞান চর্চা শুরু করেন। আস্তে আস্তে সারা দেশে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে ক্রমান্বয়ে তিনি রাজনীতিতে জাড়িয়ে পড়েন। চলে আসেন আন্দালুসিয়ায়। সেখানে গ্রানাডার সুলতানের অনুরোধে তিনি কেস্টিল রাজ্যে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কিছুদিন দায়িত্ব পালন করার পর ১৩৬৬ খ্রিস্টাব্দে আবার চলে আসেন স্বদেশভূমি তিউনিসে এবং এখানে তল্কালীন সুলতান আবু আবদুল্লাহর অনুরোধে ‘বগী’ নামক রাজ্যের মন্ত্রী হিসেবে চাকুরিতে যোগদান করেন।
