তিনি লন্ডনের সতেরো মাইল দূরে হর্টন গ্রামে গেলেন। সেখানে তাঁর বাবার একটি বাড়ি ছিল। সেই বাড়িতেই তাঁর মা থাকতেনই এখানে পাঁচ বছর ধরে চলল সাহিত্য, দর্শন, ভাষাতত্ত্ব, সঙ্গীত প্রতিটি বিষয়েই গভীর অধ্যয়ন।
মিলটন লিখেছেন এই পাঁচ বছর আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের সময়। বাবার কারবার আমাকে সমস্ত আর্থিক দুঃচিন্তা থেকে মুক্ত রেখেছিল।
পাঁচ বছরের অজ্ঞাতবাস শেষ করে তিনি স্থির করলেন, মানুষের সমাজে ফিরে যাবেন। নাইটঙ্গেলের গান, মুক্ত প্রকৃতি ছাড়াও নিজেকে প্রস্তুত করে তুলতে গেলে মানুষের সান্নিধ্য প্রয়োজন। তিনি লন্ডনে ফিরে এলেন। পরিচয় হল কিছু জ্ঞানী মানুষের সাথে। কয়েকজনের সাথে গড়ে উঠল অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব।
১৬৩৭ সালে মিলটনের মা মারা গেলেন। মায়ের মৃত্যুতে মানসিক দিক থেকে বিপর্যন্ত হয়ে পড়লেন মিলটন।
মিলটনের বাবা ছেলের মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে তাকে ইতালি যাওয়ার অনুমতি দিলেন। এখানে এসে পেলেন এক নতুন জীবন। একের পর এক ইতালির বিভিন্ন শহর ঘরতে থাকেন। পরিচয় হল সে দেশের বহু জ্ঞানী-গুণী মানুষের সাথে। দেখা হল গ্যালিলিওর সাথে। গ্যালিলিও তখন বৃদ্ধ, দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। এখানে কয়েকজন বিখ্যাত সঙ্গীতকারের সান্নিধ্য পেলেন। ইতালির তৎকালীন সাহিত্য, শিল্পকলার চেয়ে সঙ্গীত তাঁকে বেশি আকৃষ্ট করেছিল।
ইতালির কিছু কবি সমালোচক তার ল্যাটিন ভাষায় লেখা কবিতা পড়ে মুগ্ধ হলেন। তাদের আন্তরিকতায় মনে হল ঘরের ছেলে যেন ঘরে ফিরে এসেছে।
ইংল্যান্ড থেকে সংবাদ এল দেশে যুদ্ধের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তাঁর দেশভ্রমণের ইচ্চা স্থগিত রাখলেন। তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে এলেন।
ইতালি থেকে প্রত্যাবর্তন করবার আগে মিলটন ভেবেছিলেন তিনি এক অসামান্য কাব্য রচনা করবেন, কিন্তু ইংল্যান্ডে ফিরে আসবার পরেই তার মধ্যে জেগে উঠল বিদ্রোহী সত্তা–”এবার আর কাব্য নয়, এখন প্রয়োজন গদ্যের।”
লন্ডনে এসে পাকাপাকিভাবে ঘর বাধলেন মিলটন। নিজেকে ঘোষণা করলেন এই যুদ্ধের সৈনিক হিসাবে। তবে তার অস্ত্র বন্দুক নয়, কলম।
মিলটন ধর্মীয় বিবাদ-বিসংবাদকে অপছন্দ করতেন কিন্তু মানুষের এই বিবাদকে অস্বীকার করলেন না। “অন্য মানুষের ঘামঝরানো পরিশ্রমে আমি আরাম আনন্দ ভোগ করতে চাই না। যারা তা ভোগ করে আমি তাদের ঘৃণা করি।”
মিলটনের অন্তরের ক্ষোভ ফেটে পড়ল তাঁর লেখায়। প্রথম আঘাত হানলেন খ্রিস্টান যাজক ধর্মপ্রচারকদের বিরুদ্ধে। যারা ধর্মের নামে চার্চের পবিত্র পরিমণ্ডলকে দূষিত করে তুলেছে। যারা হিংস্র নেকড়ের মত অন্যকে সেবা করবার পরিবর্তে নিজেরাই অন্যের সেবায় পরিপুষ্ট হচ্ছে।
