এ প্রসঙ্গে ড. মরিস বুকাইলি বলেন, লেখাপড়া শিখে আমি যখন বড় হচ্ছিলাম, তখনকার কথা। গোড়া থেকেই আমাকে সবদিক দিয়ে একটি কথা শেখান হচ্ছিল, যে কোরআন হচ্ছে ‘মেহোমেটের’ রচিত একখানি ‘পুস্তক’। মেহোমেট’ অর্থাৎ মোহাম্মদ (দঃ) যে কোরআনের লেখক বা রচয়িতা, সেই কথাটা আমি কোরআনের এক ফরাসী অনুবাদের ভূমিকাতেও দেখেছি। শুধু তাই নয়, আমার শিক্ষাজীবনের প্রতিটি পর্যায়ে বারবারই যে কথাটা আমার মনে গেঁথে দেয়ার প্রয়াস চলেছে, তাহল, কোরআনের লেখক (অর্থাৎ ‘মেহোমেট’) কোরআন রচনা করেছেন, আগাগোড়া বাইবেল নকল করেই। তবে সেই নকলের বেলায় তিনি কিছুটা ভিন্নধারা অবলম্বন করেছেন। যেমন, বাইবেলে বর্ণিত বিভিন্ন পবিত্র কাহিনী সংকলনের ক্ষেত্রে তিনি কোন কোন অনুচ্ছেদ কাটছাঁট করেছেন; কোন কোন স্থানে কিছুটা যোগ-সংযোগও করেছেন এবং তার ফাঁকে ফাঁকে ঢুকিয়েছেন যে ধর্মের তিনি প্রচারক বলে দাবি করেছেন সেই ইসলাম ধর্মের কিছু রীতি-নিয়ম আর কিছু নীতি-আদর্শের কথা!
এখন স্মরণযোগ্য যে, এই যুগেও ফ্রান্সসহ পাশ্চাত্য জগতে এবং প্রাচ্যের আধুনিক শিক্ষিত মহলে ‘ইসলাম-বিশারদ’ হিসেবে খ্যাতিসম্পন্ন একধরনের ‘পণ্ডিত ব্যক্তি রয়েছেন। পেশায় এঁরা বেশিরভাগই শিক্ষক। এঁরা প্রায় সবাই ‘কোরআন’ ও ‘মেহোমেট’ সম্পর্কে কমবেশি উপরে যেভাবে বলা হয়েছে, তদনুরূপ ধারণাই পোষণ করেন। তবে, তাঁদের মধ্যে কারোকার প্রকাশভঙ্গি কিছুটা শালীন, কৌশলপূর্ণ ও সূক্ষ্ম।
কোরআনের মূলসূত্র সম্পর্কে এই যে প্রচারণ–যা শিক্ষা প্রদানের নাম করে প্রচার করা হয়ে থাকে, তা কিন্তু সত্যের ধারে-কাছেও কিছু নেই। তবুও, কোরআন সম্পর্কে এই অসত্য শিক্ষা কখনো সরাসরি, আবার কখনো সুকৌশলে সর্বত্র প্রচার করা হয়। আর এই ধরনের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে যারা বড় হচ্ছেন, তারা যে দেশের বা যে ধর্মেরই হোন-না-কেন, তাঁরা ধরেই নিচ্ছেন যে, বিজ্ঞান-সম্পর্কিত বিষয়ে বাইবেলে যে ধরনের ভুলের গোনজায়েশ রয়েছে, কোরআনও তা থেকে মুক্ত নয়।
প্রকৃতপক্ষে, কোরআন সম্পর্কে যে-সব শিক্ষা ও প্রচার সর্বত্র চালু রয়েছে, তাতে সেই শিক্ষায় শিক্ষিত এবং সেই প্রচারণায় অনুপ্রাণিত যে-কারো পক্ষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো খুবই স্বাভাবিক। অথচ কে তাঁদের বুঝাবে যে, তাঁদের সেই সিদ্ধান্তটি তো বটেই, সেই সিদ্ধান্তের মূলে কার্যকর যে শিক্ষা ও প্রচারণা–তাও আগাগোড়া অসত্য, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
২৬. কোরআন ও বিজ্ঞান
