যাহোক, পরবর্তিতে লিখিত বিষয়গুলো সাব্যস্ত করার জন্য উপরের আলোচনাই যথেষ্ট :
(ক) (মিসরের দ্বিতীয় অধিপতি) রামেসিসের সিংহাসনে আরোহণের পূর্বে ইহুদীদের মিসরত্যাগের প্রশ্নই ওঠে না।
(খ) হযরত মুসা এমন এক ফেরাউনের আমলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন–যিনি রামেসিস ও পিথম নগরী নির্মাণ করেন। তিনিই হচ্ছেন দ্বিতীয় রামেসিস।
(গ) হযরত মুসার মাদিয়ানে অবস্থানকালে ক্ষমতাসীন ফেরাউনের অর্থাৎ দ্বিতীয় রামেসিসের মৃত্যু ঘটে এবং হযরত মুসার জীবনের পরবর্তী ঘটনাবলী সংঘটিত হয় দ্বিতীয় রামেসিসের উত্তরাধিকারী মারনেপতাহহর রাজত্বকালে।
এছাড়াও, বাইবেলে আরো গুরুত্বপূর্ণ এমনকিছু তথ্য রয়েছে, যেসব তথ্যের আলোকে ইহুদীদের মিসরত্যাগের সময় মিসরে ক্ষমতাসীন ফেরাউনের সহজেই সনাক্ত করা সম্ভব। বাইবেলে বলা হয়েছে, হযরত মুসার বয়স যখন ৮০ বছর, তখন তিনি আল্লাহর নির্দেশক্রমে ফেরাউনের কবল থেকে ইহুদীদের মুক্তির প্রচেষ্টা চালান : “ফেরাউনের সহিত আলাপ করার সময় মোশির আশি ও হারুনের তিরাশি বৎসর বয়স হইয়াছিল” (যাত্রাপুস্তক ৭, ৭)। বাইবেলের অন্যত্র (যাত্রাপুস্তক ২, ২৩) বলা হয়েছে, হযরত মুসার জন্মকালে যে ফেরাউন মিসরে রাজত্ব করতেন, হযরত মুসা মাদিয়ানে থাকাকালে সেই ফেরাউনের মৃত্যু হয়। অবশ্য, এরপরেও বাইবেলের বর্ণনার ধারা অব্যাহত থেকেছে এবং মিসর অধিপতি পরিবর্তনের কোনো কথা সেখানে উল্লেখ নেই। এভাবে, হযরত মুসার মিসরে বসবাসের সময় এই দুই ফেরাউনের রাজত্বকাল যে কমপক্ষে আশি বছর হবেই, বাইবেলের বর্ণনা থেকে সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়।
জানা যায়, দ্বিতীয় রামেসিস ৬৭ বছর রাজত্ব করেছিলেন। (ড্রাইটন ও ভ্যান্ডিয়ারের নোলজি অনুসারে খ্রিস্টপূর্ব ১৩০১–১২৩৫; এবং রাওটনের অভিমত অনুসারে খ্রিস্টপূর্ব ১২৯০-১২২৪। তার উত্তরাধিকারী মারপেতাহ কতদিন রাজত্ব করেছিলেন এতুদবিষয়ে মিসরতত্ত্ববিদগণ নির্দিষ্ট কোনো হিসেব দিতে পারছেন না। তবে, তাঁর রাজত্ব যে কমপক্ষে দশ বছরকাল স্থায়ী হয়েছিল। তা নিশ্চিত বলা চলে। কেননা, ফাদার ডি ভক্স তাঁর গবেষণায় যে দলিলের উদ্ধৃতি দিয়েছেন, সেখানে তাঁর রাজত্বের দশম বছরের কথা উল্লেখ রয়েছে। মারনেপতাহর রাজত্বকাল সম্পর্কে ড্রাইটন ও ভ্যান্ডিয়ার দুটি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন : হয় তাঁর রাজত্বকাল ছিল দশ বছর (খ্রিস্টপূর্ব ১২৩৪–১২২৪) নতুবা বিশ বছর (খ্রিস্টপূর্ব ১২২৪–১২০৪)। মারনেপতাহ কিভাবে মারা যান, সে বিষয়েও মিসরতত্ত্ববিদগণ সুনির্দিষ্টভাবে কিছুই বলছেন না। তারা শুধু জানাচ্ছেন, তাঁর মৃত্যুর পর গোটা মিসরে অভ্যন্তরীণ তীব্র গোলযোগ দেখা দেয় এবং তা প্রায় ২৫ বছরকাল স্থায়ী হয়।
