এই দূরবস্থার সময় কয়েকজন বন্ধুর সহায়তায় তিনি বৈদেশিক দপ্তরে ল্যাটিন সেক্রেটারির পদ পেলেন (১৬৪৯)। তার পদটি ছিল সাধারণ করণিকের।
ক্রমশই তাঁর কাজের চাপ বাড়ছিল। অত্যধিক কাজের চাপে মাঝে মাঝেই চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছিল। ডাক্তাররা তাকে সাবধান করে দিত। এই ভাবে কাজ চালিয়ে গেলে তিনি অন্ধ হয়ে যাবেন।
এই সময় মিলটনের জীবনে ঘটল এক বিপর্যয়। স্ত্রী মেরি সন্তান জন্মের সময় মারা গেল। তখন তার বয়েসে মাত্র ছাব্বিশ।
চোখের অন্ধকারের সাথে সংসারেও নেমে এল অন্ধকার। এই বিপর্যয়ের মধ্যেও মানসিক শক্তি হারানানি মিলটন। তিনি লিখেছেন, “যদি আমার এই ব্যাধি দূরারোগ্য হয় তবে আমি তার সাথে মানিয়ে নেব। তাছাড়া এর জন্যে আমার কোন দুঃখ নেই। দেশের সেবার জন্যই আমি চোখের আলো হারিয়েছি।”
১৬৬০ সালে ক্রমওয়েল মারা গেলেন। প্রথম চার্লসের পুত্র ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে ক্ষমতা দখল করলেন। দেশে নতুন করে দেখা গেল স্বৈরতন্ত্র।
মিলটন বুঝতে পারলেন তাকেও যে কোন মুহূর্তে বন্দী করা হবে। বাচবার জন্যে এক বন্ধুর বাড়িতে গোপনে আশ্রয় নিলেন।
নতুন রাজার অনুগত লোকেরা মিলটনের সমস্ত লেখ প্রকাশ্য রাজপথে পোড়াতে আরম্ভ করল। তার বাড়িঘর লুটপাট করল। তার গোপন আস্তানাও খুঁজে বার করল তারা। বন্দী হলেন মিলটন।
বন্ধুরা সরাসরি আবেদন করল রাজার কাছে। একজন অন্ধ মানুষের প্রতি করুণাবশতই তিনি তাকে মুক্তি দিলেন।
গৃহে ফিরে এলেন মিলটন। কিন্তু ক্রমশই তাঁর মনে হতে থাকে তার এই ঘর যেন আরেক বন্দীশালা। এখানে কেউ তাঁকে চায় না। কোন সঙ্গী নেই তার। মেরি মারা যাবার পর তিনি বিয়ে করেছিলেন কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দ্বিতীয় স্ত্রী মারা গেলেন। নিঃসঙ্গতা ভুলতে স্থির করলেন আবার বিয়ে করবেন, এবার ঘর থেকেই প্রতিবাদ উঠল। এক মেয়ে বলল, বাবার বিয়ের খবরে আমার কিছু এসে যাবে না কিন্তু তার মরার খবর শুনলে খুশি হব।
মর্মাহত হলেন মিলটন। ঘরের মানুষেরা তাঁর পর হয়ে গিয়েছে। লন্ডন ছেড়ে বাসা বাঁধলেন এক নির্জন গ্রামে। সাথী তার বড়ো মেয়ে।
বাইরের জগৎ থেকে একটু একটু করে নিজেকে গুটিয়ে আনলেন মিলটন। তার অন্তরের অনুভুতির আলোয় লিখলেন এক অবিস্মরণীয় কবিতা “On his blindness”।
আত্মমগ্নতার গভীরে যতই ডুব দিচ্ছিলেন মিলটন ততই অন্তরে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছিল এক নতুন জগৎ, যেখানে চারপাশের জগতের কেউ নেই, আছেন ঈশ্বর, শয়তান, পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদম আর ইভ।
