দ্বিতীয় খণ্ড বীজগণিত। এতে মূলত সমীকরণ ও দ্বিঘাত সমীকরণের তত্ত্বগুলো নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে তবে ভাস্করাচার্য এই তত্ত্বগুলোর উদ্ভাবক নন। ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীধরাচার্য প্রথম দ্বি সমীকরণ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তাঁর গ্রন্থটির নাম ছিল গণিতাসার। এতে বীজগণিত পাটিগণিতের বহু নিয়ম আলোচিত হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য–ভগ্নাংশ, সুদ নির্ণয়, দ্বিঘাত সমীকরণ, বর্গমূল, ঘনমূল প্রভৃতি।
আর্যভট্ট, শ্রীধরাচার্য, ব্রহ্মগুপ্ত প্রভৃতি পণ্ডিতেরা বীজগণিতের যে সূত্রপাত করেন, ভাস্করাচার্য তাকেই বিস্তৃত করেন। সিদ্ধান্ত শিরোমণিতে গণিত শাস্ত্রকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক ভাগে জ্ঞান রাশি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। একে বলা হয়েছে অঙ্ক গণিত। দ্বিতীয় বিভাগে অজ্ঞাত রাশি নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। এটির নাম দেওয়া হয়েছে বীজগণিত।
বর্তমান কালে অজ্ঞাত রাশি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে যেমন a, b, x, অথবা ১, ২ বা অন্য কোন সংখ্যা অজ্ঞাত রাশির পরিবর্তে ধরা হয় তেমনই ভাস্করাচার্য অজ্ঞাত রাশিদের চিহ্নিত করবার জন্য বিভিন্ন রং যেমন সাদা, কালো, নীল, হলুদ, উল্লেখ করেছেন। কোথাও বিভিন্ন রত্নের নাম হীরা, মণি, মুক্ত মাণিক্য ব্যবহার করেছেন।
সিদ্ধান্ত শিরোমণির তৃতীয় খণ্ড গোলধ্যায় এবং চতুর্থ খণ্ড গণিতাধ্যায়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে মৌলিক গবেষণার ফলাফল আলোচনা করেছেন। এতে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, চন্দ্রের দ্রাঘিমা, নির্ণয়, পৃথিবীর গোলাকার আকৃতির প্রমাণ দিয়েছেন।
বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয় নিউটনের আবিষ্কারের অন্তত পাঁচশো বছর আগে পূর্বসূরীদের কোন সাহায্য ছাড়াই তিনি নির্ভুল সত্যে উপনিত হয়েছেন যে পৃথিবী শূন্যে ভাসমান। অথচ সুদীর্ঘ কাল পর্যন্ত পৃথিবীর সব দেশের মানুষের ধারণা ছিল পৃথিবী কোন একটি আধারের উপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়েছে আটটি বিশাল হাতি এই পৃথিবীকে ধরে রেখেছে। আবার এ হাতিগুলো রয়েছে বিশাল এক কচ্ছপের উপর। কচ্ছপটি সমুদ্রে ভাসছে। আবার কোন কোন পুরাণে বলা হয়েছে এক অনন্তনাগ তার ফণার উপর ধরে রেখেছে পৃথিবীকে। যদি কোন কারণে সাপ মাথা নাড়ায় তখনই ভূমিকম্প হয়।
ভাস্করাচার্য এই অলীক কল্পনার জগতে প্রথম নিয়ে এলেন বৈজ্ঞানিক যুকি। গোলাধ্যায়ের তৃতীয় অধ্যায়ে তিনি বলেছেন–
“নানা ধারঃ স্ব শক্তৈব বিয়তি নিয়তাং তিষ্ঠতীহাস্য পৃষ্ঠে।”
এর অর্থ–কল্পনা করে নাও পৃথিবী মহাসমুদ্রে ভাসমান। পৃথিবীর কোন আধার নেই। এর চারদিকে রয়েছে আকাশ।
সেই যুগে মানুষের ধারণা ছিল পৃথিবী চ্যাপ্টা থালার মত। আর্যভট্ট প্রথম বলেছিলেন পৃথিবীর আকার কদম ফুলের মত গোল কিন্তু তার সপক্ষে যুক্তিনিষ্ঠ কোন প্রমাণ দিতে পারেননি। ভাস্করাচার্যই প্রথম বললেন পৃথিবী গোল।
“সমো যতঃ স্যাৎ পরিধে শতাংশ
পৃথ্বী চ পৃথ্বী নিতরাং তনীয়ান।
নরশ্চ তৎ পৃষ্ঠ গতস্য কৃৎস্না
সমেব তস্য প্রতিভাত্যতঃ সা!”
