পিতার মৃত্যুর পর রুমী (রঃ) পিতার গদীনেশীন হন। বিভিন্ন দেশ থেকে তাঁর নিকট আগত হাজার হাজার লোকদেরকে তিনি শিক্ষাদান করেন। তিনি বহু কিতাব লিপিবদ্ধ করেছেন। তাঁর গ্রন্থাবলীর মধ্যে মসনবী’ ও ‘দিওয়ান’ তাঁকে অমর করে রেখেছে। বাংলা ভাষা সহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় তাঁর গ্রন্থ ‘মসনবী’ অনূদিত হয়েছে। আলেমগণ আজও বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় আলোচনা সভায় তাঁর রচিত কবিতা আবৃত্তি করে শ্রোতামণ্ডলীকে আকৃষ্ট করে থাকেন। পারস্যে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের পরই মসনবী’কে যথার্থ পথ প্রদর্শক বলে মনে করা হয়। দিওয়ানে রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার শ্লোক, যার প্রায় সমস্তই আধ্যাত্মিক গজল। তাঁর সৃষ্ট সাহিত্য ও সংস্কৃতি অতুলনীয়।
রুমী (রঃ) ছিলেন মহাপণ্ডিত। অসামান্য পাণ্ডিত্য তাঁকে দরবেশ বা সুফীতে পরিণত করেছে। ইলমে মারেফত’ ও ‘এলমে লাদুনিতে তিনি অসাধারণ পাণ্ডিত্য লাভ করেছিলেন। এটা হলো শ্রেষ্ঠ জ্ঞানের আলয়। সুফীর মতে দেহই মানবাত্মা ও পরমাত্মার মিলনের মহা অন্তরায়। দেহের ভিতরে যে কামনা ও বাসনা মানুষকে সর্বদা সত্যপথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, যা মানুষকে ব্যক্তিত্ব বা অহংকার প্রদান করে ভোগলিন্দু করে, সে জৈব আকাংখার নাম সুফীদের ভাষায় নফর’। নফসের ধ্বংসই দেহের কর্তৃত্বের অবসান ও আত্মার স্বাধীনতার পূর্ণতা। তাই নফসের বিরুদ্ধে সুফীদের আজীবন সংগ্রাম। রুমী (রঃ) তার সারাটা জীবন নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন। রুমীর মতে বুদ্ধি, যুক্তি ও ভক্তি এক নয়। বুদ্ধি ও যুক্তি দিয়ে আল্লাহকে চিনা, বুঝা ও পাওয়া যায় না। বরং এর জন্যে প্রয়োজন বিশ্বাস ও ভক্তি। ভক্তিই সোপান। আর ভক্তির উৎস হচ্ছে প্রেম ও আসক্তি। রুমির মতে আল্লাহ নির্গণ নন। জ্ঞান, দয়া, করুণা, প্রেম ও ক্রোধ ইত্যাদি অসংখ্য গুণাবলী রয়েছে তাঁর। কিন্তু মানুষ তার জ্ঞান, বুদ্ধি ও যুক্তির মাপকাঠি দিয়ে আল্লাহর গুণাবলী অনুধাবন করতে পারে না। কারণ বুদ্ধি ও যুক্তি নিজেই একটি সৃষ্ট বস্তু এবং মস্তিষ্ক ও স্নায়ুমন্ডলীর সক্রিয়তার উপর নির্ভরশীল। সুতরাং সৃষ্ট দিয়ে অসৃষ্টকে বুঝা সম্ভব নয়। আল্লাহকে বুঝতে ও চিনতে হলে ভক্তি ও বিশ্বাসের প্রয়োজন। তাহলেই অন্তর দিয়ে আল্লাহকে অনুধাবন করতে পারবে। মানুষ যখন মারেফাতের ঊর্ধ্বতন স্তরে উন্নীত হয়ে আপনার ভিতর আল্লাহর প্রকাশ অনুভব করে তখন তার ব্যক্তিত্বের সীমা কোথায় ভাসিয়ে যায়। তিনি তখন অসীমের ভিতর আপনাকে হারিয়ে ফেলেন। কিংবা তিনি নিজের সীমার ভিতরই অসীমের সন্ধান লাভ করেন। তখন তিনি আনন্দে বিভোর হয়ে বিশ্ব ভ্রহ্মান্ডের রাজৈশ্বর্যকে একেবারেই তুচ্ছ বোধ করেন। মারেফাতের স্তর উন্নীত হলে আত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে আর কোন ভেদাভেদ থাকে না। এ অবস্থার নাম হলো ‘হাল। এ কথাগুলো পৃথিবীর মানুষের সামনে পেশ করে গেছেন মাওলানা রুমী (রঃ)। ইহজগতে থেকে মানবাকৃতি বজায় রেখে মানুষ কিভাবে অস্তিত্বহীন হতে পারে তা মাওলানা রুমী (রঃ) দেখিয়েছেন।
মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমী (রঃ) ‘ভাগ্য ও পুরস্কার’ সমস্যার সহজ সমাধান দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সকল কার্যের নিয়ন্তা আল্লাহ। কিন্তু এর সংগে তিনি এটাও স্বীকার করেছেন যে, আল্লাহ পাক মানুষকে কতকগুলো কার্যের পূর্ণ। স্বাধীনতা বা স্বেচ্ছাধিকার দিয়েছেন, যার সীমারেখার মধ্যে মানুষ নিজেই তার কর্মপন্থা নির্বাচনের অধিকারী। এ সকল কার্যাদির কর্মফলের জন্যে মানুষ নিজেই দায়ী। কারণ এগুলো করা না করা তারই স্বেচ্ছাধিকার ভুক্ত, যদিও কর্ম করার শক্তি আল্লাহই মানুষকে প্রদান করেছেন। রুমী (রঃ) ছিলেন তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী।
রুমী (রঃ) খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন। তিনি দুনিয়ার ভোগ বিলাস ও ঐশ্বর্যকে তুচ্ছ মনে করতেন। তিনি যে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন সে তুলনায় দুনিয়া তুচ্ছ হওয়াটাই স্বাভাবিক। মৃতু কালে তার কোন সঞ্চিত ধন-সম্পদ ছিল না। ৬৬ বছর বয়সে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার অসুস্থতার সংবাদ প্রচারিত হবার সাথে সাথে চতুর্দিক হতে হাজার হাজার লোক গভীর উদ্বেগের সাথে ছুটে আসে। তৎকালীন বিখ্যাত চিকিৎসক শেখ সদরউদ্দিন, আকমাল উদ্দিন ও গজনফার তার চিকিৎসা করে ব্যর্থ হন। এ সময় রুমী (রঃ) চিকিৎসক শেখ সদরউদ্দিন সাহেবকে লক্ষ্য করে বললেন, “আশেক ও মাশুকের মধ্যে একটি মাত্র পর্দার ব্যবধান রয়েছে। আশেক চাচ্ছে তার মাশুকের নিকট চলে যেতে। পর্দাটা যেন দ্রুত উঠে যায়। শেখ সদরউদ্দিন বুঝতে পেরেছিলেন, রুমী (রঃ) এর আয়ু শেষ হয়ে আসছে; অর্থাৎ রুমী (রঃ) আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যাওয়ার জন্য তখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এরপর তিনি তাঁর শিষ্যদের সান্ত্বনা দিয়ে কিছু উপদেশ দিলেন, যার কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ
ইন্দ্রিয় লালসাকে কখনো প্রশ্রয় দিবে না। পাপকে সর্বদা পরিহার করবে। নামাজ ও রোজা কখনো কাযা করবে না। অন্তরে ও বাহিরে সর্বদা আল্লাহকে ভয় করে চলবে। বিপদে ধৈর্যধারণ করবে। বিদ্রোহ ও প্রতিশোধমূলক মনোভাব পোষণ করবে না। নিদ্রা ও কথাবর্তায় সাধ্যানুযায়ী সংযমী হবে। কাউকে কোন প্রকার কষ্ট দিবে না। সব সময় সৎ লোকদের সংস্পর্শে থাকবে। মনে রাখবে, মানুষের মধ্যে তিনিই শ্রেষ্ঠ, যার দ্বারা ও দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধিত হয়। তারপর তিনি বললেন, মানুষের দেহ নশ্বর কিন্তু তার আত্মা অবিনশ্বর। এ নশ্বর দেহ ধ্বংস প্রাপ্ত হয় বটে; কিন্তু তার ভিতর যে অবিনশ্বর আত্মা রয়েছে তা চিরকালই বেঁচে থাকে।