শুরু হল তার অমর কাব্য প্যারাডাইস লস্ট (Paradise Lost)। তিনি মুখে মুখে বলে যেতেন, তার মেয়ে শুনে শুনে তাই লিখত। এই সময় তিনি যেন হারিয়ে যেতেন তার কাব্যের জগতে।
প্যারাডাইস লস্ট কাব্যের মধ্যে কবি তার সীমাহীন কল্পনায় পাখা মেলে দিয়েছেন স্বর্গ মর্ত্য পাতালে। এই কাব্যের লুসিফার (শয়তান) ও মানুষের পতনের কাব্য, শয়তান ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। দাসত্বের জীবনকে সে মেনে নিতে চায় না। চিরবিদ্রোহী মিলটনের প্রচ্ছন্ন সহানুভূতি ফুটে উঠেছে শয়তানের প্রতি। স্বর্গে দাসত্ব করবার চেয়ে নরকে রাজত্ব করা অনেক শ্রেয় শয়তানের এই আর্তনাদ যেন মিলটনেরই আত্মার প্রতিধ্বনি।
বিদ্রোহী শয়তান পরাজিত হয়ে নির্বাসিত হয়েছে নরকে। তবুও সে ভেঙে পড়েনি। তারই মত যারা নির্বাসিত তাদের নিয়ে প্রতিহিংসার সুযোগ খুঁজতে থাকে।
তখন স্বর্গে ছিল পৃথিবীর আদি মানব আদম, আর প্রথম মানবী ইভ। শয়তান এসে হাজির হল স্বর্গে। আদম আর ইভ তখন ঘুরে বেড়াচ্ছিল স্বর্গের উদ্যানে। তাদের প্রলুব্ধ করল জ্ঞান বৃক্ষের ফল খেতে। যে ফল খেতে ঈশ্বর তাদের নিষেধ করেছিলেন। ক্রুদ্ধ হলেন ঈশ্বর। তাঁর আদেশ অমান্য করার জন্য আদেশ ইভকে স্বর্গ থেকে বঞ্চিত হতে হল। তাদের স্থান হল পৃথিবীতে।
এই কাহিনী মিলটন নিয়েছিলেন বাইবেল থেকে। কিন্তু প্যারাডাইস লস্টের শ্রেষ্ঠত্ব তার কাহিনীর মধ্যে নয়। সুদূরপ্রসারী অন্তদৃষ্টি, বর্ণনার অসাধারণ ও তেজস্বী ছন্দ, গুরুগম্ভীর ভাষা, বিস্তৃত পটভূমিকা প্যারাডাইস লস্টকে এক মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছে।
প্যারাডাইস লস্টের পরবর্তী অংশ মিলটন লিখলেন প্যারাডাইস রিগেণ্ড (Paradise Regained)। মানুষের শক্তির প্রতি মিলটনের ছিল গভীর আস্থা। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষ কখনো চিরদিনের জন্য পরাজিত হতে পারে না। মানব পুত্র যেদিন মানুষের জন্য আত্মহুতি দেবেন, মানুষ তখনই খুঁজে পাবে তার স্বর্গের অধিকার। এই কাব্যের মধ্যে মিলটনের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটেনি। প্যারাডাইস লস্টের অসাধারণত্ব এখানে খুঁজে পাওয়া যায় না।
এরপর মিলটন লিখলেন বাইবেলের চরিত্র অবলম্বন করে স্যামসন অ্যাগনিস্টিস (Samson Agonistes)। মল্লযোদ্ধা স্যামসন। একদিন তার শৌর্য বীর্য ছিল, এখন অন্ধ। ফিলিস্টাইনদের হাতে বন্দী। তার বিশ্বাসঘাতিনী স্ত্রীর জন্যই তাকে বন্দী হতে হয়েছে। শক্তিমান স্যামসন কারো অনুগ্রহে মুক্তি চায় না। তার চেয়ে বন্দী জীবন অনেক শ্রেয়। কিন্তু যেদিন পথের মল্লযোদ্ধা হ্যারাফার কাছে অপমানিত হয় সেই দিন সে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। নিজের বাহুবলে হত্যা করে হ্যারাফাঁকে। কিন্তু পরিণতিতে তাকে মৃত্যু বরণ করতে হয়।