ভাস্করাচার্য নিজেই প্রশ্ন করেছেন পৃথিবী যদি গোল হয় তবে আমরা তাকে সমতল দেখি কেন? সহজ সরল যুক্তিনিষ্ঠভাবে নিয়েই এর উত্তর দিয়েছেন। বিরাট একটি বৃত্তের পরিধির একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ যদি লক্ষ্য করা যায় তবে তাকে সমান বলেই মনে হবে, তেমনি পৃথিবীর আয়তন এত বিরাট যে মানুষ খালি চোখে যা দেখে তা পৃথিবীর অতি ক্ষুদ্রতম একটি অংশ; তাই মনে হয় সমতল।
নিউটনের বহু আগেই ভাস্করাচার্য মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি অবশ্য মাধ্যাকর্ষণ কথাটি ব্যবহার না করে আকর্ষণ কথাটি ব্যবহার করেছেন।
“আকৃষ্টি শক্তিশ্চ মহী তয়া
যঘুস্থং গুরু বাড়িমুখং স্বশ্যা।
আকৃষ্যতে তৎপততীব ভাতি
সমে সমান্তার পত ত্বীয়ং খে।।”
ভাস্করাচার্য বলেছেন পৃথিবীর এক আকর্ষণী বল আছে। তাই কোন বস্তু উৎক্ষিপ্ত হলে এই আকর্ষণী শক্তির দ্বারাই তা পুনরায় ভূমিতে পতিত হয়।
নিউটন এই মধ্যাকর্ষণ শক্তির আবিষ্কার করে জগৎ বিখ্যাত হলেন অথচ তার কত পূর্বে ভাস্করাচার্য তা আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু বিশ্বের কাছে তিনি অপরিচিত অজ্ঞাত রয়ে গেলেন। এ্যারিস্টটল, প্লেটো, পিথাগোরাস, টলেমি, ইউরোপের মানুষের কাছে যে শ্রদ্ধার আসন পেয়েছিলেন, ভাস্করাচার্য তার থেকে বঞ্চিত হলেন। এর কারণ ভারতে বিজ্ঞানচর্চার অভাব। আর্যভট্ট, ভাস্করাচার্য প্রভৃতি বিজ্ঞানী যে বিজ্ঞানচর্চার সূত্রপাত করেছিলেন, পরবর্তী প্রজন্মের মানুষেরা কেউই তা ধরে রাখতে পারেনি। বিজ্ঞানকে বিসর্জন দিয়ে ধর্মের কূটকচালিতেই নিজেদের মত্ত রেখেছিলেন।
তবে সিদ্ধান্ত শিরোমণি গ্রন্থখানি এক সময় খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। বিভিন্ন ভাষায় এটির অনুবাদ হয়েছিল, সম্ভবত এটি ফার্সী ভাষায় অনুবাদ হয়ে আরব দেশে গিয়েছিল। মধ্যযুগে শুধু ভারতবর্ষ নয়, সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে তিনিই ছিলেন শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিদ ও গণিতজ্ঞ।
ভাস্করাচার্যের ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে যতটুকু জানা যায় তাতে অনুমান তিনি মহারাষ্ট্রর সহাদ্রি পর্বতমালার নিকটস্থ নগর বিজ্জবিড় বা বিজুড়বিড়-এ জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে এই নগরের নাম হয় বিজাপুর।