শুধু ধর্ম নয় আরো অনেকের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার কলম গর্জে উঠল। সমাজের শাসক শ্রেণীর দুর্নীতি, তাদের ব্যভিচার, শাসনের নামে শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র কষাঘাত করলেন। মিলটন জানতেন তার এই লেখার পরিণতি কি ভয়ঙ্কর হতে পারে। শুধু কারাদণ্ড নয়, মৃত্যু অবধি হতে পারে তাঁর। তবুও সামান্যতম ভীত হলেন না।
১৬৪৪ সালে ২৪ শে আগস্ট রাজার নির্দেশে নতুন আইন প্রস্তুত করে বাক স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সমস্ত বিষয়ে লেখার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হল।
এই আদেশের বিরুদ্ধে মিলটনের সমস্ত ক্ষোভ যেন বিস্ফোরণের মত ফেটে পড়ল। প্রকাশিত হর মুদ্রণ ও স্বাধীনতার সপক্ষে লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ Areopagitica।
মিলটনের Areopagitica শুধু ইংল্যান্ডের নয়, সমগ্র বিশ্বের মানুষের বাক স্বাধীনতা, মুদ্রণ স্বাধীনতা, সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল।
পঁয়ত্রিশ বছর বয়েসে মিলটন বিয়ে করলেন মেরি পাওয়েলকে। মেরির বয়স তখন সতেরো। এই বিবাহ সুখের হয়নি। কারণ দুজনে ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিকতার মানুষ। বিবাহের পর এক মাস মেরি নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল তারপরই স্বামীর বিরুদ্ধে তার সব ক্ষোভ ফেটে পড়ল। স্বামীর ঘর ছেড়ে বাবার ঘরে গিয়ে উঠল।
এই সময়ে লিখলেন তার বিখ্যাত ইস্তাহার The Doctrine and Discipline of Divorce to the good of both sex. বিবাহ বিচ্ছেদের সপক্ষে এতে তিনি জোরালো যুক্তি দেখালেন। সংসারের সুখের জন্য বিবাহ বিচ্ছেদের প্রয়োজন আছে।
মুহূর্তে নিজের ভুলে বুঝতে পারে মেরি।
মেরি ফিরে এল মিলটনের কাছে। সঙ্গে নিয়ে এল তার দশ ভাইবোন আর বাবা মাকে। সেই দিন থেকে মিলটনের জীবনের সব সুখ নষ্ট হয়ে গেল।
দেশে গৃহযুদ্ধ চলছে। একদিকে ক্রমওয়েলের নেতৃত্বে পার্লামেন্টের বাহিনী, অন্যদিক চার্লসের সেনাদল। দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। মিলটনের বাবার কাজকর্মে মন্দা দেখা দিয়েছে। তিনিও ছেলের কাছে চলে এলেন। বাধ্য হয়ে সংসার খরচ মেটাবার জন্য বাড়িতে স্কুল খুললেন। কিছু ছাত্রও জুটে গেল। সেই অর্থে অথি কষ্টে সংসার চালান মিলটন।
অবশেষে ১৬৪৬ সালে গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটল। রাজার বাহিনী সম্পূর্ণ পরাজিত হল। রাজা প্রথম চার্লসকে হত্যা করা হল। ইংল্যান্ডের শাসনভার গ্রহণ করলেন অলিভার ক্রমওয়েল।
এই বছরই মিলটনের কবিতার প্রথম বই প্রকাশিত হল।
মিলটনের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমশই খারাপ হতে থাকে। এক সন্তানের পিতা হয়েছেন তিনি। স্থান সংকুলানের জন্য পুরনো বাড়ি ছেড়ে নতুন বাড়িতে এসেছেন।
