কোন কোন শিক্ষিত মহলকে আরো একটি কথা বলে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে দেখা যায়। কথাটা হল, কোরআনের বিজ্ঞান-সংক্রান্ত বাণী ও বক্তব্য সম্পর্কে এখন যে-সব কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে কোরআনের। অনুবাদকর্মে কিংবা টীকা ভাষ্যমূলক গ্রন্থে সেগুলো উল্লেখ নেই কেন? এমনকি কোরআনের আধুনিক যে-সব অনুবাদ, তাফসীর ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণমূলক গ্রন্থ সেগুলোতেও এসবের কোন ইঙ্গিত-ইশারা তো দেখা যায় না। এর জবাব কোথায়?
অস্বীকার করার উপায় নেই, আধুনিক শিক্ষিত মহলের এসব বক্তব্য যুক্তিসঙ্গত এবং বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের নিকট এ ধরনের যুক্তি গুরুত্বপ্রাপ্তিরও হকদার। কোরআনের ফরাসী অনুবাদকর্মের কথাই ধরা যাক। অমুসলিম কোন পণ্ডিতের এমনকি বিজ্ঞ-অভিজ্ঞ কোন মুসলিম ভাষাবিদ-কর্তৃক সম্পাদিত কোরআনের ফরাসী অনুবাদেও বিজ্ঞান-সম্পর্কিত তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোন টীকা ভাষ্য, মন্তব্য কিংবা পর্যালোচনা অনুপস্থিত। (অপরাপর ভাষার অনুবাদকর্মেও এ কথা খাটে)। কারণ, আর কিছুই নয়, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে ওইসব অনুবাদক ও ভাষ্যকার মূলত বিজ্ঞ-বিদগ্ধ ভাষাবিদ পণ্ডিত (কিন্তু আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের গবেষণা ও আবিষ্কার সম্পর্কে বলতে গেলে অনবহিত)। তাই দেখা যায়, কোরআনের যে-সব অনুচ্ছেদে বা অধ্যায়ে বিজ্ঞানের বিষয় বিদ্যমান বেশিরভাগক্ষেত্রে সে-সবের অনুবাদ হয় ভ্রান্তিপূর্ণ; নতুবা সে-সবের ব্যাখ্যা বিভ্রান্তিকর। সত্যি কথা বলতে কি, কোরআনের মত বিজ্ঞানময় একটি ধর্মগ্রন্থের অনুবাদের জন্য যা অত্যাবশ্যক, তাহল, আরবী ভাষার সুগভীর জ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞানের সবকয়টি শাখা-প্রশাখা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা। কোরআন-পাঠককে সর্বাগ্রে বুঝে নিতে হবে যে, কোরআনের মূল আরবীতে সঠিক কোন্ বক্তব্য ব্যক্ত করা হয়েছে; তারপর আসবে অন্যভাষায় বিজ্ঞান-বিষয়ক সেই বক্তব্যের যথাযথ রূপান্তর ও পরিস্ফুটনের প্রশ্ন।
কোরআনের বিজ্ঞান-বিষয়ক আয়াত বা অনুচ্ছেদের ভুল তরজমা ও বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের আরো একটি কারণ বিদ্যমান। সে কারণটি হল, আধুনিক অনুবাদক কর্তৃক আদিযুগের অনুবাদক ও ব্যাখ্যাকারদের অন্ধ-অনুসরণ। প্রচলিত ঐতিহ্যের ধারায় প্রাচীনযুগের অনুবাদক ও তফসীরকারদের টীকা টিপ্পনী, মন্তব্য, বক্তব্য ও বিশ্লেষণকে প্রায়ক্ষেত্রেই অভ্রান্ত, অলঙ্ঘনীয় ও অপ্রতিরোধ্য হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু প্রাচীনযুগের ওইসব তর্জমাকারী ও তাফসীরকারদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও মনীষার প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেও বলতে হয় যে, তারা আধুনিক যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞানের তথ্যানুসন্ধান, গবেষণা ও আবিষ্কার