শেখ সাদীর গুলিস্তা ও বোস্তা বিশ্ব কাব্য ও সাহিত্যে এক অমূল্য সম্পদ। গুলিস্তা ও বোস্তা ব্যতীত জগতে এমন গ্রন্থ খুব কমই আছে যা বহু যুগ ধরে বিপুল ভাবে পঠিত হয়ে আসছে। ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে জেল্টায়াস নামক এক ব্যক্তি ল্যাটিন ভাষায় আমস্টারডাম নগরে ‘রোসারিয়াম পলিটিকাম’ নাম দিয়ে গুলিস্তার অনুবাদ প্রকাশ করেন। ১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দে উহা ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়। বর্তমানে ইউরোপ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখ সাদীর গুলিস্তাসহ বিভিন্ন কিতাব ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, আরবী, ডাচ, উর্দু, তুর্কি, বাংলা প্রভৃতি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। শেখ সাদী (রঃ) এর উপরোক্ত গ্রন্থগুলো ব্যতীত নসিহত-অল-মলুক’, ‘রিসালায়ে আশুকিয়ানো’, ‘কিতাবে মিরাসী’, ‘মোজালেসে খামসা, তরজিয়াত’, রিসালায়ে সাহেবে দিউয়ান, কাসায়েদল আরবী, আৎ তবিয়াত’, প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
শেষ বয়সে শেখ সাদী (রঃ) মাতৃভূমি নগরের এক নির্জন আশ্রমে জীবন যাপন করতেন। এ স্থানেই তিনি অধিকাংশ সময় গভীর ধ্যানমগ্ন থাকতেন। মাঝে মাঝে আগন্তক ব্যক্তিদের সাক্ষাৎ দেয়ার জন্যে আশ্রমের বাইরে যেতেন। দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন ধনী, গরীব, শিক্ষিত, মূর্খ, রাজা প্রজা এবং নিকট সমবেত হত। শেখ সাদী (রঃ) বাল্যকাল থেকেই দৈনিক ৪/৫ ঘণ্টা পৃবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করতেন। তিনি কখনো গৃহে বেনামাজী চাকর নিয়োগ করতেন না। আস্তে আস্তে তাঁর বার্ধক্য ঘনিয়ে আসে। বার্ধক্যেও তিনি যৌবনের তেজ ধারণ করতেন। অবশেষে ১২৮২ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৬৯১ হিজরীতে ১২০ বছর বয়সে এ মনীষী ইহলোক ত্যাগ করেন। সিরাজ নগরের ‘দিলকুশা নামক স্থানের এক মাইল পূর্ববর্তী পাহাড়ের নিচে তাঁর সমাধি রয়েছে। সমাধি জিয়ারতকারীদের পাঠের জন্যে সা’দীর নিজ হাতে লেখা একটি কাব্যগ্রন্থ সমাধি গৃহে রক্ষিত আছে। পারস্যে এ সমাধি গৃহ ‘সাদীয়া’ নামে অভিহিত হয়ে থাকে।
১৬. মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী (রঃ) (১২০৭-১২৭৩ খ্রি:)
আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক কি? আল্লাহকে চেনা ও বুঝার উপায় কি? মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক কি? ইহজগতে থেকে মানবাকৃতি বজায় রেখে মানুষ কিভাবে অস্তিত্বহীন হতে পারে? নিয়তি ও কর্মের সমস্যার সমাধান কি? নফস কি এবং নফসের প্রভাব থেকে মানুষের মুক্তি লাভের উপায় কি? এ সকল বিস্ময়কর প্রশ্নের জবাব যিনি প্রথম মানুষের সামনে দিয়েছিলেন, তাঁর নাম মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী (রঃ)। ৬০৪ হিজরীর ৬ রবিউল আউয়াল মোতাবেক ১২০৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯ সেপ্টম্বর এ মহামনীষী বর্তমান আফগানিস্তানের বলখ নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল বাহাউদ্দিন ওয়ালিদ। পিতা ছিলেন তকালের স্বনামখ্যাত কবি ও দরবেশ। জানা যায় পিতা বাহাউদ্দিন ওয়ালিদের পাণ্ডিত্যের খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে পারস্যের রুম প্রদেশের অন্তর্গত কুনিয়ার তকালীন শাসনকর্তা আলাউদ্দিন কায়কোবাদ মনীষী বাহাউদ্দিন কুনিয়ায় আমন্ত্রণ করে পাঠান। আমন্ত্রণ পেয়ে বাহাউদ্দিন ওয়ালিদ সপরিবারে কুনিয়ার চলে যান এবং রাজনৈতিক কারণে তিনি সেখানে বাসস্থান নির্মাণ করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এ রুম প্রদেশের নাম অনুসারে তিনি রুমী’ নামে খ্যাতি লাভ করেন।