প্রকৃতপক্ষে, মারনেপতাহর রাজত্বকাল সম্পর্কে দিনপঞ্জির ওই হিসেব কতটা সঠিক, বলা মুশকিল। তবে বাইবেলের বর্ণনামতে প্রাপ্ত এই সময়টাতে অর্থাৎ উক্ত আশি বছরের মুদ্দতে দ্বিতীয় রামেসিস ও মারনেপতাহ ছাড়া তৃতীয় নতুন কোনো রাজার সন্ধান পাওয়া যায় না। এই হিসেব মোতাবেক ইহুদীদের মিসরত্যাগের সময় হযরত মুসার বয়স কত ছিল, তা জানতে হলে সবার আগে জানা দরকার দ্বিতীয় রামেসিস ও মারনেপতাহ মোট কত বছর ধরে রাজত্ব করেছিলেন। এক্ষেত্রে প্রথম সেথোস ও দ্বিতীয় রামেসিসের রাজত্বকাল একুনে আশি বছর গণনা করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কেননা, সেখোসের রাজত্বকাল ছিল স্বল্পস্থায়ী। হযরত মুসার মাদিয়ানে গমন, যৌবনপ্রাপ্তি এবং সেখানে তাঁর আশি বছর অবস্থানের সাথে সেই স্বল্পমেয়াদের কোনো মিল নেই। পক্ষান্তরে, হযরত মুসার সময়কালে মাত্র দু’জন ফেরাউনকেই পাচ্ছি। মূলত, এখানে যে থিওরি তুলে ধরা হল, তার সাথে হুবহু মিল রয়েছে কোরআনের বর্ণনার। বাইবেলের একটিমাত্র বর্ণনার সাথে এই থিওরির বিরোধ পরিলক্ষিত হয়–আর তা হল রাজাবলি–১-এর ৬, ১ অধ্যায়ের বর্ণনা উল্লেখ্য যে, এই পুস্তকটি বাইবেলের পুরাতন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত হলেও তাওরাত খণ্ডের অন্তর্ভুক্ত নয়। এই পুস্তকখানি নিয়ে বিতর্ক কম নয়; এবং ফাদার ডি ভক্স বাইবেলের পুরাতন নিয়মের এই অধ্যায়ে উল্লিখিত সময়ের হিসেবে একদম নাকচ করে দিতে দ্বিধা করেননি। উল্লেখ্য, এই অধ্যায়ে হায়কলে সোলায়মানী নির্মাণের সাথে সময়ের হিসেব গণনা করে ইহুদীদের মিসরত্যাগের সময়কাল বলে দেয়া হয়েছে। অথচ, এই হিসেব মোটেও সঠিক নয়। সুতরাং, ভুল এই বর্ণনার সন্দেহযুক্ত এই হিসেবের বরাত টেনে ড. মরিস বুকাইলি যে থিওরি তুলে ধরেছেন, তা নাকচ করা অসম্ভব বলেই তার ধারণা।
১০. মারনেপতহর শিলালিপি
মারনেপতাহর এই শিলালিপিটি আবিষ্কারের সাথে সাথেই সর্বত্র সাড়া পড়ে যায়। এই শিলালিপিটি মারনেপোহর রাজত্বের পঞ্চমবর্ষে উকীর্ণ হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, উল্কীর্ণ এই শিলালিপির বক্তব্য তুলে ধরে অনেক সমালোচক উপরে বর্ণিত ‘দুই ফেরাউনের থিওরি’র বিরোধিতা করেন।
তাঁরা আরো বলেন, ইহুদীদের মিসরত্যাগের সাথে সাথেই যে মারনেপোহর রাজত্বের অবসান ঘটেছিল, তা নয়।
এই শিলালিপিটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এটি সাংকেতিক চিত্রাক্ষরে লিপিবদ্ধ একমাত্র দলিল যেখানে ‘ইসরাইল’ শব্দটি বিদ্যমান। তাছাড়া, এই শব্দটির পর জাতিবাচক এমন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যা থেকে নিঃসন্দেহে বলা চলে যে, ইসরাইল’ বলতে একটি দল বা সম্প্রদায়কেই বোঝানো হয়েছে। আগেই বলা হয়েছে, মারনেপোহর রাজত্বের পঞ্চমবর্ষে এই শিলালিপিটি উত্তীর্ণ হয়েছিল। এটি আবিষ্কৃত হয় থেবস মন্দিরে–এটি হচ্ছে ফেরাউনদের শেষকৃত্যের স্থান। মারনেপতাহ্ কিভাবে পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোর উপর একের পর এক বিজয় অর্জন করেছেন, এই শিলালিপিতে তার উল্লেখ রয়েছে। বিশেষত, শিলালিপির শেষদিকে উৎকীর্ণ এক বিজয় বিবরণীতে বলা হয়েছে : “ইসরাইলকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, তাদের জড়গোষ্ঠী পর্যন্ত নির্মূল …।” এই বক্তব্য তুলে ধরা সমালোচকেরা বলছেন, এখানে যেহেতু ইসরাইল শব্দটি রয়েছে, সেহেতু ধরে নেয়া যায় যে, মারনেপতার রাজত্বের পাঁচ বছর পূর্তির আগেই ইহুদীরা কেনানে বসতি স্থাপন করেছিল। এরদ্বারা নাকি এটাও বোঝা যায় যে, ইহুদীদের মিসর ত্যাগের ঘটনা ঘটে গিয়েছিল এর আগেই।