থেকে বহুদূরে অবস্থান করতেন। সেই প্রাচীনযুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আধুনিক যুগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আবিষ্কার ও গবেষণা ছিল একেবারেই অভাবিত। ফলে, আধুনিক যুগের সেকুলার জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুশীলন ও চর্চা মানবজাতিকে যা-কিছু উপহার দিয়েছে তার আলোকে সে-যুগে বসে কোরআনের বিজ্ঞান-সম্পর্কিত কোন বাণী বা বক্তব্যের অর্থ ও তাৎপর্য উদ্ধার আক্ষরিক অর্থেই ছিল অকল্পনীয়। সে কারণে সে যুগের অনুবাদে ও ব্যাখ্যায় কোরআনের বিজ্ঞান বিষয়ক মূল শব্দের সঠিক অর্থ ও যথাযথ তাৎপর্য অনধিগত থাকাটা অস্বাভাবিক ছিল না মোটেও। আর এসব কারণে কোরআনের প্রাচীন ও আধুনিক অনুবাদ ও তফসীরসমূহ সম্পূর্ণ ভুল তরজমা ও অযথার্থ ব্যাখ্যা না হলেও কোন কোন বিষয়ে ও ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর অনুবাদ ও অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যা হিসেবে চালু রয়েছে। বিভ্রান্তির এই বেড়াজাল থেকে কোরআনের বিজ্ঞান বিষয়ক বাণী ও বক্তব্যকে মুক্ত করতে চাইলে অনুবাদককে মূল আরবী ভাষায় কোরআন বুঝার মত ভাষাজ্ঞান ও পারদর্শিতা যেমন অর্জন করতে হবে; তেমনি তাঁকে একইসঙ্গে হতে হবে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সবিশেষ বিজ্ঞ ও যথার্থ অভিজ্ঞ।
কোরআনের অনুবাদ প্রসঙ্গ
প্রকৃতপক্ষে, আরবী ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করে মূল আরবীতে কোরআন অধ্যয়ন ও অনুধাবন করার পূর্বপর্যন্ত শুধু অনুবাদের মাধ্যমে কোরআনের বহু শব্দের ও আয়াতের অর্থ ও তাৎপর্য ড. মরিস বুকাইলির নিকট সুস্পষ্ট হয়নি। এরপর ড. মরিস বুকাইলি কোরআনের মূল আরবী শব্দের সঠিক অর্থ জেনে নেয়ার ব্যাপারে ব্রতী হলেন। আরবী ভাষা শিখলেন। অতঃপর আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের আলোকে কোরআনে ব্যবহৃত বিভিন্ন আরবী শব্দের মূল অর্থ ও তাৎপর্য অনুসন্ধানে মনোনিবেশ করলেন। এভাবে, শেষপর্যন্ত এই কোরআন থেকে বিজ্ঞান-বিষয়ক এমনসব তথ্য ও বক্তব্য তিনি পেয়েছেন–যেকোন বিচারে তা গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ বলে তার নিকট মনে হয়েছে।
২৭. সৃষ্টিতত্ত্ব ও কোরআন
ড. মরিস বুকাইলি ১৯৭৬ সালের ৯ নভেম্বর ফ্রেঞ্চ মেডিসিন একাডেমীতে একটি বক্তৃতা প্রদান করেন এবং সেই ভাষণে প্রথম তিনি দেখানোর চেষ্টা করেন যে, “তাঁর” সম্পর্কে কোরআনের প্রত্যেকটি বক্তব্য আধুনিক গবেষক, বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের মনোযোগ আকর্ষণের দাবিদার। তাঁর সেই ভাষণটির শিরোনাম ছিল : “ফিজিওলজিক্যাল এ্যান্ড এমব্রাইওলজিক্যাল ডেটা ইন দ্য কোরআন।” এটি ১৯৭৬ সালেই ফ্রেঞ্চ মেডিসিন একাডেমী কর্তৃক বুলেটিন আকারে প্রকাশিত হয়। ওই ভাষণে তিনি আরো দেখানোর প্রয়াস পান যে, সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে কোরআনের যে বক্তব্য, তা পরিমাণে প্রচুর এবং কোরআনের ওইসব বক্তব্যে বিশ্লেষণে এতদসংক্রান্ত আরো বহু তথ্য-উপাত্ত প্রাপ্তি সম্ভব।
