ভাস্করাচার্যের পিতা মহেশ্বর দৈবজ্ঞ ছিলেন পণ্ডিত। জ্যোতির্বিদ্যা, ধর্মশাস্ত্রে তিনি ছিলেন খুবই পারদর্শী। তাঁদের বংশ বিদ্যাচর্চা ও পাণ্ডিত্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। তাঁরা সকলেই ছিলেন বিনয়ী, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবান।
ভাস্করাচার্যের শিক্ষা শুরু হয় তাঁর পিতার কাছে। বংশানুক্রমিক সাধনার পূর্ণ পরিণতি ঘটেছে তার মধ্যে। তাঁর সময়ে উজ্জয়িনী ছিল শিক্ষা-সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান। পরিণত বয়সে উজ্জয়িনী ছিল তাঁর প্রধান কর্মক্ষেত্র। তাঁর দুই পুত্রই ছিলেন বেদজ্ঞ পণ্ডিত।
ভাস্করাচার্য ছিলেন সাহসী, সংস্কারমুক্ত, উদার মনের মানুষ। মধ্যযুগে যখন ভারতবর্ষের মানুষ ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনার জগতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছিল, সেই যুগের বুকের উপর দাঁড়িয়ে তিনি সমস্ত ভ্রান্ত ধারণাকে ছিন্নভিন্ন করে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এর মধ্যে দিয়ে যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি যখন অন্যের মতকে খণ্ডন করেছেন তখন প্রতিপক্ষের কাছে মার্জনা চেয়ে নিতে দ্বিধা করেননি। ভাস্করাচার্যের মধ্যে ছিল সাহস, সত্যকে প্রকাশ করবার দৃঢ়তা, সেই সাথে উদারতা।
ভাস্করাচার্য প্রায় ৭১ বছর জীবিত ছিলেন। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে তিনি করণকুল নামে একটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থখানি তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে সমৃদ্ধ।
ভারতবর্ষের মানুষ যদি এ মহাবিজ্ঞানী পথকে অনুসরণ করত তবে ভারত আজ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন পেত। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা সব কিছু থেকেও সব কিছু হারিয়েছি।
৪৩. পার্সি বিশী শেলী (১৭৯২-১৮২২)
১৭৯২ সালের ৪ আগস্ট ইংলন্ডের সাজেক্সের অন্তর্গত ওয়াহহ্যামে শেলীর জন্ম। টিমথি শেলীর প্রথম পুত্র পার্সি বিশী শেলীর ছেলেবেলাকার স্মৃতিমধুর ছিল না। ছেলেবেলা থেকে পারিপার্শ্বিক জগৎ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন। তিনি। শেলীর জগৎ ছিল স্বপ্নের এবং কল্পনার। প্রাথমিক স্কুলের পাঠ শেষ করে তিনি ভর্তি হলেন লন্ডনের সবচে নামী স্কুল ইটনে। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে ইটন ছাড়তে হল কারণ এক সহপাঠীর হাতে ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিলেন তিনি।
শেলী ছিলেন অসাধারণ সুন্দর। দশ বছর বয়সে তাকে ‘সিয়ন এ্যাকাডেমি’র আবাসিক স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয়। আঠারো বছর বয়সে তিনি ভর্তি হলেন অক্সফোর্ডের কলেজে। ইতিমধ্যে তাঁর রোমান্টিক কবি কল্পনায় শুরু হয়েছে কাব্য রচনা। ১৮১১ সালে শেলী লিখলেন The necessity of Atheism। এই প্রবন্ধ লেখার অপরাধে তাকে কলেজ ছাড়তে হয়। এর বিরুদ্ধে শেলীর বন্ধু প্রতিবাদ জানালে তাকেও কলেক থেকে বহিষ্কার করা হয়। দুই বন্ধু কলেজ ছেড়ে লন্ডনের পোলক স্ট্রীটের এক বাড়িতে এলেন। তাঁর এই দুর্দিনে এগিয়ে এলেন তার ছোট বোন। নিজের সঞ্চয় থেকে ভাইকে নিয়মিত অর্থ সাহায্য করতে শুরু করলেন। এই অর্থ তিনি পাঠাতেন তার এক বান্ধবী হ্যারিয়েট ওয়েস্ট ব্রোকের সাহায্যে। এই পরিচয়ের সূত্র থেকেই হ্যারিয়েটের সাথে সম্পর্কে গড়ে শেলীর। সে বছরেই দুজনের বিয়ে হয়ে যায়। এ বিবাহে ভালবাসার চেয়ে বেশি ছিল সহানুভূতি। বিয়ের পর দুজনে গেলেন আয়ারল্যান্ড।
শেলীর বয়স তখন উনিশ। তিনি আয়াল্যান্ডের মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রাম দেখে খুশী হন। এরপর ফিরে আসেন লন্ডনে। বিয়ের পর দুটি বছর তারা এক সাথে সুখে শান্তিতে কাটিয়েছেন। ১৮১২ সালে শেলী রচনা করলেন, “Queen Mab”। এক দীর্ঘ কবিতা। মধ্যে অপরিণতির ছাপ থাকতে একজন মহৎ কবির আগমন ধ্বনি এতে উচ্চারিত হয়েছে।
১৮১৩ সালে হ্যারিয়েট একটি কন্যার জন্ম দিল। কুইন মবের নায়িকার নাম অনুসারে তাঁর নাম রাখা হল ইয়ানথি। এর কিছু দিন পর সরকারি আইনের নিয়ম অনুসারে হ্যারিয়েটকে পুনরায় বিবাহ করতে হল।
এই বিবাহের পর থেকেই শেলীর জীবনে নেমে এল এক মানসিক অস্থিরতা।
সংসারের এই অশান্তির মধ্যে শেলীর পরিচয় হল দার্শনিক গডউইনের সাথে। গডউইনের Political Justice বইটি শেলীর মনকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। গডউইনের সাথে প্রথমে চিঠিপত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ ছিল। তার পর দুজনের পরিচয় হল।
গডউইনের সাথে ছিল তাঁর প্রথম পক্ষের সতেরো বছর বয়সী সুন্দরী কন্যা মেরি।
শেলীর সাথে গড়ে উঠল তার গোপন প্রণয়। এবং ক্রমশই হ্যারিয়েটের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে আরম্ভ করলেন শেলী।
পুত্র সন্তান জন্মের দু বছর পর হ্যারিয়েট আত্মহত্যা করেন। শেলীর জীবনে তখন তাঁর কোন ভূমিকা ছিল না।
১৮১৫ সালে লিখলেন এ্যালাস্টার “Alastor”। অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা এক কাব্য। এটি একটি আত্মজীবনীমূলক রচনা।
Alastor or the Spirit of Solitude প্রকাশের দু মাস পর শেলী জেনিভায় গেলেন। সাথে মেরি ও কবি বায়রনের প্রেমিকা জেনি। তারা জেনেভায় পৌঁছবার অল্পদিনের মধ্যেই বায়রন এলেন সেখানে। দেখা হল দই কবির।
আগস্ট মাসে শেলী ফিরে এলেন ইংল্যন্ডে এসে পরিচয় হল কবি লে হান্টের সাথে। হান্ট ছিলেন তৎকালীন কবিদের প্রধান উৎসাহদাতা।
শেলী মেরিকে বিয়ে করলেন। এর পর শেলী হাত দিলে প্রমিথিয়াস আনবাউন্ড (Prometheus Unbound) রচনার কাছে। এর মধ্যে নাটক এবং গীতিকবিতার এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ ঘটেছে।