ওহীর মাধ্যমে ৬১০ থেকে ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোরআন মোহাম্মদের (দঃ) উপরে নাজিল হয়। তখন শুধু প্রাচ্যে নয়, পাশ্চাত্যেও জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে বিরাজ করছিল অজ্ঞানতার এক নিদারুণ অন্ধকার। সেই অন্ধকারে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো জ্বালাবার পথেও ছিল হাজারটা প্রতিবন্ধকতা। সময়ের উদাহরণ হিসেবে ফ্রান্সের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ফ্রান্সে তখন রাজত্ব করছিলেন রাজা ডগোবার্ট–মেরোভিঙ্গায়ান বংশের শেষ নরপতি।
এখন কোরআনের বিজ্ঞান-সংক্রান্ত বক্তব্য সম্পর্কে সাধারণ শিক্ষিতমহলে যে ধারণা গড়ে উঠেছে, উপস্থিত ক্ষেত্রে অনেকের নিকট তা যৌক্তিক’ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময়ের প্রেক্ষাপট বিচার-বিবেচনা করে দেখলে স্পষ্ট হয় যে, তাদের ওই ধারণা শুধু অমূলক নয়, অবান্তরও বটে। তদুপরি, কোরআনের বিজ্ঞান-সংক্রান্ত বিভিন্ন বক্তব্য সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে আধুনিক তথ্য-জ্ঞানের সহায়তায় বিচার-বিশ্লেষণ করলে এটাও পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে যে, কোরআন সম্পর্কে আধুনিক শিক্ষিত মহলের ওইসব তথাকথিত ধারণার অবস্থান আসল সত্য থেকে বহুদূরে। পরবর্তী পর্যালোচনায় বিষয়টি আরো বিশদভাবে ফুটে উঠবে।
কোরআনের বিজ্ঞান-সম্পর্কিত কোন বক্তব্য যখন আধুনিক জ্ঞান-গবেষণার নিরিখে সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয় এবং একইসঙ্গে বাইবেলের বা অন্যকোন ধর্মের ধর্মগ্রন্থের অনুরূপ কোন বক্তব্য বিজ্ঞানের অনুরূপ কষ্টিপাথরে অগ্রহণযোগ্য বলে প্রতিপন্ন হয়, তখন আধুনিক শিক্ষিত মানুষমাত্রই একধরনের মর্মবেদনায় ভুগতে শুরু করে দেন। তখন তারা তড়িঘড়ি এই মর্মে জবাব দিয়ে বলেন যে, বাইবেলের বা অন্যধর্মের ধর্মগ্রন্থের অনেক পরে কোরআন রচিত এবং সেই মুদ্দতে আরব বিজ্ঞানীরা গবেষণা ও বিজ্ঞানে বহু উন্নতি সাধন করেছিলেন। ফলে, কোরআনের বক্তব্য বৈজ্ঞানিক সত্যের অত কাছাকাছি হতে পেরেছে, ইত্যাদি।
অথচ, এই বক্তব্য রাখতে গিয়ে ওইসব শিক্ষিত ব্যক্তি বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশের ইতিহাস একেবারেই ভুলে যান। সত্য বটে, মহান ইসলামী সভ্যতার আমলে মুসলিম বিজ্ঞানীরা জ্ঞানে-বিজ্ঞানে ও গবেষণায় প্রভূত উৎকর্ষ অর্জন করেছিলেন। কিন্তু সেইসঙ্গে একথা আরো বেশি সত্য যে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মুসলিম মনীষীদের সেই তরী সাধিত হয়েছিল কোরআন নাজিল হওয়ার শতাব্দী কয়েক পরে। শুধু তাই নয়, বিজ্ঞানের ইতিহাস আরও জানায় যে, এই পুস্তকে মানুষের আবির্ভাব সম্পর্কিত যে বিষয়টি বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার জন্য গ্রহণ করেছি, অন্যধর্মের ধর্মীয়গ্রন্থের সময়কাল থেকে তো বটেই এমনকি বাইবেলের আমল থেকে শুরু করে কোরআন নাজিলের সময়কাল পর্যন্ত ওই। বিষয়ে আদৌ জ্ঞান-বিজ্ঞানের তেমন কোন গবেষণা কিংবা আবিষ্কার সাধিত বা সম্পাদিত হয়নি।