৫ বছর বয়স থেকেই মাওলানা রুমী (রঃ) এর মধ্যে বিভিন্ন অলৌকিক বিষয়াদি পরিলক্ষিত হতে থাকে। বাল্যকালে তিনি অন্যান্য ছেলেমেয়েদের ন্যায় খেলাধূলা ও আমোদ প্রমোদ লিপ্ত থাকতে পছন্দ করতেন না। তিনি সর্বদা ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আলোচনা পছন্দ করতেন। ৬ বছর বয়স থেকেই তিনি রোজা রাখতে শুরু করেন। ৭ বছর বয়সে তিনি সুমধুর কণ্ঠে পবিত্র কোরআন বিশুদ্ধভাবে তেলাওয়াত করতেন। কোরআন তেলাওয়াতের সময় তার দু’নয়নে অশ্রুধারা প্রবাহিত হত। সম্ভবত এ বয়সেই তিনি কোরআনের মর্মবাণী ও আধ্যাত্মিক বিষয়াদি অনুধাবন করতে পারতেন। কথিত আছে মাওলানা রুমী (রঃ) এর বয়স যখন ৬ বছর তখন পিতা বাহাউদ্দিন বালক রুমী (রঃ) কে সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ইরানের নিশাপুরে যান এবং সেখানে বিখ্যাত দার্শনিক ও কবি শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তাবের সাক্ষাৎ লাভ করেন। শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তাৰ বালক জালাল উদ্দিনের মুখচ্ছবি দেখেই তার উজ্জ্বল ভবিষ্যত বুঝতে পেরে তার জন্যে দোয়া করেন এবং তার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখার জন্যে পিতাকে উপদেশ দেন। নিশাপুর ত্যাগ করে পিতা বাহাউদ্দিন রুমী (রঃ) কে সঙ্গে নিয়ে পবিত্র হজ্জ সম্পাদন করেন এবং বাগদাদসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। পিতা নিজেই তার পুত্রকে আধ্যাত্মিক জ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দিতে লাগলেন। শিক্ষা লাভের প্রতি তাঁর ছিল পরম আগ্রহ।
১২৩১ সালে পিতার মৃত্যুর পর মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী (রঃ) মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন এবং জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে মারাত্মক বাধা এসে দাঁড়ায়। মাতাকে হারিয়ে ছিলেন আরো কয়েক বছর পূর্বে। এ সময়ে কুনিয়া শহরে তিনি সাহচর্য লাভ করেন পিতার প্রধান শিষ্য তৎকালীন পণ্ডিত ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী সৈয়দ বোরহান উদ্দিনের। সৈয়দ বোরহান উদ্দিন পিত শোকাকুল মাওলানা রুমী (রঃ) কে শিক্ষা দান করেন। এরপর উচ্চতর শিক্ষা লাভের জন্যে তিনি চলে যান প্রথমে সিরিয়া ও পরে দামেস্কে। তিনি দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৭ বছর অধ্যয়ন করেন। এছাড়া জ্ঞানের সন্ধানে তিনি ৪০ বৎসর বয়স পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান দেশ থেকে দেশান্তরে। তিনি তার শিক্ষা জীবনে তৎকালীন যুগ শ্রেষ্ঠ মনীষীদের সাহচর্য লাভ করেন। তিনি যাদের থেকে জ্ঞান লাভ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে শামসুদ্দিন তাব্রীজ (রঃ), ইবনে আল আরাবি (রঃ), সালাউদ্দিন ও হুসামউদ্দিন এর নাম উল্লেখযোগ্য। জালাল রুমী (রঃ) এত জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন যে, তকালীন সময়ে তার সাথে অন্য কারো তুলনা ছিল না। কথিত আছে ১২৫৯ সালে চেঙ্গীস খানের পৌত্র হালাকু খান যখন বাগদাদ অধিকার করে তদীয় সেনাপতি কুতুববেগকে দামেস্কের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন তখন দামেস্কবাসীদেরকে সহযোগিতা করার জন্যে ধ্যানযোগে তিনি দামেস্কে উপস্থিত হয়েছিলেন।
